শুধু রাজধানী নয়, দেশব্যাপী পরিবহন খাতে নানা পরিষেবার নিয়ন্ত্রণ ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশ নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইনের খসড়া উত্থাপিত হয়। বিইউটিএ আইনের খসড়া উত্থাপিত হয়েছিল ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ ডিটিসিএ নিজেদের আইনের ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, ডিটিসিএ বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে পরিবহনব্যবস্থাকে সমন্বয় করার। কিন্তু চার বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আইনটি ফাইলবন্দি রয়েছে। এ নিয়ে কর্তৃপক্ষেরও তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই।
পরিবহন খাতের সমন্বয়ে ডিটিসিএর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর থেকে। তখন দেশের পরিবহন খাত সমন্বয়ের নতুন কার্যক্রম গ্রহণের তোড়জোড় শুরু করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। ২০২১ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলেশন কোম্পানির মাধ্যমে বাংলাদেশ নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইনের খসড়া করা হয়।
এই আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনায় ডিটিসিএ আইনের নানা ধারা বদলের পক্ষে মতামত আসে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক বোর্ডসভায়। আইনের খসড়ায় বলা হয়, ডিটিসিএ বিলুপ্ত হয়ে বাংলাদেশ নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা হলে এই সংস্থার কার্যক্রম বিভাগীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। এমনও বেশ কিছু বিধানের প্রস্তাব রয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, আইনটি এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারণ, এখানে স্টেকহোল্ডার অনেকেই। সবার মতামত নিতে হবে। বিদ্যমান ডিটিসিএ আইনকে আরও কার্যকর করে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। নতুন সংস্থা তৈরি হলে হাজারও প্রশ্ন উঠবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিটিসিএর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। নতুন আইন প্রণয়নে বাধা নিজেরাই। এ কারণে নতুন আইন হলেও সড়কে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরবে না বলে মনে করেন তারা।
পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা বলছেন, খসড়া আইন চূড়ান্ত করে শুধু একটি নতুন সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে কোনো লাভ হবে না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং আঞ্চলিক জাতীয় পণ্য পরিবহন কমিটির সর্বেসর্বা ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বিইউটিএর নির্দেশনা সহসা মানতে চাইবে না। তাদের মতে, এসব সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কমিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব দিতে পারবেন- এমন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ ব্যক্তিকেই বিইউটিএর প্রধান কর্মকর্তার পদে নিয়োগ দিতে হবে। কারণ সড়ক ব্যবস্থাপনায় এর আগেও আইন প্রণয়ন হয়েছে, কিন্তু তা কাজে আসেনি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, বিভিন্ন শহরে যানবাহন পরিচালনার জন্য একক সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার। যানবাহন নীতিমালার সঙ্গে বড় সংযোগ রয়েছে সড়ক অবকাঠামো বা রাস্তার। আমরা দেখেছি, যানবাহন নীতিমালার সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের কাজের সমন্বয় হচ্ছে না। এ ছাড়া রাজধানীতে যানবাহন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিটিসিএ ব্যর্থ হচ্ছে। কোনো সংস্থা ডিটিসিএর কথা শুনছে না। তাই বাংলাদেশ নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে গেলে একটা সংস্থাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিতে হবে। না হলে কিছু লোকের পদায়ন এবং আরেকটা ঠুঁটো জগন্নাথ মার্কা প্রতিষ্ঠান হবে।
সড়ক ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের আইন তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য একেকটি সংস্থা গড়ে উঠেছে, কিন্তু সংস্থাগুলো কাজ করতে তেমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। তাই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষের আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। আশা করছি, সরকার বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে এ সমস্যা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।