জুলাই সনদ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গণ-অভ্যুত্থানে। এরপর জনপ্রত্যাশা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সরকারও রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। সেই লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে মতবিনিময় হয়।
দুই পর্বের আলোচনায় ইতোমধ্যে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত হয়। এগুলোর ওপর ভিত্তি করে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করার কাজ চলছে। সমস্যা তৈরি হয়েছে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা নিয়ে। গতকাল রবিবার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার প্রকট মতভিন্নতা নিয়েই শেষ হয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে স্বৈরাচার ফেরার সব রাস্তা বন্ধ করতে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘সমঝোতার ভিত্তিতেই ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন।’
জুলাই জাতীয় সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে এখনো তেমন কোনো সুরাহা হয়নি। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দলগুলোর আলোচনায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মতো প্রধান দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল সমস্যায় ফেলে দিয়েছে।
বিএনপি মনে করে, সংবিধান সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো কেবল আগামী সংসদ ছাড়া বাস্তবায়নের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। এখনই বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ বা গণভোটের মাধ্যমে তা কার্যকর করার চেষ্টা করলে দেশে দুটি সংবিধান চালু হওয়ার মতো এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি মনে করে, গণ-অভ্যুত্থানকে সফল করতে হলে নির্বাচনের আগেই এই সংস্কারগুলো কার্যকর করতে হবে। তারা রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশ, গণভোট বা গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে এর আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে চান। তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন, যদি সংস্কারের দায়িত্ব পরবর্তী সংসদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে এই গণ-অভ্যুত্থান অর্থহীন হয়ে পড়বে এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রকে আবার বিপদে ফেলতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে এবং সে অনুযায়ী কাজ করছে সরকার ও কমিশন। জনপ্রত্যাশার আলোকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকার বদ্ধপরিকর। এ জন্য রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দরকার। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে পৌঁছানো সবচেয়ে বেশি জরুরি।
ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বেশ কিছু বিষয়ে মতৈক্য পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো, এটি আশার কথা। তবে ছাড় দিয়ে হলেও রাজনৈতিক দলগুলোকে সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় দেশের রাজনীতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নির্বাচন নিয়েও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে,-এই বিষয়টি সামনে রেখেই সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। এখন দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে ঐকমত্য তৈরি করা। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে- এটাই প্রত্যাশা।