রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিনের একটি আলোচিত বিষয়। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ’৭০-এর দশক থেকে শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এটি আরও প্রকট আকার ধারণ করে। মায়ানমারে মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন ও হত্যার ফলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়। ২০১৭ সালে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী পরিচালিত নিপীড়নে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এ দেশে আসে। প্রাণভয়ে তারা উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত পেরিয়ে এসে আশ্রয় নেয় কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোয়। রাখাইন রাজ্যে সে দেশের সেনাবাহিনী বহু মানুষকে হত্যা করেছে। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতন চালানো হয়। ঘরবাড়ি লুটপাট করা হয়। আন্তর্জাতিক আদালতে শুনানিতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মায়ানমার সরকার। দেশের তৎকালীন সরকারপ্রধান ও শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চি অভিযোগগুলোকে ‘অতিরঞ্জিত’ এবং ‘ভুল’ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গঠিত বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সহিংসতা ছিল কাকতালীয় এবং তা রোহিঙ্গাদের উসকানিতে সংঘটিত হয়েছে।
সম্প্রতি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষক মাঠপর্যায়ের তথ্য ও উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নতুন এক গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষণায় অংশগ্রহণ করেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মুশফিক মোবারক, হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক জয়া ওয়েন, কুইন্স ইউনিভার্সিটির পোলা লোপেজ-পেনা এবং আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সি অস্টিন ডেভিস। গবেষকরা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করেন। তারা সেখানে বৃহৎ পরিসরের জরিপ পরিচালনা করেন। জরিপে অংশগ্রহণ করেন ৪ হাজার ৬১৬ রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং সমানসংখ্যক স্থানীয় বাংলাদেশি। এ জরিপের মাধ্যমে গবেষকরা চেষ্টা করেছেন, এ সহিংসতার পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে, তা জানতে। তারা গবেষণার জন্য আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা নামক একটি আন্তর্জাতিক ডেটাবেইস ব্যবহার করেন।
এ ডেটাবেইসে সংঘর্ষ, সহিংসতা এবং মৃত্যুর তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি তারা আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ধান মূল্যের পরিসংখ্যান, ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়া-সম্পর্কিত স্যাটেলাইট ডেটা একত্র করে মায়ানমারের ধান উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্লেষণ করেন। এখানে ধানের বিষয়টি এসেছে এ জন্য যে, মায়ানমার মূলত একটি কৃষিনির্ভর দেশ। গবেষকরা দেখেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ধানের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব এলাকায় সহিংসতা বাড়ে। এসব এলাকায় লুটপাটের হার বেড়ে যায় তিন গুণ। একই সঙ্গে সরকার-সমর্থিত বাহিনীর দ্বারা সহিংসতার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ৩৯ শতাংশ। এ সহিংসতা কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থে চালানো হয়েছে এমন নয়, বরং রোহিঙ্গাদের প্রতি অতিরিক্ত বিদ্বেষ ও দমনমূলক মনোভাব থেকেই করা হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণাটি সামাজিক বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। কারণ এখানে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে যেসব উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ বা ব্যবহার করা হয়েছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি গবেষণা সাময়িকী ‘ইকোনমিক জার্নাল’-এ প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে এটি। এ ধরনের গবেষণা অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ দেশেও প্রয়োগ করা যেতে পারে, যাতে করে সহিংসতার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। কারণ রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে যেসব তথ্য-উপাত্ত দরকার সবই এ গবেষণায় উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের জন্য উপস্থাপন করা যেতে পারে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে সহজ প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, সেটিই প্রত্যাশা।