গাজায় চলমান গণহত্যার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার প্রস্তাবে বিশ্বজুড়ে সমর্থন বাড়ছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া গত রবিবার একযোগে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের মধ্যে প্রভাবশালী এই তিন দেশের স্বীকৃতি নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য শান্তি-প্রক্রিয়ার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। স্বাধীন ফিলিস্তিনের প্রতি বিশ্বজুড়ে সমর্থন বাড়লেও একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ স্বীকৃতিকে নিন্দা জানিয়ে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও হতাশা ব্যক্ত করা হয়। বর্তমানে ১৫০টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও নিরাপত্তা পরিষদে ভেটোক্ষমতা থাকা দেশগুলোর সমর্থন ছাড়া জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হওয়া সম্ভব নয়। ইসরায়েলের প্রধান মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এ প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছে এবং নিরাপত্তা পরিষদে বারবার ভেটো দিয়ে আসছে। গত বৃহস্পতিবার গাজায় যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে নিরাপত্তা পরিষদের আনা একটি প্রস্তাবেও যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেয়।
ফলে রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের মর্যাদা অর্জন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। নিরাপত্তা পরিষদের আনা খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গাজার মানবিক পরিস্থিতি বিপর্যয়কর। তাই গাজায় তাৎক্ষণিক নিঃশর্ত ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে প্রস্তাবে। এ ছাড়া মানবিক সহায়তা যাতে গাজাবাসীর কাছে অবাধে পৌঁছাতে পারে, সে আহ্বানও জানানো হয়। পাশাপাশি হামাস এবং অন্য গোষ্ঠীর হাতে থাকা সব জিম্মির মুক্তির শর্তও ছিল এতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দেওয়ায় প্রস্তাবটি পাস হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে প্রায় সবাই ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আবার বেশ কিছু দেশের স্বীকৃতি দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও দেশগুলো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের কারণে অবস্থান নিতে ভয় পায়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার্ক বলেন, এ স্বীকৃতি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে পুনরুজ্জীবিত করতে নেওয়া একটি পদক্ষেপ, যা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়ের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি হামাসের জন্য কোনো পুরস্কার নয়, বরং শান্তি-প্রক্রিয়ার প্রতি প্রতিশ্রুতি। একই সঙ্গে তিনি গাজায় মানবিক সহায়তাপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ইসরায়েলকে সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিশ্রুতির প্রতি আমাদের অংশীদারত্ব প্রস্তাব করছি।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেন, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয়ের জন্য স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তার একমাত্র পথ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ ধরনের পদক্ষেপকে উগ্র ইসলামপন্থি গোষ্ঠী হামাসের জন্য ‘সন্ত্রাসের উপহার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীরা যুক্তি দেন, দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির আশা বাঁচিয়ে রাখার জন্য স্বীকৃতি দেওয়ার এ কাজটি করা একটি নৈতিক দায়িত্ব ছিল।
আমরা মনে করি, ফিলিস্তিন জাতির নিরাপদ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। দীর্ঘকাল ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসন চলছে। সেখানে মানবতাবিরোধী গণহত্যা চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের নিঃশেষ করার চক্রান্তে ইসরায়েল লিপ্ত রয়েছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের উচিত মানবতার পক্ষে থাকা এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে সমর্থন দেওয়া। তা হলেই মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত সমাধান হবে।