সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিআরটিএ থেকে সবচেয়ে বেশি হয়রানি এবং দুর্নীতির শিকার হতে হয় সেবা গ্রহণকারীকে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত সিটিজেন পারসেপশন সার্ভেতে এ তথ্য জানা গেছে। এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিআরটিএর ডিজিটাল নম্বরপ্লেট দুর্নীতির নানা তথ্য। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট পেতে ভোগান্তির শেষ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি।
বিআরটিএর একদল কর্মকর্তা মিরপুর, উত্তরা, ইকুরিয়া ও পূর্বাচল শাখা থেকে সারা দেশে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। তারা প্রতি মাসে ২৫ লাখ টাকার মতো লুটপাট করছেন বলে দুদকের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দুদকের অনুসন্ধানী তথ্যমতে, বিআরটিএর চারটি কার্যালয় থেকে সারা দেশে নম্বরপ্লেট পাঠানো হয়। এরপর নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত যে অর্থ আদায় করা হয় তার হিসাব-নিকাশ করেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা। তারা প্রত্যেকের লাভের অংশ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করেন। বিআরটিএর প্রতিটি সার্কেল থেকে মাস শেষে কত টাকা ওঠে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে তারা।
বিআরটিএর ডিজিটাল নম্বরপ্লেট বানাতে কারিগরি সহায়তা দেয় টাইগার আইটি। এখানেও কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা এই দুর্নীতিতে জড়িত। এর আগে বিআরটিএর ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রমে নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল টাইগার আইটির বিরুদ্ধে। ২০১২ সাল থেকে এই কার্যক্রমে টাইগার আইটি যুক্ত হয়। পরে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে এ কার্যক্রমে টাইগার আইটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে বিআরটিএ। কিন্তু রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন ভেহিক্যাল নম্বরপ্লেটের কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের টাইগার আইটির চুক্তি এখনো বাতিল হয়নি। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের প্রকল্পেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে টাইগার আইটির বিরুদ্ধে।
বিশ্বব্যাংক ২০১৯ সালে এ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে। এমন ঘটনার পরও বিআরটিএ টাইগার আইটি থেকে কারিগরি সহায়তা নিচ্ছে বলে অভিযোগ এসেছে। ডিজিটাল নম্বরপ্লেট জালিয়াতিতে কতিপয় কর্মকর্তা সিন্ডিকেট করে এ ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ এসেছে। দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে খোদ পরিচালকের বিরুদ্ধেও।
বিআরটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার তথ্যমতে, বিআরটিতে নিবন্ধিত কোনো গাড়ির কমার্শিয়াল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে গেলে নিয়ম অনুযায়ী ফি দিতে হয় প্রায় ৩ হাজার টাকা। মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট স্থানান্তরে ফি দিতে হয় ২ হাজার ২৬০ টাকা, নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর করতে ফি দিতে হয় ৫৫৫ টাকা। দুদকের প্রতিবেদন বলছে, তারা কমার্শিয়াল নম্বরপ্লেট স্থানান্তর করতে নির্ধারিত ফিসহ ৫ হাজার টাকা, মিডিয়াম নম্বরপ্লেট স্থানান্তরের ফিসহ ৪ হাজার টাকা, মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট স্থানান্তরের ফিসহ ৩ হাজার টাকা, নিবন্ধন সনদ হস্তান্তর করতে ফিসহ ২ হাজার টাকা আদায় করছেন। বিআরটিএর প্রতিটি সার্কেল থেকে প্রতি মাসে ঠিক কত টাকা এভাবে লুটপাট হচ্ছে, সেটি স্পষ্ট নয়। তবে দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিজিটাল নম্বরপ্লেট দুর্নীতির হোতারা প্রতি মাসে ২৫ লাখ টাকার মতো লুটপাট করছেন।
বিআরটিএর চেয়ারম্যান আবু মমতাজ মো. সাদ উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, দুদক থেকে এখনো কোনো চিঠি আমার কাছে এসে পৌঁছায়নি। বিআরটিএর নানা দুর্নীতির তথ্য পাচ্ছি। সব অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা হবে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিআরটিএর নম্বরপ্লেট জালিয়াতিতে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে দুর্নীতির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার বিষয়টি সামনে এসেছে। জনদুর্ভোগ, বাড়তি ব্যয়, ঘুষ, অনিয়ম, দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতা সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের পিছু ছাড়ছে না। এর পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। তারা নানা অজুহাতে সেবা গ্রহীতাদের ভোগান্তি সৃষ্টি করেন। তারা সাধারণ নাগরিকদের অধিকার হরণ করছেন। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সরকারকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যারা দোষী বা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।