জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে নাগরিকবান্ধব সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে তিনি জানান। সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা সমস্যা তিনি তুলে ধরেন। ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামোকে পুনর্গঠন করে জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্রয়োজন ছিল ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের। তিনি আরও জানান, আমাদের জন্য সহজ পথ ছিল নির্বাহী আদেশে সংস্কার করা, কিন্তু আমরা বেছে নিয়েছি কঠিন পথ- অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পথ।
আমাদের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে আর কোনো স্বৈরশাসকের আবির্ভাব হবে না। সরকার ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ছয়টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরির পরিকল্পনা করছে। সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর মতভিন্নতার কারণে একটু সময় লাগছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সঠিক সময়ে নির্বাচন না হলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে জাতীয় নিরাপত্তা। প্রধান উপদেষ্টাও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান ও তহবিল বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী রোহিঙ্গারা আর তাদের পরে বৃহত্তম ভুক্তভোগী হলো বাংলাদেশ। তবে রোহিঙ্গা সংকট কোনোভাবেই বাংলাদেশের সঙ্গে মায়ানমারের কোনো দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়। রাখাইনে স্থিতিশীলতা আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যেকোনো যৌথ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সদা প্রস্তুত। ভাষণে জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক শ্রম ও সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পোশাকশিল্পকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ উল্লেখ করে বলেন, ভবিষ্যৎ সরকার যে-ই হোক, খাতটির প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই হবে।
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম ও সংস্কার প্রচেষ্টাকেও স্বীকার করেন। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সরকারের সংস্কার পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে ভবিষ্যতে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। দেশের পাচার হওয়া অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধার করা বর্তমান সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার বলে তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ভাষণ বর্তমান সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক। বর্তমানে বাংলাদেশে যখন নির্বাচন নিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন ও সংস্কার কার্যক্রমের প্রতি সময়াবদ্ধ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, তখন সরকারের তরফ থেকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতির সামনে উপহার দেওয়া একটি বড় এজেন্ডা। এখন রাজনৈতিক দলগুলোকে দেশের বহুল প্রতীক্ষিত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। নির্বাচনে যাতে সব দল অংশগ্রহণ করতে পারে, তাও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই দেশ আবার গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরবে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে।