আজ শারদীয় দুর্গাপূজার শেষ দিন। বিজয়া দশমী। পূজার এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই প্রচলন ঘটেছে দুর্গোৎসবের। এটি বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। পূজার চিরায়ত ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এ এক অনুপম প্রীতিময় আনন্দ উৎসব। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির জয়ের মধ্য দিয়ে সত্য ও সুন্দরের উন্মেষ শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সর্বজীবের মঙ্গল আবাহন এর মূল সুর। বৈষম্য, ভেদাভেদ ও অবিচার দূর করার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত হয়ে অন্যায় অসত্যের প্রতিবাদ, হানাহানিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রেমের শিক্ষাই দুর্গোৎসবের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। দুর্গাপূজা তাই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, মানুষের মধ্যে ঐক্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার সর্বজনীন অনুষ্ঠান।
পৌরাণিক তথ্য অনুযায়ী রামচন্দ্রের অকালবোধনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা শুরু হয়েছিল। বঙ্গভূমিতে সম্রাট আকবরের শাসনামলে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা প্রচলন করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে নবদ্বীপে জন্মেছিলেন স্মার্ত নৈয়ায়িক রঘুনন্দন ভট্টাচার্য। তার লেখা ‘স্মৃতিতত্ত্ব’ শীর্ষক বইতে দুর্গোৎসব তত্ত্বের উল্লেখ আছে। দুর্গাকেন্দ্রিক ধর্মকর্মের সামাজিক বিধিকে ‘উৎসব’ অভিধায় অভিহিত করেছিলেন তিনি। পরে কলকাতার রাজা সাবর্ণ রায় চৌধুরী পারিবারিক দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। সেই থেকে এ অঞ্চলে দুর্গাপূজা ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে পরিণত হয় সর্বজনীন লোকায়ত উৎসবে।
দুর্গা অসুরের বিরুদ্ধে শুভশক্তির প্রতীক। মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠাই তার লক্ষ্য। প্রতিবছর শরৎকালে হিমালয়ের কৈলাস ছেড়ে দুর্গা দেবী মর্ত্যে আসেন। ভক্তদের কল্যাণে শত্রুর বিনাশ ও সৃষ্টিকে পালন করার অভিলাষ পূর্ণ করে আবার কৈলাসেই ফিরে যান।
এবার ষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল পাঁচ দিনের পূজার আনুষ্ঠানিকতা। ষষ্ঠী পূজায় ভক্তরা দেবীবন্দনা করেছেন। মহাসপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে অর্থাৎ ষোলোটি উপাদানে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সপ্তমীর দিন এক শ আট প্রকার দ্রব্যসামগ্রী দিয়ে নবপত্রিকা স্নান অন্তে দেবীকে আসনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সকালে কুমারী পূজা, অঞ্জলি প্রদান ও রাতে সন্ধি পূজার মধ্য দিয়ে শেষ হয় মহা-অষ্টমীর দিনটি। হিন্দু শাস্ত্রমতে নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকুল সম্পদ লাভ করে। শাপলা-শালুকসহ নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে নবমী পূজা পালিত হয়। শাস্ত্রমতে, নবমীতেই দেবীবন্দনার সমাপ্তি। যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে প্রতীকী আহুতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় নবমী।
গতকাল ছিল সেই নবমী। নবমীর উচ্ছ্বাস-আনন্দের পরই বিদায়ের করুণ সুর নিয়ে এসেছে বিজয়া দশমী। আজই জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার মঙ্গল এবং হিত কামনায় শেষ হচ্ছে দুর্গোৎসব।
দুর্গতিনাশিনী দেবী এবার মর্ত্যলোক ছেড়ে স্বর্গশিখর কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরে যাবেন। পেছনে ভক্তরা উদ্বেল হয়ে উঠবেন আনন্দ-অশ্রু ও শ্রদ্ধায়। রেখে যাবেন আগামী বছরে ফিরে আসার অঙ্গীকার। এভাবে প্রতিবছর তিনি অকল্যাণের বিরুদ্ধে কল্যাণের প্রতিমূর্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। বাঙালি সমাজের মাতৃরূপ ও শক্তিরূপের সম্মিলন ঘটেছে দুর্গার মধ্যে। দুর্গা দুর্গতিনাশিনী, ত্রাতা। মানবের পরম আশ্রয়। হিন্দুদের কাছে দুর্গা ভয়ংকর সুন্দর রূপে পূজিত হন।
বাংলাদেশে আবহমান কাল থেকে দুর্গোৎসব ধর্মীয় আনন্দানুষ্ঠান হিসেবে পালিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই উৎসবের আবার সামাজিক দিকটিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দুর্গাপূজাকে ঘিরে আয়োজিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা। পূজামণ্ডপে যে অনুষ্ঠান হয়, তারও সাংস্কৃতিক মাত্রা আছে। হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদেরও দেখা যায় এই পূজা, মেলা ও মণ্ডপকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্পর্কে আরও ঘনিষ্ঠ হতে। দুর্গোৎসব পরিণত হয় হিন্দু-মুসলমানের মিলনমেলায়।
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’- আবহমান কালের এই ছবি এ দেশের মানুষের মর্মকথা। বিজয়া দশমীর এই দিনটিতে আমাদের সবার নতুন করে এই কথাটা স্মরণ করা উচিত। জাতিগতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখাটা আমাদের জন্য জরুরি। পূজা আমাদের সেই সুযোগ এনে দেয়। মাঝে মাঝে বিভেদের যে বিষবাষ্প আমাদের সম্পর্ককে বিনষ্ট করতে উদ্যত হয়, কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী মহল থেকে যা উসকে দেওয়া হয়, সে সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের সার্বিক সমৃদ্ধি, মানুষের সুখ, শান্তি, কল্যাণ ও অগ্রগতির জন্য এটা জরুরি। বিজয়া দশমীর দিনে সব অশুভের বিরুদ্ধে শুভের মানবিক উদ্বোধনই হোক জাতিগত প্রত্যয়।
সবাইকে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা।