আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সংঘাত ও সহিংসতামুক্ত রাখতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। একই সঙ্গে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা দূর করতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ভোট আয়োজনের তাগিদ দিয়েছেন তারা। এ ছাড়া রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলেও দলটির ব্যাপারে ইসির অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানানো হয়। গত সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সম্মেলনকক্ষে দিনব্যাপী ইসির সঙ্গে সংলাপে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা এসব পরামর্শ দেন। একটা অন্তর্ভু্ক্তিমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের এগুলোই পূর্বশর্ত বলে আমরা মনে করি।
খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নির্বাচনকে ঘিরে যেসব সংকট দেখা দিতে পারে সেই সংকটের কথাই সাংবাদিকরা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, কী ধরনের নির্বাচনের আয়োজন করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন সে বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কী ভূমিকা পালন করবে, তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই নির্বাচনে।
সবার আগে সাংবাদিকরা গুরুত্ব দিয়েছেন অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ওপর। সেক্ষেত্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিষয়ে ইসির কী অবস্থান তা স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ। তিনি বলেছেন, দলটির সমর্থক ভোটাররা এ দেশের নাগরিক। তাদের বাদ দিয়ে নির্বাচন হতে পারে না। দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান বলেছেন, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিযোগিতামূলক বলে দুটি শব্দ আছে। ইসির জন্য এটা চ্যালেঞ্জ যে, একটি দল নির্বাচন করতে না পারলে তাদের সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে আসবেন কি না। নির্বাচনকে যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করা যায় এবং মানুষকে উৎসাহিত করা গেলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে। ভোটারদের এই অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে দৈনিক খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি এখন পরিবার-পরিবারে শুরু হয়ে গেছে। মব সন্ত্রাসের কারণে অনেকে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করায় বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন। আমরা এখন এমন এক বাংলাদেশ দেখছি, যা অচেনা। আমাদের বহুকালের পূর্বপরিচিত সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্থাপনা; যেগুলো বাঙালি সংস্কৃতির অংশ, সেগুলো ধ্বংস হয়েছে। একটা নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচন যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তাহলে দেশের সমাজব্যবস্থা আরও বিভাজনের দিকে যাবে এবং তা সংঘাত কিংবা সংঘর্ষের ইঙ্গিত বহন করছে। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাতির এই ক্রান্তিকালে তাদের ভূমিকাই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে। দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন নির্বাচনের বাইরে থেকে যাচ্ছে উল্লেখ করে মোস্তফা কামাল বলেন, সাধারণ মানুষের কোনো দোষ নেই। তারা ফ্যাসিস্ট না। উৎসবমুখর নির্বাচনের উৎসব অর্ধেক মানুষকে বাইরে রেখে হতে পারে না। অতীতে অনেকেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি; সাধারণ মানুষের এতে কোনো দোষ নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা; এই বিষয়গুলো এখন বিশেষভাবে ভাববার বিষয়।
আমরাও মনে করি, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের মূল কথা এটাই; বেশিরভাগ মানুষের অংশগ্রহণ। বিগত বেশিরভাগ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি বলে সংঘাত লেগেই ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি বলেই নানা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিগত সরকারের পতন ঘটেছে।
সাংবাদিকরা সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে এমন বেশ কিছু সমস্যা চিহ্নিত করে তা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেছেন, অর্থের প্রভাব বিগত নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনেও দেখা যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। মনোনয়ন-বাণিজ্য, প্রযুক্তির অপব্যবহার, প্রশাসনিক-প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থির অবনতি, ভয়-ভীতি, মাঠ নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতার অভাব নির্বাচনকে কঠিন করে তুলতে পারে। নির্বাচনে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে চালানো অপপ্রচার।
সাংবাদিকরা এই সংলাপে গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে গণমাধ্যমের নীতিমালা দাবি করেছেন। এক্ষেত্রে ইসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, এই নির্বাচন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গতিপথ নির্ধারণ করবে। নির্বাচন ভালো না হওয়া ছাড়া তাদের কাছে কোনো বিকল্প নেই। আয়নার মতো স্বচ্ছ নির্বাচন তারা করতে চান। তিনি এজন্য গণমাধ্যমের সহযোগিতা, মতামত ও পরামর্শ চেয়েছেন। সাংবাদিকরা এই সংলাপে নির্বাচন কীভাবে উৎসবমুখর হতে পারে, সেই পরামর্শই দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন এখন এই পরামর্শগুলো গ্রহণ করে কাজে লাগাবে বলে আমরা আশা করছি।
আসন্ন নির্বাচন হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। এই সরকারের কোনো দল নেই। নির্বাচন কমিশনের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো দলীয় চাপও থাকবার কথা নয়। গত দেড় দশকে নির্বাচন কমিশন যে ভাবমূর্তি সংকটে ছিল, এবারই তা থেকে বেরিয়ে আসার উপযুক্ত সময়। এই নির্বাচন কমিশন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ একটি নির্বাচন জাতিকে উপহার দেবে বলে আমরা আমরা আশা করি। দেশের ভবিষ্যতের জন্য এটা জরুরি। জাতি সেরকম একটা নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে।