সম্প্রতি উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। এখন শুধু রাজধানী ঢাকা বা নগরগুলোতেই নয়, মফস্বল শহর ও গ্রামেও এ ধরনের অপরাধীদের তৎপরতা বেড়েছে। মহাসড়কে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ ডাকাতরা। অনেক সময় সশস্ত্র দলবল নিয়ে প্রকাশ্যে হানা দিচ্ছে তারা। গত ৩ অক্টোবর সিরাজগঞ্জে যমুনা সেতুর পশ্চিম-অংশে সশস্ত্র ডাকাতরা যানবাহন থামিয়ে লুটপাট-তাণ্ডব চালায়। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হন। গত মঙ্গলবার ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ফেনীর ছাগলনাইয়া এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অভিযান চালিয়ে তিন ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে হাইওয়ে পুলিশ। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে রাজধানীর মৌচাকে ফরচুন মার্কেটে এক দুর্ধর্ষ ডাকাতি হয়েছে। গ্রিল কেটে ডাকাতরা প্রায় ৫০০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়। এর বাইরেও সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি দুর্ধর্ষ ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের খবর জানা গেছে। এতে করে জনমনে উদ্বেগ-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীতে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে কেউ কেউ বলছেন, দিন বা রাত নয়, যেকোনো সময়ে বাসা থেকে বের হলেই এখন ছিনতাইকারীর আতঙ্কে ভুগছেন তারা। রাত হলে বাসাবাড়িতে ডাকাতির ভয়। এলাকায় চোখের সামনে দেখছেন অল্প বয়সী তরুণরা রিকশাযোগে বা মোটরসাইকেলে করে ধারালো অস্ত্র বা চাপাতি নিয়ে হানা দিচ্ছে। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তেমন তৎপরতা না থাকায় ছিনতাইকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এমন ভীতিকর অবস্থা থেকে স্থায়ী মুক্তি জরুরি।
গত বুধবার ডিএমপির গণমাধ্যম শাখা খবরের কাগজকে জানিয়েছে, গত ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে ডাকাতির ঘটনায় ৪৩টি মামলা হয়েছে। অন্যদিকে গত বছর ২০২৪ সালে (১২ মাসে) রাজধানীতে ডাকাতির ঘটনা ছিল ৪১টি। তার আগের বছর ২০২৩ সালে ৩৪টি। ২০২২ সালে ২৭টি, ২০২১ সালে ২৩টি এবং ২০২০ সালে ২১টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ডিএমপির ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের গত ৯ মাসে রাজধানী ঢাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৭৩টি। এর বাইরেও চুরি, ধর্ষণ, খুনসহ অধিকাংশ অপরাধ তুলনামূলক বাড়তির দিকে রয়েছে বলে জানা যায়। এ প্রসঙ্গে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ডাকাতি ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশ তৎপর রয়েছে। রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় ডিএমপির ক্রাইম বিভাগ, ডিবি, সিটিটিসিসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো নিয়মিত টহল, মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনা করে আসছে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোয় ‘ব্লক রেইড’ পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ জনগণকেও সচেতনতামূলক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, পেশাদার অপরাধীরা কিছু বিষয় মাথায় রেখে সব সময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সেভাবে বলিষ্ঠ বা কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। পাশাপাশি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে পেশাদার ওই সব অপরাধী। তাই কঠোর বা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হলে এসব অপরাধ কমে আসবে। এর বাইরেও মানুষ এমন ভয়াবহ অপরাধে কেন জড়াচ্ছে, সেসব বিষয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা রাষ্ট্রকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও গবেষণা করতে হবে। সে অনুসারে অপরাধ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পেশাদার অপরাধীরা তৎপর হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ডাকাতি ও ছিনতাই রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।