প্রিয় এসএসসি পরীক্ষার্থীরা শুভেচ্ছা নিও। পরীক্ষায় বাংলা দ্বিতীয় পত্র বিষয়ে ভালো ফলাফল করতে যা মনে রাখবে তা হলো-
অনুচ্ছেদ লিখন
প্রশ্নে উল্লেখিত অনুচ্ছেদের বিষয়টি WH Question-এ (5W+1H Formula) কী, কে / কারা, কখন, কোথায়, কেন, কীভাবে প্রশ্নের উত্তর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি প্রাসঙ্গিক দিক আলোচনা করে ইতিবাচক কথায় মূল্যায়ন করে সংক্ষেপে এক প্যারায় লিখতে হবে।
ব্যক্তিগতপত্র ও আবেদনপত্র
সনাতন পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত পত্রের ৬টি অংশ। যথা: ১. স্থান ও তারিখ, ২. মঙ্গলসূচক শব্দ কিংবা বাক্য, ৩. সম্বোধন, ৪. মূল পত্রাংশ / মূলবক্তব্য ৫. পত্র লেখকের নাম-স্বাক্ষর ও ৬. শিরোনাম / খামে প্রেরক ও প্রাপকের ঠিকানা।
ব্যক্তিগত পত্র লিখতে হলে ব্রিটিশ/সনাতন পদ্ধতিতে শুরুতে খাতার ওপরে তারিখ ডান দিকে লিখতে হবে। এনসিটিবির বোর্ড বইয়ের নির্মিতি অংশে মঙ্গলসূচক শব্দ কিংবা বাক্য কয়েক বছর ধরে ব্যবহার নেই। যার কাছে লিখবে, তাকে সম্বোধন করে ডাক নামে ও ছোট নামে (যেমন- প্রিয় সাজু) লেখার পর ঠিক তার নিচে সালামসহ কুশল বিনিময় করার কথা লেখা ভালো। এরপর দুটি বা তিনটি প্যারায় প্রাসঙ্গিক কথার বিবরণী বা মূল বক্তব্য উপস্থাপন তুলে ধরে শেষের প্যারায় প্রাপকের পরিবারের সদস্যদের সালাম শুভেচ্ছা দিয়ে নিচে ডান দিকে বিদায় সম্ভাষণ জানাতে ইতি লিখে সংক্ষিপ্ত প্রতীকী নাম (যেমন- রাজু) লেখা উত্তম। তবে পরীক্ষার প্রশ্নে কোনো নাম উল্লেখ থাকলে সেই নামই লিখতে হবে। আর সবশেষে খাম অঙ্কন করে ডান দিকে ডাকটিকিট লিখে নিচে বামে প্রেরক ও ডানে প্রাপকের প্রতীকী ঠিকানা লিখতে হবে।
উল্লেখ্য, প্রশ্নে প্রাপকের প্রবাসী ঠিকানা থাকলে খামের ভেতরের সম্পূর্ণ অংশ ইংরেজি ক্যাপিটাল অক্ষরে লেখা উচিত। এক্ষেত্রে খামের উপরে By Air Mail ও ডানে Stamp কিংবা মেশিনের সাহায্যে ছাপ মারার Post এবং প্রেরকের জায়গায় From ও প্রাপকের জায়গায় To লিখে ইংরেজিতে পুরো ঠিকানা পোস্টাল কোডসহ লেখা উচিত।
আবেদনপত্র লিখতে হলে ব্রিটিশ পদ্ধতি (ডান-বাম দিক) কিংবা যুক্তরাষ্ট্রীয়/আধুনিক পদ্ধতিতে (সব বাম দিক) যেকোনো একটা পদ্ধতিতে অনুসরণ করে লেখা উচিত। আধুনিক নিয়মে শুরুতে তারিখ লেখার সময় ১লা, ২রা, ৪ঠা, ৫ই, ২২শে ইত্যাদি না লিখে শুধু সংখ্যা (জানুয়ারি ৯, ২০২৪ কিংবা ০৯.০১.২০২৪) লেখাই উত্তম। তবে অন্য ক্ষেত্রে বর্ণনায় ইতিহাসের ঐতিহ্য হিসেবে শুধু পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ- এগুলো লেখা যেতে পারে। আর সাল বা সন লেখার পর বাং কিংবা ইং লেখা ঠিক নয়। হয় খ্রিষ্টীয় সালকে খ্রিষ্টাব্দ, নতুবা বাংলা সনকে বঙ্গাব্দ লেখা উচিত। কোনোমতেই ডট চিহ্নের (.) পরিবর্তে অনুস্বার ব্যঞ্জনবর্ণ লেখা যাবে না। পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের আবেদনপত্র অংশে পরীক্ষার্থীর নাম ও বিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ না থাকলে খাতায় বিদ্যালয়ের নাম ও ঠিকানা এবং নিজের নাম প্রতীকীভাবে (যেমন- ক, খ ইত্যাদি) লেখা ভালো। মাধ্যম: শ্রেণিশিক্ষক না লিখলেও চলবে; তবে লেখা উত্তম। এরপর বিষয় লিখে বিসর্গ না লিখে কোলন (:) দিয়ে সংশ্লিষ্ট আবেদনের কথাটি লিখে পুরো বাক্যটির নিচে আন্ডারলাইন করা উত্তম। ‘জনাব’ (Mr.) শব্দ ব্যবহার না করে ‘মহোদয়’ (Sir) শব্দ ব্যবহার করা উত্তম। ‘বিনীত’ শব্দটি বাংলা ভাষায় বিশেষ করে আবেদনপত্রে যুগের পর যুগ বিভিন্ন বইয়ে প্রচলিত ভুল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন অভিধানেও ‘অনুরোধ’ অর্থে লেখা হচ্ছে। তবে, বিনীত লেখার পরেই সবিনয় লেখা কোনো মতেই উচিত হবে না। যেকোনো একটা লিখতে হবে। কারণ এতে একই অর্থে বাহুল্য দোষ হবে। আর ‘বাধিত’ শব্দটি না লিখে ‘মর্জি’/‘মঞ্জুর’ শব্দটি লেখাই বেশি ভালো। অনেক পরীক্ষার্থী বিনীত নিবেদক লিখে নিচে আপনার একান্ত অনুগত বাধ্যগত ছাত্র লিখে থাকে। কিন্তু লেখা উচিত- নিবেদকের নিচে আপনার অনুগত ছাত্র/শিক্ষার্থী। ‘একান্ত’ খুব Personal কিছু বোঝায়, আর ‘বাধ্যগত’ শব্দটি ভুল। নিবেদকের নিচে আপনার অনুগত ছাত্র/শিক্ষার্থী লেখার পর নিচে অনুস্বাক্ষর দিয়ে নাম, শ্রেণি, শাখা, রোল লেখা উচিত। অবশ্য ছোট ক্লাসের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নমুনা স্বাক্ষর না দিলেও হবে। এ ছাড়া নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ছাড়া অন্য কোনো জায়গায় (যেমন- জেলা প্রশাসক) আবেদনপত্র ডাকযোগে পাঠানোর জন্য পোস্টাল কোডসহ ঠিকানা সংবলিত (বামে প্রেরক, ডান দিকে প্রাপক / বরাবর, তার একটু উপরে ও একটু ডানে ডাকটিকিট) খাম দিতে হবে। আবেদনপত্র এক পৃষ্ঠায় লেখা উচিত। অবশ্য ব্যক্তিগত পত্র দুই পৃষ্ঠার বেশি হলেও কোনো সমস্য নেই।
সারমর্ম ও সারাংশ
১. প্রথম বাক্যটি সরল বাক্যে সুসংহত, নির্ভুল, আকর্ষণীয় হতে হবে। এতে পরীক্ষক বেশি নম্বর দিতে আকর্ষিত হন।
২. প্রশ্নে ব্যবহৃত কোনো মনীষীর উদ্ধৃতি বা বাণী উল্লেখ করা যাবে না। মূলে প্রত্যক্ষ উক্তি থাকলে তা পরোক্ষ উক্তিতে সংক্ষেপে প্রকাশ করতে হবে।
৩. সারমর্ম/সারাংশ/সারসংক্ষেপ সম্পূর্ণ নিজের ভাষায় লিখবে।
৪. এখানে উপমা, রূপক, প্রতীকী ইত্যাদি ব্যবহার এবং উদাহরণ দেবে না। অন্যের কোনো উদ্ধৃতি ব্যবহার করবে না।
৫. একই ক্রিয়াপদ দিয়ে একাধিক বাক্য সমাপন, অপ্রয়োজনীয় বিশেষণ ব্যবহার, ক্রিয়া-বিশেষণ প্রয়োগ ইত্যাদি করবে না।
৬. প্রশ্নের গদ্যাংশ বা পদ্যাংশ থেকে কোনো বাক্য বা বাক্যাংশ হুবহু লিখলে নম্বর পাবে না।
৭. উদ্ধৃত গদ্যাংশ বা পদ্যাংশ অপ্রধান ভাবকে পরিহার করে মূলভাব লিখবে।
৮. সারমর্মে/সারাংশে উত্তম পুরুষ (যেমন- আমি) ও মধ্যম পুরুষ (যেমন- তুমি, তোমরা) সম্পূর্ণ বর্জনীয়। নাম পুরুষ (যেমন- আমাদের) লিখবে।
৯. সারাংশ বা সারমর্ম যেন মূল অংশের চেয়ে খুব বেশি ছোট বা বড় না হয়। সারমর্ম/সারাংশ মূলের সমান, অর্ধেক, এক-তৃতীয়াংশ বা তার কমও হতে পারে। মূল ভাবটি অল্পকথায় সহজ-সরলভাবে লিখবে।
১০. সারাংশ বা সারমর্ম একটি অনুচ্ছেদে লেখা বাঞ্চনীয়।
ভাবসম্প্রসারণ
মূলভাব সম্প্রসারণের সময় এবং তা সর্বজনীনরূপে উল্লেখকালে প্রয়োজনানুসারে ঐতিহাসিক, পৌরাণিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-দিতে পার। মূল বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপমা বা উদ্ধৃতি দেবে; তবে অন্য কোনো ভাষায় উদ্ধৃতি দিলে অর্থাৎ উদ্ধৃতিটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে দেবে। ভাবসম্প্রসারণে শুধু মনীষীদের নাম উল্লেখ না করে তাদের জীবনের প্রায়োগিক দিক তুলে ধরবে। ভাবসম্প্রসারণে তিন থেকে চারটি প্যারায় লেখা উত্তম। এর মধ্যে সর্বশেষ অনুচ্ছেদটি হবে সংক্ষিপ্ত ও উপসংহারসূচক। মন্তব্যে নিজস্ব মতামত লিখবে।
ভাবসম্প্রসারণ লেখার সময় যা মনে রাখবে-
১. উদ্ধৃতাংশের লেখকের নাম জানা থাকলেও তা উল্লেখ করবে না।
২. কোনো বিশেষ শব্দের পৃথক টীকা-টিপ্পনী বা ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
৩. ভাবসম্প্রসারণকে সারাংশের মতো আয়তনে ছোট এবং প্রবন্ধের মতো অতিদীর্ঘ করবে না।
৪. ভাবসম্প্রসারণে Sub-heading বা উপ-শিরোনাম (মূলভাব, সম্প্রসারিত ভাব ও মন্তব্য) লেখার প্রয়োজন নেই। ৩-৪ প্যারায় লিখবে।
৫. উদাহরণ দিতে হলে বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা প্রথম পত্রের গদ্য, কবিতা ও আনন্দপাঠের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অধ্যায়ের দিক, চরিত্র কিংবা মূল উপজীব্য তুলে ধরলে ভালো। বিদেশি ভাষার কোনো উদ্ধৃতি দিতে চাইলে, তা বাংলায় অনুবাদ করে লিখবে।
৬. প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন মনীষীর বাণী, প্রবাদ, পবিত্র ধর্মীয় উদ্ধৃতি (তথ্যসূত্রসহ), আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার পরিসংখ্যান, ঈশপের গল্প ইত্যাদি ছোট করে দেবে। দীর্ঘ উদ্ধৃতি বা বহু উদ্ধৃতি দেবে না।
৭. প্রাসঙ্গিক কোনো লেখকের বা মনীষীর উদ্ধৃতি দিলে, উদ্ধৃতিতে যেসব বাক্য আছে তা হুবহু লিখবে; অন্যথায় কম নম্বর পাবে।
৮. কোনো বাক্যে বিরামচিহ্ন ভুল লেখা যাবে না। যেমন: যেখানে দাঁড়ি (।) হবে সেখানে প্রশ্নবোধক (?) বা বিস্ময় সূচক (!) চিহ্ন দেওয়া যাবে না। উদ্ধৃতি তুলে ধরার সময় বাক্যের শুরু ও শেষে উদ্ধৃতি চিহ্ন (“----------”) না দিলে উদ্ধৃতিই হবে না।
সংবাদ প্রতিবেদন
ক. সংবাদ প্রতিবেদন লিখতে সম্পাদক/কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আবেদনপত্র লিখবে না।
খ. হেডলাইন (শিরোনাম) দিয়ে প্রতিবেদন লেখা শুরু করবে।
গ. এরপর ডেটলাইন (প্রতিবেদকের নাম/পদবি, স্থান ও তারিখ) লিখে প্রথম অনুচ্ছেদ লিখবে।
ঘ. মূল প্রতিবেদনের প্রথম অনুচ্ছেদটি 5W+1H Formula ব্যবহার করে সংক্ষেপে লিখতে হয়। অর্থাৎ W= What, W= Where, W= When, W= Who, W= Why ও H= How এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একত্রিত করে শিক্ষার্থী প্রথম অনুচ্ছেদটি লিখবে। প্রথম অনুচ্ছেদের পর একাধিক অনুচ্ছেদে ধারাবাহিকভাবে পুরো বিষয়টি বর্ণনা করবে।
ঙ. সংবাদ প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে উত্তম পুরুষে লেখার (যেমন: গিয়ে দেখলাম) দরকার নেই। ভাববাচ্যে (যেমন: গিয়ে দেখা গেল) লেখা বাঞ্ছনীয়।
চ. সংবাদ প্রতিবেদনে সাংবাদিক নিজস্ব মতামত দিতে পারবেন না; তথ্যদাতাদের মতামত তুলে ধরবে।
ছ. মূল প্রতিবেদন লেখা শেষে ‘বিনীত নিবেদক’, ‘ইতি’ এ ধরনের কথাগুলো লিখবে না।
জ. প্রতিবেদন লেখা শেষে প্রতিবেদকের স্বাক্ষর দেওয়া উচিত।
ঝ. প্রতিবেদন লেখায় কোনো খাম দিবে না। তবে প্রতিবেদন সম্পর্কিত তথ্য-ছক দেওয়া যেতে পারে।
প্রবন্ধ রচনা
প্রবন্ধ রচনায় খুব অল্প সময়ে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব নয়। তার জন্য নিয়মিত অনুশীলন প্রয়োজন। প্রবন্ধ রচনায় ভালো নম্বর পেতে যা মনে রাখবে তা হলো- প্রশ্নে উল্লেখ করা পয়েন্টগুলোর আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে বিভিন্ন কবিতার চরণ দিতে পার এবং বিভিন্ন তথ্যসূত্র (যেমন- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন দিবসের ক্রোড়পত্র, বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার রিপোর্ট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা জার্নাল ইত্যাদি) তারিখসহ সাল উল্লেখ করবে।
• আধুনিক বানান বাদ দিয়ে পুরোনো বানান না লেখাই ভালো।
• রচনায় সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ ঘটানো যাবে না।
প্রত্যেক উত্তরের শেষে রিভিশন দেবে। কেননা এতে ভুল সংশোধন করতে পারবে।
নৈর্ব্যক্তিক অভীক্ষায় উত্তরপত্রে দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী সঠিকভাবে বৃত্ত ভরাট করবে। একই প্রশ্নোত্তরে একের অধিক বৃত্ত ভরাট করবে না। উল্লেখ্য, নৈর্ব্যক্তিক অংশে ভালো নম্বর পেতে বোর্ডের বাংলা ব্যাকরণ বইটি ভালোভাবে পড়বে। আর নির্মিতির জন্য ড. হায়াৎ মামুদ সম্পাদিত ‘ভাষা- শিক্ষা বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও রচনা রীতি’সহ অন্যান্য লেখকের বইয়ের সহায়তা নেবে।
• রচনা পয়েন্ট করে লিখলে বেশি নম্বর পাবে।
লেখক: সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা)
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ
মতিঝিল, ঢাকা
জাহ্নবী