হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নিয়মিত আয়ের একমাত্র উৎস ছিল মাসে ১১৩ ডলারের সেনা পেনশন। পরে তিনি লিখেছিলেন, প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদা ও মর্যাদাকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। কয়েক দশক পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগে নিজের বিনিয়োগ ‘ব্লাইন্ড ট্রাস্টে’ দিয়েছিলেন, যেন দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থের প্রশ্ন না ওঠে। কিন্তু সেই প্রচলিত ধারা থেকে একেবারেই ভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রথম বছরেই ট্রাম্প অন্তত ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন। ইতিহাসবিদদের মতে, দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্রে এমন নজির আগে দেখা যায়নি। এটি প্রেসিডেন্টদের ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলার দীর্ঘদিনের রীতিকেও ভেঙে দিয়েছে।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলার সেন্টারের প্রেসিডেন্ট বিষয়ক ইতিহাসবিদ বারবারা পেরি বলেন, ‘এমন কোনো নজির নেই। প্রেসিডেন্সির ইতিহাসে আমরা এর মতো কিছু কখনো দেখিনি।’
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে ট্রাম্পের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সি। শুধু এই খাত থেকেই তিনি প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন। এর মধ্যে ‘ডলার চিহ্ন খচিত ট্রাম্প’ মিম কয়েনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেলিব্রেশন কয়েনস থেকে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার রয়্যালটি পেয়েছেন। এ ছাড়া তার দুই ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্পের সহপ্রতিষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল ব্যবসা থেকে ৫০ কোটির বেশি ডলার আয় দেখিয়েছেন।
ট্রাম্পের ২০২৫ সালের এই আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় চার গুণ। ২০২৪ সালে তিনি ৬২ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় দেখিয়েছিলেন।
এদিকে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিপ্টো ব্যবসার পাশাপাশি ট্রাম্পের ফ্লোরিডার দুটি বিলাসবহুল রিসোর্ট মার-আ-লাগো ও ট্রাম্প ন্যাশনাল ডোরালও রেকর্ড আয় করেছে। মার-আ-লাগো থেকে তার আয় হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি। আর ডোরাল থেকে এসেছে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার।
পুনর্নির্বাচনের আগে ট্রাম্প মার-আ-লাগোর সদস্যপদের ফি ১০ লাখ ডলারে উন্নীত করেন। গত বছরের শুরু থেকে তিনি সেখানে দুই ডজনের বেশিবার গেছেন। রিসোর্টটিতে বিদেশি অতিথিদের সংবর্ধনা, রিপাবলিকান পার্টির তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক আয়োজন হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে প্রেসিডেন্টের কাছে বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর সহজে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আনা কেলি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট বা তার পরিবার কখনো স্বার্থের সংঘাতে জড়াননি এবং ভবিষ্যতেও জড়াবেন না। তার দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের সব সিদ্ধান্তই যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস গ্রান্টের আমলে সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ওয়ারেন হার্ডিংয়ের সময় ঘটে টিপট ডোম কেলেঙ্কারি। তবে এসব ঘটনায় প্রেসিডেন্টদের ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্বে থেকে লাভবান হওয়ার অভিযোগ ওঠেনি।
আধুনিক সময়েও কয়েকজন প্রেসিডেন্টের স্বজনদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। জিমি কার্টারের ভাই একটি বিয়ার ব্র্যান্ডের প্রচার করেছিলেন। জো বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার ছেলে হান্টার বাইডেন ইউক্রেনের একটি জ্বালানি কোম্পানি থেকে অর্থ আয় করেছিলেন। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এসব ঘটনার সঙ্গে ট্রাম্প ও তার পারিবারিক ব্যবসার বর্তমান আয়ের তুলনা চলে না।
বারবারা পেরি বলেন, ‘দায়িত্বে থেকে বিপুল অর্থ আয় করা আইনবিরোধী না হলেও এটি নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে। অতীতের বেশির ভাগ প্রেসিডেন্ট এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন।’
প্রথম মেয়াদের আগে ট্রাম্প তার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ দুই ছেলের হাতে দিলেও অন্য প্রেসিডেন্টদের মতো সম্পদ ব্লাইন্ড ট্রাস্টে দেননি। দ্বিতীয় মেয়াদের আগেও একই ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়। ট্রাম্প অর্গানাইজেশন বলেছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাম্প প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রমে যুক্ত নন।
তবে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, দায়িত্বে ফিরে ট্রাম্প এমন কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা তার ব্যবসার জন্য লাভজনক হয়েছে বলে সমালোচকদের অভিযোগ। তিনি স্টেবলকয়েন-সমর্থিত একটি আইনে সই করেন। পরে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাওকে ক্ষমাও করেন। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ তার ক্রিপ্টো ব্যবসার জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের সাবেক প্রধান হোয়াইট হাউস নৈতিকতা আইনজীবী রিচার্ড পেইন্টার বিবিসিকে বলেন, ‘অবশ্যই এটি স্বার্থের সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, তাদের প্রেসিডেন্ট দায়িত্বে থেকে এত বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন।’
অন্যদিকে গত বুধবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি লাভ করছি কেন জানেন? কারণ শেয়ারবাজার বাড়ছে। সবাই লাভ বাড়ছে।’ তিনি দাবি করেন, তার অর্থ বিভিন্ন তহবিল পরিচালনা করে এবং পরিবারের ব্যবসার দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে তিনি জড়িত নন। সূত্র: বিবিসি, সিএনএন