ঢাকা ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
স্পটকিকের স্পন্দন, তারকাদের হোঁচট আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে কোন জার্সি পরে খেলবে স্পেন? মেসিকে বোতলবন্দি করার ‘মাস্টারপ্ল্যান’! গুগলে কুকুরেয়ার নাম লিখলেই মিলবে মজার চমক বিশ্বকাপ ফাইনালে যে একাদশ নিয়ে নামতে পারে আর্জেন্টিনা মেসিকে থামানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: মিকেল মেরিনো বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে কোন জার্সি পরবে আর্জেন্টিনা? ইয়ামাল-পোরোকে নিয়েই পরিকল্পনা স্পেনের যেভাবে ফাইনালে পৌঁছাবে বিশ্বকাপের বিশেষ ট্রফি ওয়াহবির অধীনেই ২০৩০ বিশ্বকাপ খেলবে মরক্কো উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ: আবুল হাসনাত ছিলেন মননের নির্মাতা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড: ৬০ বছরের অপূর্ণতার গল্প কঙ্গোয় মরদেহ পরিবহনে ইবোলা ছড়ানোর নতুন ঝুঁকি: জাতিসংঘ শেখ হাসিনাকে ফেরানোর অনুরোধ খতিয়ে দেখছে ভারত: জয়সওয়াল মেক্সিকো উপকূলে ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প ২ মাসের শিশুর পা মুচড়ে দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত চাচি গ্রেপ্তার না ফেরার দেশে ক্রিকেট কিংবদন্তি স্যার গ্যারি সোবার্স সেই মেটলাইফেই শিরোপার লড়াইয়ে মেসি জাতিসংঘে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী: জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার সংকট কাটিয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে: মির্জা ফখরুল ফরিদপুরে কলেজছাত্র হত্যা, প্রতিপক্ষের বাড়িতে তাণ্ডব স্কুলের জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ এনসিপি নেতা কাফির বিরুদ্ধে হিলিতে কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির উদ্বোধন কাশিমপুর কারাগার থেকে নারী বন্দী উধাও! সিরিজে সমতা আনল বাংলাদেশ হাতিয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে তিন ওয়ার্ড প্লাবিত, চরম দুর্ভোগে হাজারো মানুষ বেলুচিস্তানে রক্তক্ষয়ী হামলা, ৪৫ সেনা হত্যার দাবি প্রশাসনের ব্যাখ্যা নেই, ভাঙা হচ্ছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য বর্ষার রঙে মাতল ঢাকা, আয় বন্যার্তদের জন্য

প্রচণ্ড দাবদাহের পর অত্যাসন্ন বন্যা: কার কী প্রস্তুতি

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৪, ১০:৫৮ এএম
প্রচণ্ড দাবদাহের পর অত্যাসন্ন বন্যা: কার কী প্রস্তুতি
ড. তোফায়েল আহমেদ

সারা দেশ পুড়ছে। কোনো কোনো অঞ্চলের তাপমান স্মরণাতীতকালের মধ্যে উচ্চ। সামগ্রিকভাবে সারা দেশের যে তাপমান তা অসহনীয় পর্যায়ে। হিট স্ট্রোকে মানুষ মারা যাচ্ছে। তার ওপর লোডশেডিং। ঢাকার বাইরের সব শহর-গ্রামে বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকট। তাতে মানুষের কষ্ট আরও বেড়েছে। খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়েছে। জলকষ্ট বাড়ছে। এমনকি গ্রামাঞ্চলেও অনেক টিউবওয়েলে পানি পাচ্ছে না। টিউবওয়েলের গভীরতা বাড়াতে হচ্ছে। চট্টগ্রামে আমার নিজের বাড়িতে তাই হয়েছে। এ তাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে সবুজায়নের অভাব বা ঘাটতি একটি প্রধান কারণ হিসেবে সর্বত্র আলোচিত। এখন গাছ লাগালে সে গাছ আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলতে কমপক্ষে ৫-১০ বছর লাগবে।

তবু গাছ লাগানো শুরু করুন, বন্ধ করুন নির্বিচারে গাছ কাটা। খালি জায়গা পাবেন কোথায়। কারও ৫ কাঠা জমি থাকলে সেই ৫ কাঠার পূর্ণ ব্যবহার করে কংক্রিট বিছাতে চায় সবাই। খাসজমি, পাহাড়, বন, প্লাবনভূমি, জলাভূমি পেলেই জবরদখল করি। এভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে দাবদাহ এবং বন্যা থেকে আমাদের বাঁচার উপায় কী? এখন প্রবল খরতাপে জীবন অতিষ্ঠ। কয়দিন পর বৃষ্টির সঙ্গে শুরু হবে জলজট ও বন্যা। এ জন্য নানা প্রকল্প চলছে, কিন্তু বন্যা এলে সব প্রকল্প ভেসে যায়। দাবদাহের যেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না, অত্যাসন্ন বন্যার কি কোনো প্রস্তুতির কথা কেউ বলতে পারেন!

শহর পরিকল্পনায় তাপমান হ্রাসের মতো প্রযুক্তি আজকাল রয়েছে এবং তা যে সব সময় অতি ব্যয়বহুল তাও নয়। প্রয়োজন নতুন সৃজনশীল ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র। আধুনিক স্থাপত্যকলায় শিক্ষিত তরুণদের কাছে যান, তারা জমি-জিরাত বাঁচিয়ে আপনি গাছপালার সঙ্গে কীভাবে বসবাস করতে পারেন, আপনার ৫ কাঠা জায়গায় সে রকমভাবে, ভূমির সর্বাধিক ব্যবহারের পরিকল্পনা করে দিতে পারেন। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে গত ১০ বছরে বহু সরকারি ভবন হয়েছে। আরও হবে।

এখানে পরিবেশ, সবুজায়ন এবং পানিসংকটের কথাকে কতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে তাপানুকূল বহুতল ভবন হয়েছে অনেক। তাপ নিয়ন্ত্রণের সব ব্যবস্থা ভবনের ভেতরে। সেই ভবনগুলো বাইরের তাপমাত্রকে কী পরিমাণ উত্তপ্ত করছে সেই চিন্তা কখনো মাথায় ঢোকানো হয় না। ইট-সিমেন্ট শুধু নয়, আজকাল অনেক ভবনে গ্লাস এবং স্টিল ব্যবহার হচ্ছে। ভবন নির্মাণে সাশ্রয়ী ও টেকসই বিনিয়োগ পরিকল্পনা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু আপনার ভবন আমার জলবায়ু, পরিবেশ ও আমার শহরের উত্তাপ বাড়াবে তা কেন আমি সহ্য করব? এসব ভবন থেকে বাতাসে তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য তিনটি বড় ক্ষতিকর কাজ হচ্ছে-

১. তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার অনেক বেশি এবং দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর তারা একটি স্থায়ী চাপ সৃষ্টি করছে।

২. এসব ভবনের এয়ারকন্ডিশন মেশিন বায়ুমণ্ডলে গরম বাতাস ও সিএফসি গ্যাস ছাড়ছে। তার সব ক্ষতিকর প্রভাব এসি ব্যবহার না করেও আমরা সবাই ভোগ করি।

৩. গ্লাস হাউসগুলোর বিকিরণকৃত উত্তাপ আশপাশের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়াচ্ছে।

পরিবেশবিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক তথ্যসহ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং আশা করি ভবিষ্যতে তাদের ওপর ‘হিট ট্যাক্স’ ধার্য হবে এবং তারা হিট ট্যাক্স (Heat Tax) পরিশোধ করবেন।

শহরে সরকারি-বেসরকারি যেকোনো কংক্রিট স্থাপনা করার সময় বৃষ্টির পানি ধরে রাখা ও বৃষ্টির পানি মাটির নিচের জলাধারে পুনর্ভরণের ব্যবস্থা রাখার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কিছুটা হলেও রক্ষা হবে। এসব প্রযুক্তির বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। উন্নয়নের প্রয়োজনে ঢালাওভাবে গাছ কেটে ফেলার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কমপক্ষে তিনটি গাছ লাগিয়ে অন্তত দুটি গাছ বড় না হওয়া অবধি একটি গাছ কর্তন করা যাবে না, এ জাতীয় বিষয় নীতিমালায় স্থান পেতে পারে। দাবদাহ একটি মৌসুমি ঘটনা। হয়তো মাস-পনেরো দিনের মধ্যে শুরু হবে বর্ষণ। প্রবল গ্রীষ্মের কারণে এবারের বর্ষাও প্রবলতর হতে পারে। নানা এলাকায় হতে পারে বন্যা। এখন সবাই গরমে হাঁসফাঁস করছি। অত্যাসন্ন বন্যার কি কোনো প্রস্তুতি আমাদের আছে? তার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে তাপমাত্রা হ্রাস, পরিবেশ সুরক্ষা ও সবুজায়ন উপযোগী নিম্নে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

বিষয়টি হচ্ছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাতীয়ভিত্তিক একটি অঙ্গীকার এ জাতিকে করতে হবে, তা হচ্ছে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে দেশের জলসম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে অবকাঠামো নির্মাণে নিয়োজিত সব মন্ত্রণালয়ের সোজাসুজি ৫০ শতাংশ বরাদ্দ পানিসম্পদ উন্নয়নে খরচের একটি অঙ্গীকার আশা করছি। এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে একদিকে গ্রীষ্ম প্রলম্বিত হওয়া ও সাধারণভাবে তাপমত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় জলাশয়গুলো গ্রীষ্মে জলশূন্য হয়ে পড়ছে। অপরদিকে নানা দূষণে খাল-বিল, নদীগুলো আজ ক্লিনিক্যালি মৃত। তার ওপর মৃত জলাধার-জলাশয়গুলো ভরাট করে বাড়িঘর ও সড়কসহ নানা স্থাপনা হচ্ছে। ফলে দেশে জলসম্পদ ৫০ বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। দেশের অসংখ্য খাল-বিল, নদী-নালা, ডোবা, হাওর-বাঁওড়ের প্রবহমান জলাধারা যেকোনো মূল্যে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তাহলে এ দেশের মরুকরণ ঠেকানো সম্ভব। আরও ১০ বছর এভাবে অতিবাহিত হলে দেশ নিশ্চিতভাবে জলশূন্য মরুভূমিতে রূপান্তরিত হবে। এখানে এখনই বিনিয়োগ বাড়ালে এবং কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করলে পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করা সম্ভব।

আগামী পাঁচ বছর শুধু পুরোনো অবকাঠামো মেরামত ও অর্ধসম্পন্ন স্থাপনাগুলো সমাপ্তকরণ ছাড়া নতুন বাড়ি, রাস্তা ইত্যাদিতে বিনিয়োগ বন্ধ রেখে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পানি সংরক্ষণ ও পানি উন্নয়নে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের একটি জাতীয় পরিকল্পনা দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ করি। বড়, মাঝারি ও ছোট নদ-নদী যেগুলো পলি পড়ে ভরাট হয়েছে সেগুলোর খননের যাবতীয় প্রযুক্তিগত আয়োজন করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, ডিপিএইচই, বিডব্লিউটিএ, বিডব্লিউটিসি, সব নদী ও সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ, জাতীয় নদী কমিশন, ওয়ারপো বড়, মাঝারি ও ছোট সব নদ-নদী এবং ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন তাদের আগামী উন্নয়ন বাজেটের সরাসরি ৫০ শতাংশ মৃত, অর্ধমৃত, হাজামজা, ভরাট হয়ে যাওয়া সব জলাভূমিকে পুনর্বাসন ও সচল করার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। জাতীয় নদী কমিশন ওয়ারপো প্রভৃতি সংস্থা অববাহিকা বা অঞ্চলভিত্তিক নদী ও খাল খনন পরিকল্পনা তৈরি করে দিতে পারে। সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলজিইডি কারিগরি সহযোগী ও বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠাগুলোর যৌথ অর্থায়নে আন্তপরিষদ সমন্বয়ের মাধ্যমে জলাধারগুলো উন্নয়ন করতে হবে। কারণ কোনো খাল বা জলাভূমি এককভাবে কোনো একটি সংস্থার অধিভুক্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এখানে আন্তপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন, সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। পরবর্তী সময়ে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ওই পরিষদগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন- মৎস্যসম্পদ, চাষ বা শিল্পের জন্য পানির ব্যবহার ও বিক্রিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। তারা এখান থেকে রাজস্ব আহরণ করবে এবং পানিসম্পদ উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে ওই অর্থ ব্যয় করতে পারবে। দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন হবে এবং এলজিইডি, ডিপিএইচই, পানি উন্নয়ন বোর্ড কারিগরি সহায়তা প্রদান করতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, ডিপিএইচই, বিডব্লিউটিএ, বিডব্লিউটিসি, সব নদী ও সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ, জাতীয় নদী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, জাতীয় নদী কমিশন, ওয়ারপো প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান জলাশয় তালিকা করে সামর্থ্যানুযায়ী খননকাজ বিতরণ এবং নদীগুলোর জলপ্রবাহের সংযোগ পরিকল্পনা করবে এবং তা বাস্তবাযনে সহায়তা করবে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘জাতীয় পানি পরিষদ’ প্রতি তিন মাসে ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বা পানিসম্পদমন্ত্রীর সভাপতিত্বে প্রতি তিন মাসে ‘জাতীয় পানি উন্নয়নের নির্বাহী কমিটি’ সভা করে এ কাজ মনিটরিং করবে।

দেশে প্রতিবছরের বৃষ্টিপাতের ফলে যে পরিমাণ পানি আমাদের বিরাজিত জলাশয় ধারণ করতে পারে, বিশেষজ্ঞদের কাছে তার হিসাব আছে। বৃষ্টিপাত এবং ওপরের নেমে আসা পানি যদি উপমহাদেশের বেসিনখ্যাত এ বাংলদেশ ভূখণ্ডে স্থির হয়ে থাকত, তাহলে এ দেশ ৮ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যেত। কিন্তু বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে নদী-নালা, খাল-বিল শুকনা কেন? কারণ ওই বর্ষার জল নানা নদ-নদী, উপনদী হয়ে বর্ষার পরপরই সাগরে চলে যায়। আমাদের জলাধারগুলোর ধারণক্ষমতা অত্যন্ত কম। তাতে একদিকে অকালবন্যা, অপরদিকে শুকনা মৌসুম প্রলম্বিত হয়। বাংলাদেশে জল ধারণক্ষমতা দ্বিগুণ বাড়ানো সম্ভব এবং তাহলে কোনো খাল-বিল, নালা-নর্দমা শুকনো মৌসুমে পুরোপুরি শুকাবে না। পানি অন্তত দুই মাস বেশি থাকবে।

এ দুই মাসের বাড়তি পানি আমাদের পরিবেশ ও তাপ ব্যবস্থাপনায় একটা বিরাট সুফল দেবে। আবার খাল-বিল, নদী-নালার গভীরতা বুদ্ধি পেলে বন্যা বিলম্বিত হবে। কারণ বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সঙ্গে নদী কূল ছাপিয়ে প্লাবন সৃষ্টি না করে তা গভীরতা বাড়ার কারণে জলাশয়ে সঞ্চালিত ও প্রবহমান থাকবে। দুটিরই অনেক সুফল আমরা পেতে পারি। ক্ষুদ্র অবকাঠামো হিসেবে রাস্তা আমাদের অনেক হয়েছে। সুষ্ঠু ও পরিকল্পনাবিহীন সড়কের কারণেও অনেক স্থানে পানির প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে। আর নয়, এবার চলুন একযোগে সবাই রাস্তা থেকে কয়েক বছর পানিতে নামি এবং দেশের সব প্রাকৃতিক জলাধারের প্রাণ ফিরিয়ে দিই। সব জলাধারে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করি। পানিপ্রবাহ মানে প্রাণপ্রবাহ। আমাদের প্রাণপ্রবাহ পানির অভাবে বন্ধ হতে চলেছে। সে প্রাণপ্রবাহ আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা অপরিণামদর্শী মানুষ নদী-নালা, খাল-বিল নষ্ট করেছি, আমাদের আবার তা পুনঃস্থাপিত করার যাবতীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

আরও একটি বিষয় অনালোচিত রয়ে গেছে, যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং কঠিনভাবে চ্যালেঞ্জিং। তা হচ্ছে, বেদখল ও জবরদখলকৃত জলাভূমি, নদী, খাল সরকারি মালিকানায় ফেরত আনা। এ কাজটি নদী কমিশন জাতীয়ভাবে জরিপ করে যারা আঞ্চলিকভাবে নদী দেখার দায়িত্ব তারা তথা সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ, প্রযোজনে আধা সামরিক বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর সহায়তায় পুনরুদ্ধার করে পুনরুজ্জীবনের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে আদালতে যেতে হবে। এ কাজে পাঁচ বছরের জন্য নেমে কোথাও কোনোভাবে পিছপা হওয়ার জো থাকবে না। যত রকমের বাধাবিপত্তি আসুক, এ কাজকে এগিয়ে নিতে হবে।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের খালগুলো পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও ঢাকাকে বন্যামুক্ত ও পরিবেশবান্ধব করা যাবে না। এটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, রাজউক, সিডিএ, ওয়াসা, চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে এবং নিজ নিজ অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষায় উদারভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিষয়টিতে জাতীয় পানি পরিষদের সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করি।

লেখক: শিক্ষক, লেখক ও শাসন বিশেষজ্ঞ
[email protected]

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ব্যক্তি নয়, রাজনীতির ভাষার সংকট

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
ব্যক্তি নয়, রাজনীতির ভাষার সংকট
দীপু মাহমুদ

আজকের শিক্ষার্থীরা হয়তো একটি নির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে রাজপথে নেমেছে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি রাষ্ট্রকে আরও বড় একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে–বাংলাদেশের রাজনীতি কি এমন একটি নতুন ভাষা নির্মাণ করতে পারবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বিশ্বাস, নির্দেশের চেয়ে সংলাপ এবং আধিপত্যের চেয়ে অংশগ্রহণ বেশি গুরুত্ব পাবে?...

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আবারও প্রমাণ করেছে, শিক্ষা কেবল পাঠ্যক্রম বা পরীক্ষার বিষয় নয়, এটা রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কেরও একটি সূক্ষ্ম সূচক। পরীক্ষা, শিক্ষা কার্যক্রম কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট–এ আন্দোলন কেবল কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই। আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি দেখলে বোঝা যায়, ক্ষোভের বড় অংশ তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সংকট মোকাবিলার ভাষাকে ঘিরে।

ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি তার রাজনৈতিক দর্শনে দেখিয়েছেন, ক্ষমতার স্থায়িত্বের মূল ভেতরে কেবল রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব নয়, বরং মানুষের সম্মতি, নৈতিক নেতৃত্ব এবং এমন রাজনৈতিক ভাষা, যা সমাজের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও বোধের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম।
কোনো কোনো আন্দোলন কোনো একটি ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হলেও, সময়ের সঙ্গে সেটা দেখা যায় গভীর সামাজিক সংকটের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়। তখন আন্দোলনের দৃশ্যমান কারণটি আর মূল কারণ থাকে না, সেটা হয়ে ওঠে বহু দিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অবিশ্বাস আর বিচ্ছিন্নতার উপলক্ষ। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পরীক্ষা সূচি বা একজন মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা হবে। এ আন্দোলন মূলত ব্যক্তি নয়, রাজনীতির ভাষার সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি রাষ্ট্রক্ষমতার এই সূক্ষ্ম দিকটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘হেজিমনি’ বা আধিপত্যের ধারণা দিয়েছেন। তার মতে, কোনো শাসকগোষ্ঠী কেবল পুলিশ, আদালত বা প্রশাসনিক শক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না। টেকসই শাসনের জন্য প্রয়োজন মানুষের সম্মতি, যা তৈরি হয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং রাজনৈতিক ভাষার মাধ্যমে। মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্র তার প্রতিনিধিত্ব করছে, তার অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং তার কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখনই সেই রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

গ্রামশি এ সম্মতিকেই consent বলেছেন, আর রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগকে বলেছেন coercion। সফল রাষ্ট্র এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু যখন সম্মতির জায়গা সংকুচিত হতে থাকে, তখন রাষ্ট্র ক্রমশ ভাষার বদলে নির্দেশে, যুক্তির বদলে ক্ষমতায় এবং সংলাপের বদলে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যায়। তখন সংকট আর কেবল নীতির থাকে না, সংকট হয়ে ওঠে ভাষার।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনের দিকে তাকালে এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একমত বা ভিন্নমত হওয়া যেতে পারে। কিন্তু তারা যে বিষয়টি সবচেয়ে প্রবলভাবে সামনে এনেছে, সেটা হলো–তাদের কথা শোনা হচ্ছে কি না। প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যও কেন প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, তার উত্তর এখানেই নিহিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সংকটের সময়ে সহমর্মিতাপূর্ণ ভাষা পরিস্থিতিকে শান্ত করেছে, আবার অবজ্ঞাসূচক বা আত্মরক্ষামূলক ভাষা ক্ষোভকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এখানেই গ্রামশির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা common sense আলোচনায় আসে। মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা এবং নৈতিক অনুভূতির সমষ্টিই গড়ে তোলে এই ‘কমন সেন্স’। কোনো রাষ্ট্র যদি এমন ভাষা ব্যবহার করে, যা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে সেই ভাষা আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। রাষ্ট্র তখন আনুষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হলেও নৈতিকভাবে দুর্বল হতে শুরু করে।

বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যখন তথ্যপ্রবাহ অভূতপূর্বভাবে উন্মুক্ত। তারা শুধু সরকারি বক্তব্যই শোনে না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, গবেষণা এবং নাগরিক আলোচনার মধ্য দিয়েও নিজেদের মতামত গড়ে তোলে। ফলে একমুখী রাজনৈতিক ভাষা বা প্রচলিত ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করা আগের তুলনায় অনেক কঠিন। এ বাস্তবতায় রাষ্ট্র যদি পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করে, তবে তা দ্রুত অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।

আজকের শিক্ষার্থী আন্দোলন সেই বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ বহন করছে। এটা কেবল একটি নীতিগত মতবিরোধ নয়, বরং রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাঙনের ইঙ্গিত। যখন একটি প্রজন্ম বারবার অনুভব করে যে তাদের অভিজ্ঞতাকে ছোট করে দেখা হচ্ছে, তাদের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, কিংবা তাদের প্রশ্নের জবাবে সংলাপের পরিবর্তে ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন ক্ষোভ ধীরে ধীরে সংগঠিত প্রতিবাদে রূপ নেয়।

এ কারণেই বর্তমান আন্দোলনকে কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি মন্ত্রণালয়ের সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ব্যক্তি বদলানো তুলনামূলক সহজ, কিন্তু রাজনৈতিক ভাষা বদলানো অনেক কঠিন। কারণ ভাষা বদলাতে হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে হয়, ক্ষমতার সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হয়, এবং সবচেয়ে বড় কথা মানুষকে শাসনের বিষয় হিসেবে নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হয়।

গ্রামশি এক জায়গায় লিখেছিলেন, পুরোনো পৃথিবী যখন মরছে আর নতুন পৃথিবী তখনো জন্ম নেয়নি, তখনই সংকটের সময় উপস্থিত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনও হয়তো সেই অন্তর্বর্তী সময়ের একটি প্রতিফলন, যেখানে পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা আর আগের মতো কার্যকর নয়, কিন্তু নতুন ভাষার রূপরেখাও এখনো সম্পূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি।

বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে বোঝার ক্ষেত্রে গ্রামশির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো সিভিল সোসাইটি। রাষ্ট্র কেবল সরকার, মন্ত্রণালয়, আদালত বা প্রশাসনের সমষ্টি নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সংগঠনের মধ্যদিয়ে। এই বিস্তৃত ক্ষেত্রটিই গ্রামশির ভাষায় সিভিল সোসাইটি। এখানেই তৈরি হয় মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের ধারণা।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে এই প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা শুধু একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করছে–এমন ব্যাখ্যা বাস্তবতার একটি অংশ মাত্র। বৃহত্তর প্রশ্ন হলো, তারা কেন রাষ্ট্রীয় ব্যাখ্যার ওপর আগের মতো আস্থা রাখতে পারছে না? কেন প্রতিটি সরকারি বক্তব্যের বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা বয়ান গড়ে উঠছে? কেন একটি মন্তব্য, একটি বাক্য বা একটি সাক্ষাৎকারও আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিতে পারছে? এর উত্তর ব্যক্তি নয়, ভাষার মধ্যেই নিহিত।

গ্রামশি বলেছেন, শাসকগোষ্ঠী তখনই সফল হয়, যখন তার ভাষা জনগণের ‘কমন সেন্স’-এর অংশ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ মানুষ রাষ্ট্রের বক্তব্যকে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে সত্য বলে গ্রহণ করে। কিন্তু যখন সেই ভাষা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তখন হেজিমনি দুর্বল হতে শুরু করে। রাষ্ট্র তখনো প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী থাকতে পারে, কিন্তু নৈতিক নেতৃত্ব হারাতে থাকে।

এখানেই consent এবং coercion-এর প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সম্মতির জায়গা সংকুচিত হলে রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ থাকে। প্রথম পথ–আরও বেশি সংলাপ, আত্মসমালোচনা এবং অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। দ্বিতীয় পথ–বলপ্রয়োগ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা কঠোর ভাষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া। ইতিহাস বলে, দ্বিতীয় পথ হয়তো সাময়িক স্থিতি আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট আরও গভীর করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো–নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে রাজনৈতিক জবাবদিহিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, যুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করতে চায়। এই প্রবণতাকে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। এটা একটি প্রজন্মগত পরিবর্তনের লক্ষণ।

অতএব, বর্তমান সংকটের সমাধান কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক ভাষার পুনর্গঠন। এমন একটি ভাষা, যেখানে নাগরিককে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে দেখা হবে, যেখানে প্রশ্নকে অবাধ্যতা নয়, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে, যেখানে সংকটের মুহূর্তে আত্মরক্ষামূলক বক্তব্যের পরিবর্তে সহমর্মিতা ও দায়বদ্ধতা প্রকাশ পাবে।

এটা কোনো এক সরকার, কোনো এক রাজনৈতিক দল বা কোনো এক শিক্ষামন্ত্রীর জন্যই কেবল প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসে প্রায় সব সরকারই কোনো না কোনো সময়ে এই একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। ফলে বিষয়টি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন।

আজকের শিক্ষার্থীরা হয়তো একটি নির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে রাজপথে নেমেছে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি রাষ্ট্রকে আরও বড় একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে–বাংলাদেশের রাজনীতি কি এমন একটি নতুন ভাষা নির্মাণ করতে পারবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বিশ্বাস, নির্দেশের চেয়ে সংলাপ এবং আধিপত্যের চেয়ে অংশগ্রহণ বেশি গুরুত্ব পাবে?

লেখক: কথাসাহিত্যিক

প্রণোদনা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
প্রণোদনা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

বিশেষ তহবিল থেকে ঋণদান কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে। যদি এই কার্যক্রম সঠিকভাবে ব্যবহার করা না যায় তাহলে সম্পূর্ণ পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং তা দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।...

দেশে কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নানা কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশা মতো বাড়তে পারেনি বরং কমেছে। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।

বর্তমান অবস্থায় অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। ফলে যে মাত্রায় নতুন বিনিয়োগ হওয়া প্রয়োজন ছিল তা হয়নি। সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক, জিডিপি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের রেশিও দাঁড়িয়েছে ২২.০৩ শতাংশ, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২০১৬) জুলাই-এপ্রিল সময়ে প্রাইভেট সেক্টরে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩.২০ শতাংশ।

সরাসরি নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যদিও আন্তকোম্পানি ঋণ এবং পুনর্বিনিয়োগ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনি অঙ্গীকার হচ্ছে, আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি অর্জন। 

বর্তমানে দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। এজন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন চলমান কাঠামোগত রূপান্তর প্রক্রিয়ার মৌলিক পুনর্গঠন এবং একটি নতুন উন্নয়ন কাঠামো গ্রহণ, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজের অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হবে।

নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্থাৎ ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে গড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এ অবস্থায় গত ২৩ মে চলমান দেশি ও বৈশ্বিক প্রতিকূলতার মধ্যে বন্ধ ও সংকটগ্রস্ত শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা, বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা ও সার্বিকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এ প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা সরকারি প্যারান্টির অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। এই পুনঃঅর্থায়ন সহায়তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান, কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট-মাঝারি শিল্প পুনরুজ্জীবন, কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়ন।

এই প্যাকেজের আওতায় বৃহৎশিল্পের জন্য গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। পুনঃঅর্থায়ন অংশের অধীনে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থাভাবে যেসব প্রকল্প বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছে না, অথবা চলতি মূলধনের অভাবে প্রকল্প বন্ধ হয়ে আছে, এমন প্রকল্পের জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। একটি কোম্পানি সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ শতাংশ সুদে সিডিউল ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেবে আর ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে ঋণদানকালে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ আরোপ করবে। কৃষি ও গ্রামীণ কার্যক্রদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা, সিএনএসএমইর জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ কার্যক্রমের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উত্তরবঙ্গের কৃষি উন্নয়নের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়নও পরিচালনা করবে, যার মধ্যে রয়েছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্সিংয়ের জন্য হাজার কোটি টাকা, কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, চামড়া ও জুতা রপ্তানি এবং হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানির জন্য ২ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া, স্টার্টআপ, সৃজনশীল অর্থনীতি প্রকল্প, সবুজ অর্থায়ন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং বেকার যুবকদের জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখা হবে।

৬০ হাজার কোটি টাকার যে ঋণদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব তহবিল থেকে একটি অংশ বিনিয়োগ করতে হবে। দেশের অধিকাংশ ব্যাংক এখন বিনিয়োগযোগ্য আমানত সংকটে ভুগছে। তারা কি বিশেষ তহবিলের আওতায় ঋণদান করতে সক্ষম হবে? আর বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তহবিলের যে অংশ পুনঃঅর্থায়ন করবে সেই ঋণও তো সিডিউল ব্যাংকগুলোকে প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেদের তহবিল থেকেই বিনিয়োগ করতে হবে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারা পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই অর্থ বিনিয়োগের জন্য তারা কীভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, সেটাই বিবেচ্য বিষয়।

ঋণদানের ক্ষেত্রে এমন সব প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে যারা চলতি মূলধন পেলেই তাদের উৎপাদন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে। বিশেষ তহবিল থেকে ঋণগ্রস্তদের ক্ষেত্রে কয়েকটি দিক বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রশ্ন হলো, এই তহবিল থেকে কাদের ঋণদান করা হবে? ঢালাওভাবে ঋণদানের কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি প্রকল্পকে কেস-টু-কেস যাচাই করে উপযুক্ততা মোতাবেক ঋণ দান করতে হবে। 

যেসব প্রকল্প দক্ষ ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে কিন্তু চলতি মূলধনের অভাবে লাভ করতে পারছে না অথবা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না, এমন প্রকল্পগুলোকে খানদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিছু কিছু প্রকল্প আছে যেগুলো ব্যবস্থাপনা অদক্ষতা বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে বন্ধ হয়ে আছে অথবা অপটিমাম লেভেলে উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে পারছে না, তাদের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান না করে নতুনভাবে ঋগদান করা হলে কোনো লাভ হবে না। এতে শুধু অর্থের অপচয় হবে। 

বিশেষ তহবিল থেকে ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রোডাকটিভ সেক্টরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এমন সব প্রকল্প বাছাই করতে হবে যেখানে ঋণদান করা হলে বিপুল সংখ্যক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ ঋণদানের ক্ষেত্রে শ্রমঘন শিল্প প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেমন– ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ঋণদানের চেয়ে উৎপাদনশীল শিল্প-কারখানার জন্য ঋণদান করা হলে তা বেশি যৌক্তিক হবে। একই এলাকায় যাতে শিল্পের স্থানীয়করণ না হয় তা বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষ তহবিল থেকে ঋণদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলা-উপজেলাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এ ছাড়া, এমন প্রকল্পে ঋণদান করতে হবে যা রপ্তানিনির্ভর।

বিশেষ তহবিলের মাপ এমনভাবে বিতরণ করা যাবে না যাতে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। অর্থাৎ আমরা বলতে চাচ্ছি, যারা ইচ্ছাকৃত এবং পরীক্ষিত ঋণখেলাপি কিন্তু পরবর্তী সময়ে আইনি সুবিধার আওতায় নিজেদের ঋণখেলাপিমুক্ত দেখিয়েছেন, তাদের বিশেষ তহবিল থেকে ঋণপ্রাপ্তির জন্য সর্বাবস্থায় অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। যারা বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা জটিলতার কারণে উৎপাদন শুরু করতে পারছে না অথবা উৎপাদন শুরু করলেও পূর্ণোদ্যমে উৎপাদনে যেতে পারছে না তাদের ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

প্রত্যন্ত এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ করতে হবে। নারী উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাবে তাদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারছেন না। তাদের বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। রিয়েল সেক্টর উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম এমন প্রকল্পে ঋণ দান করা হলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। বৃহৎশিল্প বিকাশের প্রয়োজন আছে। তবে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হচ্ছে সিএমএসএমই খাতের বিকাশ ঘটানো। সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ঋণখেলাপির হার তুলনামূলকভাবে কম।

বিশেষ তহবিল থেকে ঋণদান কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে। যদি এই কার্যক্রম সঠিকভাবে ব্যবহার করা না যায় তাহলে সম্পূর্ণ পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং তা দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী 
সরকারের অর্থ উপদেষ্টা

রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম
রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত
শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবতার প্রতি এক আহ্বান–ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে এই উৎসব সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে পারে। আসুন, আমরা সবাই এই পবিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে সমাজে প্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দিই।...

আষাঢ়ের বৃষ্টিভেজা আকাশের নিচে যখন লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি, তখন বোঝা যায়, এ কেবল একটি উৎসব নয়, এ এক জাতির হৃদয়ের স্পন্দন। শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রতি বছর নতুন করে প্রমাণ করে দেয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠানও কীভাবে মানুষে মানুষে মিলনের বন্ধন তৈরি করতে পারে।

উৎসবের সূচনা ও তাৎপর্য: আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ওড়িশার পুরীধামে শুরু হয় এই মহাযাত্রা। জগন্নাথদেব, বলদেব ও সুভদ্রা–এই তিন বিগ্রহ কাঠ নির্মিত তিনটি সুবিশাল রথে চড়ে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে আসেন জনসমুদ্রের মাঝে। প্রতি বছর নতুন কাঠ দিয়ে তৈরি হয় এই রথ, আর তা টেনে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য পান হাজার হাজার ভক্ত। এই দৃশ্য যেন এক জীবন্ত ছবি, যেখানে ভগবান নিজেই মন্দিরের বদ্ধ প্রাচীর ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছে চলে আসেন।

সাধারণত মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা নিয়মকানুন থাকে, কিন্তু রথযাত্রার দিনগুলোতে সে সীমাবদ্ধতা থাকে না। রাজপথই তখন হয়ে ওঠে দর্শনের স্থান। এখানেই এই উৎসবের গভীরতম বার্তা লুকিয়ে আছে–ভগবান কারও জন্য অপেক্ষা করেন না, বরং নিজেই এগিয়ে আসেন সবার কাছে, বিনা ভেদাভেদে।

সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত: রথযাত্রার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এখানে কোনো জাত-পাতের বাছবিচার নেই। ধনী-গরিব, ব্রাহ্মণ-শূদ্র, এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষও একসঙ্গে রথের রশি ধরে টানতে পারেন। এই দৃশ্য সমাজের বুকে সাম্যের এক জীবন্ত পাঠ তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিকটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। রথযাত্রার দিন প্রায়ই দেখা যায়, জাতি-ধর্মনির্বিশেষে মানুষ উৎসাহ নিয়ে রথের যাত্রাপথে ভিড় জমান, স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধাবোধই প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে।

বাংলাদেশে রথযাত্রার ঐতিহ্য: বাংলাদেশে রথযাত্রার ইতিহাস বেশ পুরোনো ও সমৃদ্ধ। ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ের রথযাত্রা এ দেশে সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় আয়োজনগুলোর একটি, যেখানে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের ৬৪টি জেলাতেই ইসকনসহ বিভিন্ন সনাতনী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় রথযাত্রা পালিত হয়ে থাকে। প্রতি বছর এ আয়োজনের ব্যাপ্তি বাড়ছে, যা প্রমাণ করে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে এই ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা কতটা গভীর।

বিশ্বজুড়ে বিস্তৃতি: ১৯৬৭ সালে শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে প্রথম রথযাত্রা আয়োজন করে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তোলেন। তার সেই প্রচেষ্টার ফল আজ দৃশ্যমান লন্ডন, নিউইয়র্ক, মস্কো, বার্লিন থেকে শুরু করে পৃথিবীর অসংখ্য শহরে। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ যখন একই কীর্তনের সুরে রথের রশি টানেন, তখন তা প্রমাণ করে দেয় যে ভক্তি ও প্রেমের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবতার প্রতি এক আহ্বান–ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে এই উৎসব সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে পারে। আসুন, আমরা সবাই এই পবিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে সমাজে প্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দিই।

জয় জগন্নাথ!

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসকন বাংলাদেশ

সুশাসনের সঙ্গে টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা জরুরি

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
সুশাসনের সঙ্গে টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা জরুরি
ড. খলিলুর রহমান

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, সচ্ছতা এবং দূরদর্শিতা নির্ধারণ করতে পারে একটি শহর জলাবদ্ধতা ও বন্যার কাছে কতটা অসহায় হবে অথবা শহরগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে এবং নগর অব্যবস্থাপনা দূর করে জলাবদ্ধতা ও বন্যামুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত শহর গড়ে তুলতে ও এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তাই এবারের ভয়াবহ নগরবন‍্যায় আমাদের প্রত‍্যাশা হোক– প্রতিটি প্লাবিত সড়ক, নগর ও জনপদ এবং দুর্গত মানুষের হাহাকার ও কষ্ট যেন কেবল আমাদের বর্ষার অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর হতাশার গল্প না বলে; মনে করিয়ে দেয় যেন ভবিষ‍্যতের প্রত‍্যাশিত সুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও।...

প্রতি বছরের মতো এবারের বর্ষাতেও ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো বন‍্যার পানিতে ডুবেছে এবং লাখ লাখ মানুষ অবর্ণনীয় কষ্টের মধ‍্যে দিনাতিপাত করছে। এমন নয় যে শুধু সড়ক নদীতে পরিণত হয়েছে; হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে গেছে; ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে; আর লাখো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতার মধ্যে আটকে থাকছে। আমরা অনেকেই মনে করি এটা বর্ষা মৌসুমের একটি অতি পরিচিত দৃশ্য। আমরা চাইলেই বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে, অন্তত এর তীব্রতা আমারা কমাতে পারি এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগের কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারি।

এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, জলবায়ু পরিবর্তন অনেকাংশেই অস্বাভাবিক ও অতি বৃষ্টির কারণ। দেশের বড় বড় শহরগুলোয় প্রায়ই যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় তার প্রকৃত কারণ কিন্তু বন্যা নয়। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতি ও অপশাসনের ফল। বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সরকারের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, দুর্নীতি, অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশের প্রতি যত্নবান না হওয়ায় প্রতি বছর নগরগুলো বন‍্যায় প্লাবিত হচ্ছে। প্রতি বছর ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আমরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হই তা নতুন করে সুশাসনের অভাব ও আমাদের দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। আমরা কি এগুলো থেকে শিক্ষা নিই? শিক্ষা নিলে প্রতি বছর এরকম ভয়াবহ সমস‍্যার সৃষ্টি হতো না। হলেও পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেত না। প্রতি বছরের মতো এবারও বড় শহরগুলোর বন্যা পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে যে, লাগাতার ভারী বর্ষণ এসব শহরের অবকাঠামো ও দুর্যোগব্যবস্থাপনাকে পরীক্ষার মুখে ফেলছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে অতি বৃষ্টিপাতের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে। অতএব, এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য জলবায়ু-সহনীয় শহর পরিকল্পনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বাস্তবে তা হচ্ছে না। কারণ আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা মূলত উন্নয়নের রাজনীতির নামে পরিকল্পিত ও টেকসই নগর পরিকল্পনার বিষয়টি অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন না। যেসব প্রকল্প মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং যেসব প্রকল্পে নিজেদের স্বার্থ আছে, সেগুলোই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এজন‍্যই ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড হাইওয়ে, বড় সেতু কিংবা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার প্রতি রাজনীতিকদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়। যাতে এগুলোকে রাজনৈতিক সাফল্যের এবং উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া যায়। সরকার এবং রাজনীতিবিদরা এজন‍্যই ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি ধারণের জলাধার কিংবা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ–এসব বিষয়ে গুরুত্ব এবং অগ্রাধিকার কম দেন। ফলে টেকসই উন্নয়নে একটি গুরুতর ভারসাম্যহীনতা প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে।

শহরগুলোর পানি নিষ্কাশনের অবকাঠামো অতি গুরুত্বপূর্ণ, যা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। নতুন নতুন অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ হয়েছে, পুরোনো রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে, রাস্তা উঁচু করা হয়েছে, কিন্তু ড্রেনের সক্ষমতা বাড়েনি। নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে ভারী বর্ষণে আবাসিক এলাকাগুলো কৃত্রিম জলাধারে পরিণত হচ্ছে।

একটি টেকসই, বাসযোগ্য ও স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তুলতে নির্বাচনি চক্রের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত পরিকল্পনা দরকার। বর্তমান সংসদ পাঁচ মাস হলো চলছে। একবারের জন্যও সরকারি কিংবা বিরোধী দলের কোনো সদস‍্যই নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তারা শুধু ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের সুযোগ-সুবিধা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় এবং তাদের রাজনৈতিক সুবিধা ও ক্ষমতা কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। হামে ৭৫০-এর অধিক শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত ও প্রতিরোধযোগ‍্য মৃত্যু এবং দেশের স্বার্থবিরোধী বাণিজ‍্য চুক্তি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়নি। জনগণের স্বার্থ রাজনীতিকদের কাছে গৌণ হয়েছে। নগরবন্যা ও ক্রমবর্ধমান জলাবদ্ধতা এসবেরই ফল। বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা ও বন্যা সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ব্যাপক দুর্নীতি। দেশে জলাভূমি, খাল এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের এলাকা সংরক্ষণের জন্য আইন রয়েছে। কিন্তু এসব আইনের বাস্তবায়ন প্রায় নেই বললেই চলে কিংবা থাকলেও অতি দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দারা এখনো মনে করতে পারেন, একসময় এ শহরে অসংখ্য খাল, পুকুর ও জলাভূমি ছিল। ভারী বৃষ্টির সময় এসব প্রাকৃতিক জলাধার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত এবং পরে ধীরে ধীরে নদীতে প্রবাহিত হতো। বছরের পর বছর খাল, জলাভূমি এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দখল করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে জমা হওয়ার স্থানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প, বিপণিবিতান, শিল্পকারখানা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা। দুর্নীতির কারণেই ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ, ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে বৃষ্টির পানি ধারণের স্থান। এর দায়ভার ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। অন‍্যদিকে নগরায়ণের কারণে কংক্রিটের বিস্তার ঘটায় মাটি ও সবুজ এলাকা ক্রমে সংকুচিত হয়ে বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পথ বন্ধ হচ্ছে। ফলে রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর প্লাবিত হচ্ছে।

জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যার অন‍্যতম কারণ হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা। শহরের বন্যা ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক বিভাগ, বিভিন্ন ইউটিলিটি সংস্থা নিয়োজিত। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের মধ‍্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ঘাটতি একটি চিরাচরিত সমস্যা। এ সমন্বয়হীনতা জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশনের জন‍্য বড় বাধা। বিষয়টি সবার জানা থাকলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কখনো দেখেনি। জলাবদ্ধতা নিরসন ও কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা।

সব জলাবদ্ধতার কারণ অবকাঠামো নয়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণও দায়ী। আমাদের দেশের মানুষের জীবন-প্রণালি ও ব‍্যক্তি অভ্যাসও এর জন্য দায়ী। আমরা অনেকটা উদাসীন। প্লাস্টিক বর্জ্য, নির্মাণসামগ্রীর ধ্বংসাবশেষ এবং গৃহস্থালির আবর্জনা পরিবেশগত দিক মেনে ব‍্যবস্থাপনা করা উচিত। খারাপ অভ‍্যাসের কারণে অনেকই এসব বিষয়ে যত্নবান নন এবং অনেকেই এগুলো ড্রেন ও খালে ফেলে দেন, ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রমও অনিয়মিত এবং বর্ষা মৌসম শুরুর ঠিক আগে সীমিত উদ্যোগে সম্পন্ন না করার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পাম্পিং স্টেশনের অপর্যাপ্ত সক্ষমতা অথবা সেগুলোর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানি নিষ্কাশন অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিতেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, সড়ক প্লাবিত হয়ে যায়, যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে।

জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যার অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক। এটা দেশের অর্থনীতির এক বিশাল বোঝা তৈরি করে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অনেক উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা হারায়, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, পণ্যের ক্ষতি হয় এবং সার্বিকভাবে ব‍্যবসা ও ব‍্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। স্বাস্থ্যসেবা দান ও গ্রহণে সমস্যা সৃষ্টি হয়, শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। জলাবদ্ধতার কারণে সড়ক, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামোর অনেক ক্ষতি হয় এবং এর মেরামতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নগরের ভঙ্গুর জনগোষ্ঠী ও নিম্নআয়ের মানুষ। তারা বস্তিতে ও নিচু এলাকায় বসবাস করেন এবং এসব জায়গায় পানি নিষ্কাশন ব‍্যবস্থা না থাকা বা অপর্যাপ্ত হওয়ায় বন্যার পানি সহজেই তাদের ঘরবাড়ি, বিশুদ্ধ পানির উৎস এবং জীবিকা সবকিছুকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জলাবদ্ধতা ও বন্যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। ড্রেন উপচে পড়ার কারণে বৃষ্টির পানি মিশে যায় পয়ঃবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য এবং গৃহস্থালি আবর্জনার সঙ্গে। এতে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস, লেপ্টোস্পাইরোসিস, চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে, স্থির পানি ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগের বিস্তার ঘটায়। অতএব, নগরবন্যা কেবল অবকাঠামোগত এবং অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা ও অব‍্যবস্থাপনাগত সমস্যা নয়; এটা একই সঙ্গে পরিবেশগত সংকট এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা।

সুশাসন নিশ্চিতকরণ জলাবদ্ধতা ও নগরবন‍্যা নিরসন ও প্রশমনের সবচেয়ে বড় উপায়। এজন‍্য দরকার স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, পেশাদার ও পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক তদারকি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা। এসব নিশ্চিত করলেই জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যা নিরসন এবং প্রশমনে যেসব অবকাঠামো তৈরি হবে তা হবে টেকসই ও কার্যকর। এজন্য দরকার সচ্ছ ও সৎ রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকারকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারলেই আমরা জলাবদ্ধতা ও নগরবন্যা অনেকাংশেই কমাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। 

রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, সচ্ছতা এবং দূরদর্শিতা নির্ধারণ করতে পারে একটি শহর জলাবদ্ধতা ও বন্যার কাছে কতটা অসহায় হবে অথবা শহরগুলো কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে এবং নগর অব্যবস্থাপনা দূর করে জলাবদ্ধতা ও বন্যামুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত শহর গড়ে তুলতে ও এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। তাই এবারের ভয়াবহ নগরবন‍্যায় আমাদের প্রত‍্যাশা হোক–প্রতিটি প্লাবিত সড়ক, নগর ও জনপদ এবং দুর্গত মানুষের হাহাকার ও কষ্ট যেন কেবল আমাদের বর্ষার অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর হতাশার গল্প না বলে; মনে করিয়ে দেয় যেন ভবিষ‍্যতের প্রত‍্যাশিত সুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত
ডা. ইকবাল আনোয়ার, লেখক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, সাবেক সভাপতি, বিএমএ, কুমিল্লা

সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর এ কেন্দ্রে গিয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে, যা তাদের শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেহেতু বিষয়টি সামনে চলে এসেছে: তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা; পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। তার চেয়েও সহজ উপায় আমার কাছে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলো বর্ষাকালের পরিবর্তে শুষ্ক মৌসুমে নেওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই চিন্তাভাবনার মধ্যে রাখা উচিত ছিল। আশা রাখছি সামনে এমনটিই হবে।

এখন এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখছি বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের কারণে আমাদের আগামী প্রজন্মের কিশোর তরুণরা ক্ষোভে রাস্তায় নেমে এসেছে। বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিচ্ছে; এমনকি মন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে।

তাদের এ গণতান্ত্রিক চর্চা কোনো অসুস্থ আচরণ নয়; তবে তাদের মুখের ভাষা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চোখ রাঙানোসহ আরও অনেক কিছু এই কিশোর বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়; তেমনভাবে ধমকের সুরে কথা বলা কাম্য নয়। আমি মনে করি, পানির মধ্যে বসে পরীক্ষা দেওয়ার চাইতেও তাদের মনে কষ্ট লেগেছে মন্ত্রীর একটি উক্তি। উক্তিটি ম্যাচের শলাকার মতো কাজ করেছে।

এমনকি তারা অতীতের একটি বন্দোবস্তের নমুনায় ‘তুমি কে আমি কে’ বলে ওই উক্তিটি প্রতিস্থাপন করছে আগের উক্তিটির বদলে, এর মাধ্যমে কি তারা কোনো কিছু অর্জন করতে চায়? এই বিষয়টি নিয়ে কি ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে কেউ ঢুকে পড়েছে?

এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের আরেকটি অভিযোগ আমার কানে এসেছে–সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার দুটি প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের মতে সিলেবাসের বাইরে থেকে এসেছে। মুক্তচিন্তা এবং সৃজনশীলতার বাতাবরণে আমরা যখন চিন্তা করছি; তখন ‘সিলেবাসের বাইরে’ বলতে কী বোঝায়–এ নিয়ে প্রশ্ন রাখা যায়। প্রশ্ন কমন না পড়লেই তা সিলেবাসের বাইরে এমনটা বলাও যুক্তিযুক্ত নয়। আর যদি প্রশ্নটি সত্যিই সিলেবাসের বাইরে হয়ে থাকে বা প্রশ্নের বক্তব্যের ভুলে তা অস্পষ্টতা ও অর্থহীনতার বেড়াজালে আক্রান্ত একটি প্রশ্ন হয়, তাহলে অবশ্যই এটি নিন্দনীয়। আমরা জানি যে প্রশ্ন করার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ও মডারেটর থাকেন এবং এটাকে বারবার মূল্যায়ন করা হয়। এ প্রসঙ্গে যারা এ জন্য  দায়ী, তদন্ত করে তাদের অবশ্যই যথাযথ বিচার করতে হবে। কারণ দেশের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় কোনোভাবেই গাফিলতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এটি জাতি গঠনের সঙ্গে জড়িত। সামগ্রিক বিষয়টি মূল্যায়ন করে এর অতিসত্বর সমাধান জরুরি। আমাদের শিশুরা বিবেকবান; তাদের ভালোবাসা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা দিলে সহজেই নমনীয় হতে দেখেছি।

এমনিতেই আমাদের দেশে কিশোর-তরুণদের উপযুক্ত নার্সিং করা যাচ্ছে না। বিশ্বের যেসব দেশ উন্নতি করেছে, তারা তাদের সবচেয়ে প্রধান বিনিয়োগ, সবচেয়ে সুন্দর সম্ভাষণ, সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা, সুনজর, সু-সেবা দিয়েছে তাদের শিশু-কিশোরদের।

কিশোর-তরুণদের মনে আশার আলো জ্বালাতে হবে। তাদের পজিটিভ মটিভেশনের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মনস্তত্ব বুঝে তাদের বুকে টেনে নিতে হবে। তারা কচি মনের। তাদের আবেগ বেশি। তাদের রক্ত চঞ্চল। তাদের যা ইচ্ছা তা বলা যায় না, যাবে না। তারা অভিমানী। এমনিতেই তারা ভেতরে ভেতরে নীরব কান্না বুকে পুষে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলে।

শিশু চিকিৎসক হিসেবে তাদের চোখে তাকিয়ে আমি পড়তে চেষ্টা করি। সেখানে  হাসি, স্বতঃস্ফূর্ততা আমি দেখি না। সংসদে তাদের নিয়ে কথা তেমন হতে দেখি না। তাদের মধ্যে বহু শিশু-কিশোর-তরুণ ডিপ্রেশনের রোগী। তারা অনেকে আছে, ভেতরে জ্বলছে, বাইরে ধীর থাকতে মনকে কোনো রকম শাসিয়ে রাখছে। বড়রা দুর্নীতি করে, শিশু-কিশোররা এর জন্য  দায়ী নয়, তবু তাদের ভুগতে হয় সবচেয়ে বেশি। প্রথমে সবচে বড় ধাক্কাটা লাগে তাদের গায়ে।

তাদের বাড়ন্ত দেহ। তারা বিষযুক্ত খাদ্য খেতে বাধ্য হয়। কিছুদিন পরপর তাদের ওপর দিয়ে নানা গবেষণা–এভাবে নয়, ওভাবে! নানা রকম পরিবর্তন, নানা পদ্ধতি! এমনকি তাদের বইয়ের বিষয়, বিশ্বাস এবং ইতিহাসও বদলে যায়। অসম ব্যবস্থায় তারা ‘মন খারাপের সময়’ পার করে।

একদম না বোঝা বয়সে শিশুরা হাসে, ছোটাছুটি করে। তারা বড় হলেই তো এ হাসিটা আর হাসতে পারবে না। তারা দেখবে একটা দরিদ্র দেশ। তার চেয়ে বেশি দেখবে একটা দুর্নীতির দেশ। মারামারির দেশ। দেখবে, যারা দুর্নীতি করে তাদেরই পোয়াবারো। দেখবে, স্কুল-কলেজসহ সবখানে দ্বিচারিতা। তাদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কী ভাষা ব্যবহার করতে হবে, তা না জেনে, মুখ ফসকে কিছু বলে ফেলা উচিত না। তারাই আমাদের সম্পদ।

একজন শিক্ষার্থীর বাবা