উমরা আরবি শব্দ। অর্থ হলো ভ্রমণ করা, আবাদ করা ও ইচ্ছা করা। ইসলামি পরিভাষায় উমরা বলা হয়—‘নিয়ত করে ইহরাম বেঁধে আল্লাহর ঘর (কাবা শরিফ) সাতবার তাওয়াফ (চারপাশে চক্কর দেওয়া) করা, সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার সাঈ করা এবং মাথা মুণ্ডানো কিংবা চুল ছোট করা।’ (আল-বাহরুল আমিক, ৪/২০০৯)
ফজিলত: উমরা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে মানুষকে উমরা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এরশাদ করেন, ‘তোমরা আল্লাহর জন্য হজ ও উমরা পালন করো।’ (সুরা বাকারা, ১৯৬)
হাদিসে উমরার অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। তার কয়েকটি হলো—
✓ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা একাধারে হজ ও উমরা করতে থাকো। কারণ, হজ-উমরা ঠিক সেভাবে দারিদ্র্য বিমোচন ও গুনাহ দূর করে দেয়; যেভাবে হাঁপরের আগুন লোহা, স্বর্ণ ও রুপা থেকে ময়লা দূর করে দেয়।’ (তিরমিজি, ৮১০)
✓ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি উমরার উদ্দেশ্যে বের হয়ে মারা যাবে, তার জন্য কিয়ামত পর্যন্ত উমরার সওয়াব লেখা হবে।’ (তারগিব, ১১১৪)
✓ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘উমরা করার দ্বারা এক উমরা থেকে পরবর্তী উমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ (সগিরা) মাফ হয়ে যায়।’ (বুখারি, ১৮৬৩, ১৭৭৩)
নিয়ত শুদ্ধকরণ, তওফিক লাভ এবং সফর সহজ ও কবুল হওয়ার দোয়া করা: উমরা সফরের শুরুতে নিয়ত বিশুদ্ধকরণ, তওফিক লাভ করা এবং সফর সহজ ও কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করাসহ মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রাথমিক কথাগুলো তুলে ধরা হলো—
নিয়ত: ইসলামের দৃষ্টিতে সব আমল ও আমলের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি, ১)
তওফিক লাভের দোয়া: আল্লাহর কাছে উমরা পালনের তওফিক লাভের দোয়া করতে হবে। কারণ আল্লাহর ডাক না পেলে, তিনি তওফিক না দিলে—কারও পক্ষে উমরা পালন করা সম্ভব নয়। (সুরা মুমিন, ৬০)
সফর সহজ ও কবুল হওয়ার দোয়া: উমরার সফর সহজ ও কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করতে হবে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) উমরার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে এ আমলের সহজতা ও কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করেছেন।
মানসিক প্রস্তুতি: পবিত্র এ সফর শুরু করার আগে কিছু মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি। যেমন—ঋণ থাকলে পরিশোধ করা, কারও কোনো হক ঝুলন্ত থাকলে তা সমাধান করা, গুনাহ থেকে তওবা করা, পরিবারের খরচ বাবদ পর্যাপ্ত অর্থ রেখে যাওয়া। অনেক আলেম বলেছেন, সফরে যাওয়ার সময় সম্ভব হলে অসিয়তনামা লিখে যাওয়া উচিত।
উত্তম সময় কোনটি? ৯ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত সময় ছাড়া বছরের যেকোনো সময় উমরা পালন করা যায়। হজের ৫ দিন উমরা করা মাকরুহ। (আল-বাহরুল আমিক, ৪/২০২১)
রমজান মাস উমরা পালনের সেরা সময়। বাংলাদেশ থেকে ইংরেজি বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে তুলনামূলক বেশিসংখ্যক মানুষ উমরা পালনে গিয়ে থাকেন। কারণ ডিসেম্বর মাসে অনেক ছুটিছাটা থাকে এবং অনেকের সন্তান-সন্ততির বিদ্যালয় ছুটি থাকে। রমজান মাস হলো উমরার হ্যাভি পিক সিজন। ডিসেম্বর-জানুয়ারি হলো পিক সিজন আর বাকি সময়টা অফ পিক সিজন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উমরা: রাসুলুল্লাহ (সা.) গোটা জীবদ্দশায় চারবার উমরা করেছেন। প্রথমটি জিলকদ মাসে। এটি হুদায়বিয়ার উমরা নামে পরিচিত, যা ষষ্ঠ হিজরিতে সম্পন্ন হয়েছে। কাফেরদের প্রতিরোধের কারণে বায়তুল্লাহ শরিফে সে বছর যাওয়া হয়নি। হুদায়বিয়াতেই ইহরাম ত্যাগ করেছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। দ্বিতীয় উমরা পালন করেছেন পরবর্তী বছর অর্থাৎ সপ্তম হিজরিতে। এটি কাজা উমরা নামে পরিচিত। তৃতীয়টি উমরাতুল জিরানা নামে পরিচিত। হুনাইন থেকে ফেরার পথে জিরানা থেকে ইহরাম বেঁধেছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। চতুর্থটি আদায় করেছেন বিদায় হজের সঙ্গে। রাসুলুল্লাহ (সা.) উমরার উদ্দেশে হেরেমের সীমানার বাইরে বের হয়ে উমরা করেছেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। (জাদুল মায়াদ, ২/৯২-৯৫)
খরচ কেমন লাগে? উমরা পালনের সময় ও সার্ভিসের ওপর নির্ভর করে খরচ কম-বেশি হতে পারে। বর্তমানে আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজার থেকে শুরু করে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে উমরার সফর (ভিসা, যাওয়া-আসার বিমান টিকিট, হোটেলে থাকা-খাওয়া এবং মক্কা-মদিনায় জিয়ারত) সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
হুকুমআহকাম: প্রাপ্তবয়স্ক ও সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর জীবনে একবার উমরা পালন করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। (আল-বাহরুল আমিক, ৪/২০১৫)
শর্ত হলো ইহরাম বাঁধা আর রোকন হলো তাওয়াফ করা। তাওয়াফের চার চক্কর দেওয়া ফরজ, বাকি তিন চক্কর দেওয়া ওয়াজিব। অনেক ফকিহ সাফা-মারওয়া সাঈ করাকেও রোকন বলেছেন। অনেকে বলেছেন, এটা ওয়াজিব। মূল কথা হলো, উমরার মূল কাজ চারটি—১. ইহরাম বাঁধা (ফরজ)। ২. তাওয়াফ করা (ফরজ)। ৩. সাফা-মারওয়া সাঈ করা (ওয়াজিব)। ৪. হলক বা কসর করা (ওয়াজিব)। (দুররে মুখতার, ৩/৪৭৬)
ওয়াজিব কাজ আটটি—১. মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা। ২. প্রথম চার চক্করের পর বাকি তিন চক্কর দিয়ে তাওয়াফ শেষ করা। ৩. অজুসহ তাওয়াফ করা। ৪. কোনো সমস্যা না থাকলে হেঁটে তাওয়াফ করা। ৫. তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা। ৬. সাফা-মারওয়া সাঈ করা। ৭. কোনো সমস্যা না থাকলে হেঁটে সাঈ করা। ৮. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা। (কিবাতুল মাসায়েল, ৩/৪৫৩)
সুন্নত কাজগুলো হলো—১. ইহরাম বাঁধার আগে অজু ও গোসল করা। ২. তালবিয়া পাঠ করা। পুরুষের জন্য উচ্চৈঃস্বরে আর নারীদের জন্য নিম্নস্বরে। ৩. তাওয়াফের সময় শরীর ও কাপড় পবিত্র থাকা। ৪. হাজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফ শুরু করা। ৫. তাওয়াফ শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করা। অনেকে তাওয়াফের সময়ও তালবিয়া পাঠ করেন, এটা সুন্নাহ পরিপন্থি আমল। ৬. সাফা-মারওয়া সাঈ করার সময় সবুজ বাতির নিচে পুরুষের দৌড়ানো। নারীরা স্বাভাবিকভাবে চলবেন। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/৪৮০)
লেখক: সম্পাদক, আওয়ারইসলাম২৪.কম