লাইলাতুল কদরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ কিছু আমল করতেন। তা হলো—লাইলাতুল কদর প্রাপ্তির জন্য রাত জেগে ইবাদত করা। রমজানের শেষ দিকে ইতেকাফ করলে লাইলাতুল কদর প্রাপ্তি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। ইতেকাফের মূল কথা হলো সবকিছু ছেড়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাওয়া। আল্লাহতায়ালা লাইলাতুল কদরে কোরআন নাজিল করেন। এ রাত বছরে মাত্র একবার আসে। কিন্তু এ রাতের মহান নেয়ামত কোরআন মানবসমাজেই বিরাজমান থাকে চিরদিন। মানবজীবনে সাফল্য এই কোরআনের আমলের ওপরই নির্ভরশীল। এ রজনি এত সম্মানিত যে, এক হাজার মাস ইবাদত করলেও যে সওয়াব হতে পারে, তার চেয়ে লাইলাতুল কদরের ইবাদতে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।
তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া: লাইলাতুল কদরের প্রধান আমল হলো, কিয়াম তথা নামাজে দণ্ডায়মান হওয়া। তাহাজ্জুদের সময়ে প্রতিটি রাতেই আল্লাহতায়ালা প্রথম আসমানে এসে বান্দাদের ফরিয়াদ শোনেন। কোরআনে আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এবং রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ নামাজ পরবে, এটা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থান—মাকামে মাহমুদে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনভর তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করেছেন। বিশেষত লাইলাতুল কদরে বিশেষ যত্ন নিয়ে নামাজ আদায় করেছেন এবং উম্মতকে আদায় করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
সুরা ইখলাস পাঠ করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার হাতে আমার জীবন, তার কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই এই সুরা ইখলাস কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।’ (বুখারি, হাদিস: ৫০১৩)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সুরা ইখলাস ১০ বার শেষ করবে, তার জন্য জান্নাতে আল্লাহ একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন।’ (সিলসিলা সহিহা, হাদিস: ৫৮৯)
মনোযোগের সঙ্গে দোয়াটি পড়া: আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি বুঝতে পারি, কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তাহলে ওই রাতে কী বলব?’ রাসুলুল্লাহ বলেন, তুমি বলো, বাংলা উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’ বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি বড়ই ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।” (মুসলিম, হাদিস: ৭৬০) আরেক হাদিসে বর্ণিত আছে, এই দোয়া একনিষ্ঠতার সঙ্গে পাঠ করলে সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ গুনাহ থাকলেও তা মাফ হয়ে যাবে। বাংলা উচ্চারণ: ‘আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুমু, ওয়া আতুবু ইলাইহি।’ বাংলা অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তিনি ছাড়া কোনো উপাসক নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও চিরন্তন এবং আমি তার কাছে ফিরে আসি।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৯)
বেশি বেশি সাইয়িদুল ইসতিগফার পড়া: শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে দিনের শুরুতে সাইয়িদুল ইসতিগফার পাঠ করবে, সে ওই দিনে ইন্তেকাল করলে জান্নাতি হবে, আর যদি সন্ধ্যায় পাঠ করে এবং এ রাতেই তার ইন্তেকাল হয়, তাহলে সে জান্নাতি হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৩০৬)
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আন্তা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতাতু, আউজুবিকা মিন শাররি মা সানাতু, আবুউ লাকা বিনিমাতিকা আলাইয়া ওয়া আবুউ বিজামবি ফাগফিরলি ফা ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।
বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রতিপালক। আপনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আর আমি আপনার গোলাম। আমি আপনার ওয়াদা-প্রতিশ্রুতির ওপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আমি আমার ওপর আপনার অনুগ্রহ স্বীকার করছি। আবার আমার গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। অতএব, আমাকে ক্ষমা করে দিন। কারণ আপনি ব্যতীত আর কেউ গুনাহসমূহ ক্ষমা করতে পারবে না।
দান-সদকা করা : যদি সম্ভব হয়, তবে রাতেই দান-সদকা করুন। এটাই উত্তম। এক টাকা দান করলে হাজার মাস ধরে এক টাকা দান করার নেকি পাবেন। এই রাতের প্রতিটি আমল এভাবেই বৃদ্ধি পাবে। কারণ আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কদরের রাতটি (মর্যাদার দিক থেকে) হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা কদর, আয়াত: ৩)
লেখক : শাইখুল হাদিস, সিরাজনগর মাদরাসা, নংসিংদী