প্রতি বছর ঈদুল আজহা আসে। কেউ কোরবানি দেন, কেউ দেন না। যারা দেন না তাদের অনেকে সামর্থ্যবান–কিন্তু উদাসীন। কেউ ভাবেন টাকাটা অন্য কাজে লাগাবেন, কেউ ভাবেন গরিবকে সরাসরি টাকা দিলেই হয়, কেউ ভাবেন এটা আর কতটুকু জরুরি। কিন্তু কোরবানি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি একসঙ্গে ইবাদত, সমাজসেবা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও মানবিক দায়িত্বের এক অপূর্ব সমন্বয়। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান পর্যন্ত–সব দিক থেকেই কোরবানির পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের কেন আবশ্যকভাবে কোরবানি দেওয়া উচিত, ১০টি কারণ এখানে তুলে ধরা হলো–
এটি আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ: কোরবানি কোনো ঐচ্ছিক আমল নয়–এটি আল্লাহর সরাসরি নির্দেশ। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা কাউসার, ২)
আল্লাহতায়ালা আরও এরশাদ করেছেন, ‘আমি প্রতিটি সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি, যেন তারা নির্দিষ্ট গৃহপালিত পশুর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সুরা হজ, ৩৪)
এ আয়াত দুটি স্পষ্ট করে দেয়–কোরবানি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ইবাদত। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের মতো কোরবানিও ইসলামের একটি মৌলিক আমল। যে ব্যক্তি সামর্থ্যবান হয়েও এই আদেশ উপেক্ষা করেন–তিনি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার ঝুঁকিতে থাকেন।
কোরবানি না করলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর সতর্কবাণী: রাসুলুল্লাহ (সা.) সামর্থ্যবান হয়েও কোরবানি না করার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার কোরবানির সামর্থ্য আছে, তবু সে কোরবানি করল না–সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (ইবনে মাজাহ, ৩১২৩) একটু ভাবুন–রাসুলুল্লাহ (সা.) এত কঠোর ভাষায় বললেন কেন? কারণ কোরবানি শুধু একটি আমল নয়, এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ্য ঘোষণা। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এই ঘোষণা না দেওয়া মানে আল্লাহর প্রতি উদাসীনতার প্রকাশ।
আরো পড়ুন: সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
কোরবানির ফজিলত অতুলনীয়: কোরবানির ফজিলত এতটাই বিশাল যে, এই ইবাদত ছেড়ে দেওয়া মানে অসংখ্য নেকি থেকে বঞ্চিত হওয়া। হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ, ৩১২৭)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির রক্তের প্রথম ফোঁটা মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোরবানিদাতার যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যায়।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, ৭৫২৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘কোরবানির দিনের আমলগুলোর মধ্যে পশু কোরবানি করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই। কিয়ামতের দিন এই কোরবানিকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে।’ (তিরমিজি, ১৪৯৩) এতগুলো ফজিলত জানার পরও যিনি কোরবানি ছেড়ে দেন–তিনি নিজেই নিজের ক্ষতি করেন।
কোরবানি সুন্নতে ইবরাহিমির জীবন্ত স্মৃতি: কোরবানি শুধু একটি আমল নয়–এটি হাজার বছরের ইতিহাস, ত্যাগ ও আনুগত্যের জীবন্ত স্মৃতি। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন–‘আর আমরা এক মহান কোরবানির বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম। আমরা এটিকে পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম।’ (সুরা সাফফাত, ১০৭-১০৮)
হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই কোরবানি কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন–এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’ (ইবনে মাজাহ, ৩১২৭)
যখন একজন মুমিন কোরবানি দেন—তখন তিনি কেবল একটি পশু জবাই করেন না। তিনি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই আনুগত্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এই সংযোগ অনুভব করতে হলে কোরবানি দিতেই হবে।
কোরবানি গরিবের পুষ্টির সবচেয়ে বড় উৎস: বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের (এনএনএস) জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ দরিদ্র পরিবার বছরে মাত্র দুয়েকবার মাংস খেতে পারে। এই পরিবারগুলোর জন্য কোরবানির মাংস হলো বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন সরবরাহ। ডব্লিউএইচওর পুষ্টি নির্দেশিকা অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ৫০-৭০ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। একটি গরু থেকে গড়ে ১৫০-২০০ কেজি মাংস পাওয়া যায়, যা একটি পরিবারের দুই থেকে তিন মাসের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারে। আল্লাহতায়ালা এ কারণেই নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ ও অভাবীদের খাওয়াও।’ (সুরা হজ, ২৮) একজন সামর্থ্যবান মানুষ যখন কোরবানি দেন না; তখন শুধু একটি ইবাদত ছুটে যায় না, একটি গরিব পরিবারের বছরের সেরা খাবারটাও ছুটে যায়।
আরো পড়ুন: ইতিহাসের প্রথম কোরবানি কোনটি?
কোরবানি দেশের অর্থনীতির বিশাল চালিকাশক্তি: কোরবানি কেবল ধর্মীয় আমল নয়, এটি দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, কোরবানির মৌসুমে মাত্র তিন দিনে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে ১ কোটিরও বেশি পশু কোরবানি হয়। পশু পালনকারী খামারি ও কৃষকদের বার্ষিক আয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কোরবানির মৌসুমে আসে। কসাই, পরিবহন শ্রমিক, হাটের ব্যবসায়ী, চামড়া শিল্পের লাখ লাখ মানুষ–সবার জীবিকা এই মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। একজন সামর্থ্যবান মানুষ কোরবানি না দিলে–তিনি শুধু নিজের ইবাদত নষ্ট করেন না, এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর জীবিকায়ও আঘাত করেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর ঈদুল আজহায় বাংলাদেশে ১ কোটি থেকে ১ দশমিক ২ কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়। চামড়া খাত থেকে বার্ষিক রপ্তানি আয় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওপরে, যার একটি বড় অংশ কোরবানির চামড়া থেকে আসে।
কোরবানি সামাজিক সংহতির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম: সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কোরবানির মাংস বণ্টন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক সংহতি প্রক্রিয়া, যা ধনী-গরিবের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের ভাই।’ (বুখারি, ২৪৪২) কোরবানির মাংস ভাগ করে নেওয়া এই ভ্রাতৃত্বের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ। ধনী-গরিব সবাই একই দিনে একই খাবার খায়–এটি ইসলামের সাম্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কোরবানি মানসিক সুস্বাস্থ্যের পথ: আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, ত্যাগ ও দান মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষ নিজের প্রিয় জিনিস অন্যের জন্য ত্যাগ করতে পারেন–তার মনে লোভ, হিংসা ও কৃপণতার জায়গা থাকে না। American Psychological Association-এর গবেষণা অনুযায়ী, দানশীল ব্যক্তিদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মাত্রা অন্যদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
আল্লাহতায়ালা কোরবানির মাধ্যমে একজন মুমিনকে এই মানসিক পরিশুদ্ধির সুযোগ দিয়েছেন। পশু জবাইয়ের সময় মনের ভেতর যে ত্যাগের অনুভূতি জন্ম নেয়—তা একটি অসাধারণ আত্মিক অভিজ্ঞতা, যা কোরবানি না দিলে কখনো অনুভব করা সম্ভব নয়।
কোরবানি পরিবেশবান্ধব প্রোটিন সরবরাহের মাধ্যম: FAO-এর গবেষণা অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে লালিত-পালিত পশু থেকে প্রাপ্ত মাংস শিল্পজাত মাংসের তুলনায় অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবেশে প্রাকৃতিক উপায়ে লালন করা গরু-ছাগল শিল্পজাত খামারের মতো কার্বন নির্গমন করে না। কোরবানির মাংস তাৎক্ষণিকভাবে ভোগ করা হয়–সংরক্ষণ ও পরিবহনে অতিরিক্ত শক্তি খরচ হয় না। এটি একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। পাশাপাশি কোরবানির বর্জ্য সঠিকভাবে মাটিতে পুঁতে দিলে তা জৈব সার হিসেবে কাজ করে–মাটির উর্বরতা বাড়ায়। এটি ইসলামের সেই শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে প্রকৃতির যত্ন নেওয়াকে ইবাদতের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
আরো পড়ুন: তাওয়াফের সাত চক্করে কি আলাদা দোয়া পড়তে হয়?
কোরবানি না করলে চামড়া শিল্পে বিপর্যয়: বাংলাদেশ চামড়া শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর কোরবানি থেকে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এর বাজারমূল্য ১,০০০ থেকে ১,৫০০ কোটি টাকার বেশি। কোরবানির চামড়ার টাকা মাদরাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে গেলে–হাজার হাজার এতিম ও গরিব শিশুর পড়াশোনার খরচ মেটে। একজন সামর্থ্যবান মুসলমান কোরবানি না দিলে–শুধু নিজের ইবাদত নষ্ট হয় না, এই শিশুদের শিক্ষার সুযোগও কমে যায়।
কোরবানি একটি সমন্বিত ইবাদত। এতে আছে আল্লাহর আদেশ পালনের সওয়াব, গরিবের খাবারের ব্যবস্থা, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অবদান, সমাজের বন্ধন মজবুত করার শক্তি এবং নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ।
যিনি সামর্থ্যবান হয়েও কোরবানি দেন না–তিনি একটি ইবাদত মিস করেন না, একসঙ্গে ১০টি কল্যাণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিনের আমলগুলোর মধ্যে পশু কোরবানি করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় কোনো আমল নেই।’ (তিরমিজি, ১৪৯৩) এই একটি হাদিসই যথেষ্ট। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানি দেওয়ার এবং এই মহান ইবাদতের পূর্ণ ফজিলত অর্জন করার তৌফিক দিন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক