রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়া বড় মসজিদের মোড়। ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগে প্রতি রাতে ওই মোড়ে পুলিশের একটি টহল গাড়ি এক থেকে দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত বলে জানালেন এলাকাবাসী। এলাকার নিরাপত্তা ও সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ওই গাড়ি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু ৫ আগস্টের পর মাঝে মাঝে টহল পুলিশের গাড়িটি দেখতে পাওয়া গেলেও এখন আর তারা কাউকে তল্লাশি বা জিজ্ঞাসাবাদ করছেন না।
স্থানীয় দোকানি সবুজসহ ওই এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা খবরের কাগজকে জানান, পুলিশের টহল ও তল্লাশি কমে যাওয়ার কারণে ওই এলাকায় ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত অনেক বেড়েছে। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। এলাকার লোকজন একাধিকবার থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরেও কোনো সুরাহা মেলেনি। শুধু পাইকপাড়া নয়, ঢাকার অন্যান্য স্থান থেকেও এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, জনরোষের আতঙ্কে পুলিশের টহল কার্যক্রম কমেছে। পুলিশের পিকেট পার্টি, হাঁটা পার্টি ও মোবাইল পার্টির কার্যক্রম সীমিত হয়ে গেছে। এতে বাড়ছে অপরাধ। এ ছাড়াও থমকে গেছে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম। এতে অপরাধীদের প্রকৃত তথ্য পাচ্ছে না পুলিশ। পাশাপাশি পুলিশে নানামুখী অস্থিরতা বিরাজ করছে। চিড় ধরেছে মনোবলে। সরকার পতনের পর পুলিশের হারানো মনোবল ফেরাতে চোখে পড়ার মতো কার্যকর কোনো উদ্যোগও নেই। বিশেষ করে যারা নতুন পুলিশে যোগদান করেছেন তাদের মধ্যে মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে।
আন্দোলন পরবর্তী পুলিশের চেইন অব কমান্ড শক্তিশালী করা ও পুলিশের মাঠপর্যায়ে অপারেশনে গতি আনার ক্ষেত্রেও এক ধরনের ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। পুলিশের হারানো মনোবল ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেই।
সূত্র জানায়, ছাত্র জনতার আন্দোলনের পর পুলিশের অনেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মেলাচ্ছে। কোনো কোনো কর্মকর্তা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন। কেউ কেউ আবার খোলস পাল্টে সুবিধা আদায়ের চেষ্টাও করছেন। আবার কেউ কেউ নড়াচড়া না করে চুপচাপ দিন পার করছেন।
এ বিষয়ে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম খবরের কাগজকে জানান, ‘আন্দোলন পরবর্তী সময়ে পুলিশের সমস্যাগুলো আমরা দূর করার চেষ্টা করছি।’
পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে নানা কারণে পুলিশের কর্মকাণ্ড কমে গেছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশ কর্মকর্তারা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন গুলি চালাতে। আর তা বাস্তবায়ন করেছেন মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরা। আবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্য নিহত হয়েছেন।
অবশ্য আন্দোলন পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন স্থানে অভিযানে গেছেন পুলিশের সদস্যরা। তখন ওই এলাকার লোকজন একজোট হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে পুলিশ মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে ভয় পাচ্ছে। কেউ এখন আর বড় টিম ছাড়া আসামি ধরতে যাচ্ছেন না। অন্যদিকে বিগত সরকারের আমলে দেশের বিভিন্ন স্থানে দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ কর্মকর্তারা রয়েছেন বদলি আতঙ্কে। তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে বদলি হয়েছেন, আবার কেউ কেউ বদলির অপেক্ষায় রয়েছেন। এ জন্য মাঠপর্যায়ে যে শক্তিশালী পুলিশের অপারেশন কার্যক্রম থাকার কথা সেটি এখন আর নেই। এতে পুলিশের কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
সূত্র জানায়, অতীতে জেলা ও বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক অপরাধীকে ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশ ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে কমিউনিটি পুলিশের কমিটি ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর ওই সব কমিটি আর তেমন কার্যকর নেই। অনেক জনপ্রতিনিধি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কারও কারও নামে রয়েছে মামলা। এতে পুলিশের প্রথাগত সোর্স ব্যবহার করে অপরাধীদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ায় পুলিশের তৎপরতা কমেছে।
সূত্র জানায়, এসব কারণে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের মনোবলে চিড় ধরেছে। অনেকেই গাড়ি নিয়ে উল্টো পথ দিয়ে চলে যাচ্ছেন। আগে কেউ সিগন্যাল অমান্য করলে ট্রাফিক পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিলেও এখন তারা ঢিলেঢালা ডিউটি করছেন।
জানা গেছে, ঢাকাসহ সারা দেশে ১৭০ জন পুলিশ এখনো পলাতক রয়েছেন। ইতোমধ্যে পুলিশের ৯ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া সরকার পতনের পর ডিএমপিতে ১৩ জন কর্মকর্তা কাজে যোগ দেননি। চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলকভাবে অবসরে পাঠানো কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অত্যন্ত প্রভাবশালী বলে পরিচিত ছিলেন। বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে এখনো কেউ প্রভাবশালী বা দাপুটে হয়ে ওঠেনি। ফলে মাঠপর্যায়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সূত্র জানায়, যেসব পুলিশ কর্মকর্তা পলাতক বা আত্মগোপনে আছেন তাদের গ্রেপ্তার করতে উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। অনেক পুলিশ কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় আছেন। কারও কারও কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। পলাতক কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগ সরকারকে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন পেয়ে বিরোধী দলের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ।
এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে জানান, পুলিশে মনোবল ফেরাতে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে। পরিকল্পনা মতো পুলিশের রুটিন কাজ করতে হবে। বদলি ও পদোন্নতি যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে। তাহলে পুলিশ তার মতো করে পারফরম্যান্স করতে পারবে।