ঢাকা ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
দুই ম্যাচ নিষিদ্ধ ইংলিশ ডিফেন্ডার মাশহাদে সমাহিত হলেন খামেনি ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচে কার জয়ের সম্ভাবনা কত, জানাল সুপারকম্পিউটার ডেঙ্গুতে আরও ২ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯০ হামে মৃত্যু ৭৪৭, এক দিনেই শনাক্ত ৯৪৬ মুক্তাগাছায় প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে হুইলচেয়ারসহ সহায়ক উপকরণ বিতরণ হঠাৎ দিক হারিয়ে সিরিজ হারল বাংলাদেশ মুনিরের সঙ্গে আরাঘচির ফোনালাপ, মার্কিন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা সাঙ্গু নদীতে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে যুবদল কর্মী নিখোঁজ সিলেটের নতুন ডিসি আব্দুল্লাহ আল মামুন রাষ্ট্রীয় শোকযাত্রা শেষে মাশহাদে খামেনির মরদেহ সিএফমোটো ও ব্রেম্বোর নতুন অধ্যায় শুরু রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের মধ্যেই বন্যার আশঙ্কা উখিয়ার পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে দুর্যোগ সচিব গোপালগঞ্জে ভিমরুলের কামড়ে শিশুর মৃত্যু আসামির মৃত্যুর গুজবে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা, পুলিশসহ আহত ১২ দুই দিন পর ফিরলেন সাজেকে আটকে পড়া ১৫০ পর্যটক চীনে জুতা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ২৮ সাতকানিয়ায় পানিবন্দি ৮ নারী ও শিশুকে উদ্ধার করলেন এসিল্যান্ড ইরান হামলা না থামালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আরও ভয়ানক হবে: ট্রাম্প চট্টগ্রাম-২ আসনের এমপি হলেন সরোয়ার আলমগীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম, ঢাকার সভাপতি মোবারক, সম্পাদক সবুজ মাছ ধরতে গিয়ে তলিয়ে যাওয়া নিখোঁজ তরুণের মরদেহ উদ্ধার জঙ্গি সন্দেহে সিঙ্গাপুর ফেরত ২ জন রিমান্ডে লাল কার্ডের রাজা এবার ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচের রেফারি গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত, আশাবাদ ব্যক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ‘মদ ও জুয়া নিষিদ্ধকরণ’ বিলসহ সংসদে দুইটি বিল প্রত্যাহার এবার বাস্তবের ‘মোয়ানা’ আসছে পর্দায় দুই বছর পর খুলল আখাউড়া-ভারত ভ্রমণ ভিসার পথ মার্কিন বিমান হামলায় ৩ আইআরজিসি সদস্য নিহত

শিগগিরই মুক্তি পাচ্ছেন না লুৎফুজ্জামান বাবর

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:৪৯ এএম
শিগগিরই মুক্তি পাচ্ছেন না লুৎফুজ্জামান বাবর
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। ছবি: সংগৃহীত

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর গ্রেপ্তার হন ২০০৭ সালের ২৮ মে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওই সময়ে দেশে জরুরি অবস্থা চলাকালে তাকে গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর মোট ১১টি মামলায় আসামি হয়ে আজ অবধি তিনি কারাগারে আছেন। ৬টি মামলায় সাজা ঘোষণা হয়েছে। এর মধ্যে ২টিতে মৃত্যুদণ্ড, একটিতে যাবজ্জীবন, আরেকটিতে ১৭ বছর এবং দুর্নীতির আরেক মামলায় ৮ বছরের কারাদণ্ড হয়। বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনটি মামলায় খালাস পেলেন তিনি। তবে, আরও দুইটি মামলায় খালাস পেলে তিনি মুক্তি পাবেন বলে জানান তার আইনজীবীরা।

তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় দুইটি মামলা হয়েছিল। এর একটিতে তিনি (বাবর) খালাস পেয়েছেন আরেকটি মামলা হাইকোর্টের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। একাধিক মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি এখনি মুক্তি পাবেন তা বলা যাচ্ছে না। 

বিভিন্ন আইনজীবীর মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাবরের বিরুদ্ধে মামলার বিবরণ তুলে ধরা হলো- 

অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মামলা: ২০০৭ সালে বাবরকে তার গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে ওই দিনই মামলা করা হয়। বিচার শেষে একই বছরের ৩০ অক্টোবর রায়ে বেআইনিভাবে রিভলবার রাখার দায়ে ১০ বছর ও ২৫ রাউন্ড গুলি রাখার দায়ে আরও ৭ বছর অর্থাৎ মোট ১৭ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সাবেক মন্ত্রী হিসেবে কারাবিধি অনুযায়ী তিনি কারাগারে ডিভিশন (মযার্দা) পেয়েছিলেন। কিন্তু কারাগারে নিষিদ্ধ মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগে সেই ডিভিশন বাতিল করা হয়। 

গ্রেনেড হামলা মামলা: ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়। ২০১১ সালে হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামী (হুজি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে বাবরকে ওই মামলার আসামি করা হয়। এতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিএনপির বেশ কিছু মন্ত্রী-এমপিকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়। ২০১২ সালের মার্চ মাসে ঢাকার একটি আদালতে দাখিল করা সম্পূরক চার্জশিটে বাবরসহ ৩০ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। এ মামলায় ২০১৮ সালে ১০ অক্টোবর অন্য আসামিদের সঙ্গে বাবরকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিলের শুনানি শেষে ১ ডিসেম্বর তাকে খালাস দেন হাইকোর্ট। 

১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার ঘটনায় ২ মামলা: ঘটনার এক দিন পর ২০০৪ সালের ৩ এপ্রিল কর্ণফুলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহাদুর রহমান বাদী হয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(বি) ধারায় একটি এবং ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯(এ) ধারায় আরেকটি মামলা করেন। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি রায় ঘোষণা হয়। এতে চোরাচালান মামলায় মতিউর রহমান নিজামী, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া অস্ত্র আটক মামলার দুটি ধারায় তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ মামলাটি হাইকোর্টে আপিলের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা: ৭ কোটি ৫ লাখ ৯১ হাজার ৮৯৬ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৮ সালের ১৩ জানুয়ারি বাবরের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ওই বছরই চার্জশিট দাখিল করা হয়। এ মামলায় তাকে ৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। ইতোমধ্যে তিনি খালাস পেয়েছেন। 

কর ফাঁকির মামলা: ৮ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার ১২২ টাকার সম্পদের ওপর প্রযোজ্য আয়কর ফাঁকির অভিযোগে ২০১০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এনবিআর বাবরের বিরুদ্ধে মামলাটি করে। এ মামলায় ২০১৪ সালের ৬ আগস্ট ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ চার্জ গঠন করেন। সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে যদিও উচ্চ আদালতের আদেশে মামলাটি স্থগিত রয়েছে। 

ঘুষ নেওয়ার মামলা: সাব্বির হত্যা মামলা থেকে বসুন্ধরা গ্রুপের সে সময়কার ভাইস চেয়ারম্যান সাফায়াত সোবহানকে বাঁচাতে ২১ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগে একটি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। 

সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে ২ মামলা: ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যেরবাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভা শেষে ফেরার পথে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ ৫ জন। ২০১১ সালে তৃতীয় দফার তদন্তে লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। একই ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে আরেকটি মামলা হয়। মামলা দুটিতে তিনি জামিনে আছেন। 

সুরঞ্জিত সেনকে হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা: এ দুই মামলায় জামিন পেয়েছেন লুৎফুজ্জামান বাবর। সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল সম্প্রতি এ জামিন মঞ্জুর করেন।

বৃষ্টিতে বন্ধ ট্রেন, কক্সবাজার রেলপথের  সংস্কারের মান নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:০২ এএম
বৃষ্টিতে বন্ধ ট্রেন, কক্সবাজার রেলপথের 
সংস্কারের মান নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত

যখন বন্যার কারণে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটে, তখন ট্রেনই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে ওঠে। ১৯৯৮ সালে দেশব্যাপী টানা দীর্ঘ বন্যায় যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল ট্রেন। কিন্তু চট্টগ্রামে গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পানির কারণে চট্টগ্রামে ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার ঘটনা নিকট অতীতে নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক সূত্র খবরের কাগজকে জানিয়েছে, এখানে মূল সমস্যা পানি নয়। রেললাইনে ব্যালাস্ট বা পাথর না থাকার কারণে ট্রেন চলাচল করতে পারছে না। পর্যাপ্ত পাথর না দেওয়ায় রেললাইন নড়বড়ে হয়ে গেছে। লোকোমাস্টাররা (চালক) আর ট্রেন চালাতে সাহস পাচ্ছেন না। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ষোলশহর থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথের অনেক জায়গায় পাথর নেই। কোথাও কোথাও পাথর দিয়ে কোনো রকমে মাটি ঢেকে দেওয়া হয়েছে। যা এই রেলপথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

ব্যালাস্ট বা পাথরের কাজ কী?

রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, রেললাইনের পাথর বা ব্যালাস্টের প্রধান কাজ হলো ট্রেনের ভার বহন করে তা স্লিপার থেকে মাটির নিচে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। ট্রেনের ওজনে যাতে মাটি দেবে না যায়, সেজন্য স্লিপারের মাধ্যমে মাটির গভীরে ওজন সমানভাবে হয়ে যায়। পাথরের স্তর ট্রেনের ধাক্কা ও কম্পন শোষণ করার কারণে যাত্রা আরামদায়ক হয় এবং রেলের যন্ত্রাংশের ওপর চাপ কম পড়ে। পাথরের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির পানি সহজেই নিষ্কাশন হয়, আগাছা জন্মাতে পারে না। পাথরগুলো স্লিপারকে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে সঠিক অবস্থানে আটকে রাখে।  

রেলওয়ে সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথের মধ্যে ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথ সংস্কারের জন্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। এই বিশাল অঙ্কের ব্যয় রেলওয়ে কিংবা যাত্রীদের কোনো কাজে আসেনি। বরং পাথরের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়া লাইন দিয়ে সঠিক গতিতে ট্রেন চালাতে পারছেন না চালকরা। এতে ট্রেনের গতি কমে যায়। যে কারণে যাত্রী ভোগান্তি চলছিল অনেক দিন ধরে। সর্বশেষ জলাবদ্ধতার কারণে গত মঙ্গলবার থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের পর ঢাকা-কক্সবাজার দ্রুতগতির ট্রেনের সঙ্গে সমন্বয় করতে ২০২৩ সালের শেষার্ধে ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথটি প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়। সংস্কারের পর এই রেলপথের অনুমোদিত গতিবেগ ছিল ৬০ কিলোমিটার। এর আগেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকা খরচ করে সংস্কার করা হয়। যার অধিকাংশ টাকা খরচ হয় চট্টগ্রামের দোহাজারী অংশে। দুই দফা সংস্কারের পরও কাজের মান অত্যন্ত নিম্ন হওয়ায় ট্রেনের গতিবেগ নির্ধারণ করা হয় ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার। যা ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনের গতির চেয়ে অনেক কম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্টেশন মাস্টার ও লোকোমাস্টার খবরের কাগজকে জানান, রেললাইন নড়বড়ে হওয়ার কারণে এতদিন ধরে চট্টগ্রাম-ষোলশহর ও ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথে ট্রেন স্বাভাবিক গতিতে চলছিল না। এখন বৃষ্টির কারণে একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এর জন্য তারা প্রকৌশল বিভাগকেই দায়ী করেন। তারা জানান, রেলওয়েতে যত সংস্কার তত দুর্নীতি। সংস্কার কাজ করে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা খরচ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেবার মান বাড়ে না। বরং ট্রেনের গতিবেগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ঝুঁকিও।

পাথর বসানো এবং সংস্কার কাজে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলাম বলেন, সংস্কার কাজটি করা হয়েছে কোনোরকমে ট্রেন চলাচলের স্বার্থে। অনিয়মের বিষয় অস্বীকার করে তিনি বলেন, ঠিকাদার যথাযথভাবে কাজ করেনি বলে তাকে জরিমানা করে কাজ বাতিল করা হয়েছে। পরে অবশ্য রেলওয়ের পক্ষ থেকে সেখানে সংস্কার কাজ করা হয়েছে। নতুন পাথর বসানো হয়েছে। তারপরও ব্যালাস্ট স্বাভাবিক রাখা যায় না। বর্তমানে ওই লাইনে পাঁচ ইঞ্চি ব্যালাস্ট রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম অনুযায়ী ১০ ইঞ্চি পাথর থাকার কথা। অতীতে বন্যার সময় ঢাকা-চট্টগ্রামসহ অন্যান্য এলাকায় ট্রেন যোগাযোগ স্বাভাবিক ছিল। এখন কেন নয়–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই লাইনে যে ট্রেন চলছে তা ৬ ইঞ্চি পানিতে চলতে পারবে। সেখানে পানি জমেছে দুই ফুট ৬ ইঞ্চি। পানি ৬ ইঞ্চির নিচে না নামলে ট্রেন চলাচল করতে পারবে না। 

প্রধান প্রকৌশলী জানান, এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী ৪৭ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমান লাইনের পাশ দিয়েই এই লাইন হবে। তবে সেটি নির্মাণ হবে ৫ ফুট উঁচুতে। যাতে কোনো সময় অতিভারী বর্ষণ কিংবা জলাবদ্ধতার কারণে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়, সেদিকটা মাথায় রেখেই এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বর্তমান দুর্ভোগের জন্য তিনি গত চার দশকের মধ্যে গত দুই দিনের রেকর্ড বৃষ্টিপাতকে দায়ী করে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে। যারা দুই দশক আগে বাড়ি করেছেন তাদের বাড়ির নিচতলা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ছে। তারা তো জানতেন না দুই দশক পরে এমন অবস্থা হবে।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর কঠোর হলেও ঘাটতির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫১ এএম
লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর কঠোর হলেও ঘাটতির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
ছবি: সংগৃহীত

সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি দেখা দেয়। তবে ঘাটতি থাকলেও চলতি অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি প্রতিষ্ঠানটিকে। উল্টো দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ‌রাজস্ব আদায়ে আটঘাট বেঁধে নেমেছে এনবিআর। এরই মধ্যে রাজস্ব আদায় বাড়াতে একগুচ্ছ কৌশল নির্ধারণ করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। 

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, গত অর্থবছরে কর জিডিপি অনুপাত কমেছে। এনবিআরের সক্ষমতা বাড়েনি। রাজস্ব খাতের বেশির ভাগ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাড়তে পারে।

এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআরের কাছ থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হবে। এর মধ্যে আয়, মুনাফা ও মূলধনের ওপর কর ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, আমদানি শুল্ক ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক ৯৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা আদায়ের হিসাব কষা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় এনবিআরের তিন শাখা আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে চলতি অর্থবছরে কোন কৌশলে রাজস্ব আদায় করতে এনবিআর কাজ করবে, তা নিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এনবিআর এসব দিকনির্দেশনা সামনে রেখে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ে একগুচ্ছ কৌশল নির্ধারণ করেছে। 

সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআর রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কৌশল হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে নতুন করদাতা সংগ্রহে। এনবিআর কর্মকর্তাদের অভিযানে কারো ইটিআইএন এবং অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন না থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধনের আওতায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থনীতিতে বেশ কয়েকটি নতুন খাত যুক্ত করা হয়েছে। এসব খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য কঠোর নজরদারি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

রাজস্ব আদায়ের কৌশল হিসেবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে নামিদামি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এনবিআরের তিন গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং শুল্ক গোয়েন্দা শাখার কার্যক্রমে জোর দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব আদায় বাড়াতে উৎসে রাজস্ব আদায় কার্যক্রমে গুরুত্ব বাড়াতে, আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে মিথ্যা ঘোষণা ও অবমূল্যায়ন সম্পর্কিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে জোরদারেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটনে নজরদারি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে করদাতাদের সঙ্গে খাতভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে কর প্রদানে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এনবিআর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সততায় এবং জবাবদিহি নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে নির্দেশ দিয়ে করদাতাদের হয়রানি না করতে সতর্ক করা হয়েছে।

রাজস্ব আদায় বাড়াতে জরিপের মাধ্যমে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে নিবন্ধিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যকর করাসহ উচ্চ আদালতে অনিষ্পন্ন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ আইন বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিতে বলা হয়েছে। বকেয়া পরিশোধে সর্বোচ্চ ৩ বারের বেশি সময় না বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

রাজস্ব আদায় বাড়াতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সহায়তা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন বছরে এনবিআর থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের সদস্যদের অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর গ্রহণে উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। 

বিগত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে আবদুর রহমান খানকে নিয়োগ করা হয়। বিভিন্ন ইস্যুতে সাবেক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এনবিআর বিভক্তি ঘিরে আন্দোলন শুরু হয়। প্রায় ৭/৮ মাস এনবিআরের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। রাজস্ব আদায় কার্যক্রম চালু হওয়ার পরও এনবিআরে অস্থিরতা থামে না। হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়।

শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তদন্তের আওতায় আনা হয়। অনেকের চাকরি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমগ্র রাজস্ব আদায়ে। রাজস্ব ঘাটতি বাড়তে থাকে। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও দেখা দেয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। নতুন সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করতে না করতেই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। জ্বালানিসংকট চরমে ওঠে। আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ কমতে থাকে। শিল্পে বিনিয়োগে ধস নামে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ রেকর্ড পরিমাণে কমে যায়। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রপ্তানি আয় কিছুটা বাড়লেও ওই অর্থবছরের মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। এসবের প্রভাবে রাজস্ব আদায় কমেছে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেছেন, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজস্ব আহরণের সাম্প্রতিক প্রবণতা বিবেচনায় এনবিআরের চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে। গত অর্থবছরে যেসব কারণে রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে সেসব সংকটের বেশির ভাগ এখনো বিদ্যমান আছে। সংকট থাকবে তার মধ্যেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, লক্ষ্য পূরণের চাপ শেষ পর্যন্ত নিয়মিত করদাতা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরই এসে পড়তে পারে। আগের মতোই যারা নিয়মিত কর ও ভ্যাট দেন তাদের ওপর চাপ বাড়বে। এ ধারা থেকে সরে আসার চেষ্টা করতে হবে এনবিআরকে। 

একই আশঙ্কা করে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক খবরের কাগজকে বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, সেখানে অন্ততপক্ষে এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে।  

স্বপ্নের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এখন হাটবাজার

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:১০ এএম
স্বপ্নের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এখন হাটবাজার
ছবি: খবরের কাগজ

যানজটের রাজধানীতে কর্মব্যস্ত মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও স্বস্তির বাহন মেট্রোরেল। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত, নিরাপদ ও সময়মতো পৌঁছানোর জন্য অল্প সময়েই এটি রাজধানীবাসীর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শুধু কর্মজীবী মানুষই নন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে বেড়াতে আসা মানুষের কাছেও মেট্রোরেল এখন অন্যতম আকর্ষণ। অথচ দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক অবকাঠামোর স্টেশনগুলোর নিচে দিন দিন গড়ে উঠছে অস্থায়ী হাটবাজার। 

রাজধানীর মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও কারওয়ান বাজারে অবস্থিত মেট্রো স্টেশন এলাকায় দেখা যায়, এসব স্টেশনের নিচে বসেছে মিনি বাজার। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত এসব বাজারে বেচাকেনা চলে। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, শিশুদের খেলনা, ফলমূল, কাঁচাবাজার, ঝালমুড়ি, চটপটি-ফুচকা, জুস, পান-সিগারেট, খাবারের হোটেল, ব্যাগ, মশারি–নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যের পসরা বসে। বিভিন্ন ভ্যান ও অস্থায়ী দোকান স্টেশনের প্রবেশপথ দখল করে রাখায় যাত্রীদের চলাচলের পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ, নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্টেশনের সিঁড়ি, লিফটের প্রবেশমুখও আংশিকভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিকশার দীর্ঘ সারি। ফলে প্রতিদিনই হকার, রিকশাচালক ও যাত্রীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা লেগেই থাকছে।

নিয়মিত মেট্রোরেল ব্যবহারকারী যাত্রীরা জানান, উদ্বোধনের পর মেট্রো স্টেশনগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা দেখে অনেকেরই মনে হতো যেন ইউরোপের কোনো আধুনিক নগরের অবকাঠামো। সাধারণ মানুষও স্টেশনগুলোকে নিজেদের সম্পদ মনে করে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি কমে যাওয়ায় সেই পরিবেশ আর নেই। বর্তমানে অধিকাংশ স্টেশনের নিচেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে হকারদের অবস্থান চোখে পড়ে।

স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে মেট্রোরেল স্টেশন এলাকাতেও। তখন থেকে বিভিন্ন স্টেশনের নিচে হকারদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও এখন নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান কিংবা কার্যকর নজরদারি না থাকায় দিন দিন বাড়ছে দখলদারত্ব।

তাদের মতে, গত কোরবানির ঈদে উত্তরা মেট্রো স্টেশনের নিচে পশুর হাট বসানো ঘটনাকে কেন্দ্র করে হকারদের মধ্যে ‘উৎসাহ’ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গরু-ছাগলের সারি স্টেশনের সিঁড়ি ও লিফটের কাছ পর্যন্ত চলে আসার ঘটনা ঘটে। জবাবদিহি ও বিচার না হওয়ায় সেই ঘটনার পর অন্য স্টেশনেও ছোট আকারের বাজার গড়ে উঠতে শুরু করেছে।

বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত রবিবার সচিবালয়ের সামনে। সেদিন প্রতীকীভাবে ভাতের হোটেল চালু করে প্রতিবাদ জানাতে যান এক নারী। ১০ টাকার ভাতের হোটেল চালুর দাবি জানান ‘হকার ও অটোরিকশা হটাও’ আন্দোলনের কর্মী সোহানী শিফা। তাকে পুলিশ আটক করে। এর আগে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি ঘোষণা দেন, মেট্রো স্টেশনগুলোর রাস্তা দখলের প্রতিবাদে সচিবালয়ের সামনে প্রতীকী ভাতের হোটেল চালু করবেন।

পুলিশ আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় আন্দোলনের কর্মী সোহানী শিফা চিৎকার করে বলতে থাকেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মেট্রো স্টেশন এখন হাটবাজার হয়ে যাচ্ছে, কেউ দেখছে না। পুরো রাজধানীতে হাঁটার জায়গা নেই, ফুটপাত ও সড়ক পুরোটাই হকারদের দখলে! ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে রাজধানী। তাও দেখার কেউ নেই। এসবের বিচার চেয়েছেন তিনি। যদিও আটকের পরে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান এই আন্দোলনকর্মী। 

প্রতিদিন মেট্রোরেল চলাচল শুরু হওয়ার পরপরই হকাররা দোকান সাজাতে শুরু করেন। রাতে শেষ ট্রেন চলাচল শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বেচাকেনা অব্যাহত থাকে। এসব দোকানের ক্রেতাদের একটি বড় অংশ অবশ্য মেট্রোর যাত্রী।

ভুক্তভোগী যাত্রীদের দাবি, নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান, স্থায়ী নজরদারি এবং স্টেশন এলাকার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় দেশের সবচেয়ে আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থার নিচে গড়ে ওঠা এই ‘মিনি হাটবাজার’ শুধু যাত্রী ভোগান্তিই বাড়াবে না, রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও প্রতীক হয়ে থাকবে।

প্রতিদিন মিরপুর-১০ নম্বরে অবস্থিত মেট্রো স্টেশন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত যাতায়াত করেন গণমাধ্যমকর্মী ফারজানা লাবনী। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যানজটের এই রাজধানীতে আমাদের সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক ও নির্ভরযোগ্য বাহন এখন মেট্রোরেল। কিন্তু যথাযথ তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মেট্রো স্টেশনগুলোর নিচে এখন হাটবাজার গড়ে উঠছে। বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই।’

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনের তাগিদে মেট্রোরেল ব্যবহার করতেই হয়, তাই বিকল্পও নেই। অথচ এখন স্টেশনের নিচে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে যে নারীদের পোশাক থেকে শুরু করে ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যই বিক্রি হচ্ছে। স্টেশনের প্রবেশপথ দখল করে এসব দোকান বসায় যাত্রীদের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। আধুনিক একটি গণপরিবহনের সঙ্গে এমন দৃশ্য মোটেও মানানসই নয়।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন প্রতিদিন মেট্রোরেলে করে মতিঝিলে যান। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, অফিসে যাওয়ার সময় প্রতিদিনই মিরপুর-১০ স্টেশনে ভিড় ঠেলে চলতে হয়। দোকান আর রিকশার কারণে হাঁটার জায়গাই থাকে না। আধুনিক মেট্রো স্টেশনের নিচে এমন দৃশ্য সত্যিই হতাশাজনক।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, শুরুতে স্টেশনগুলো খুব পরিচ্ছন্ন ছিল। এখন মনে হয় যেন বাজারের মধ্য দিয়ে স্টেশনে ঢুকতে হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এটিও গুলিস্তানের মতো হয়ে যাবে। 

পরিকল্পনাবিদদের মতে, মেট্রোরেল শুধু একটি গণপরিবহন নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো। স্টেশন এলাকা দখলমুক্ত ও নিরাপদ রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত দোকান, ভ্যান ও জনসমাগম জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। 

মেট্রো স্টেশনের নিচে হাটবাজার স্থাপনকে ন্যক্কারজনক বললেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, মেট্রোরেল একটি বিশেষায়িত নগর অবকাঠামো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেট্রো স্টেশনকে কেন্দ্র করে ১০০ থেকে ১৫০ মিটার এলাকা আলাদাভাবে পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখা হয়, যাতে পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল, যানবাহনের সংযোগ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু ঢাকায় এ ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, গেল কোরবানির ঈদে মেট্রো স্টেশনের নিচে পশুর হাট বসার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা প্রমাণ করে ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ধীরে ধীরে এই এলাকা অন্য সড়ক ও ফুটপাতের মতোই অবৈধ দখলে চলে যেতে পারে। এতে শুধু যাত্রী ভোগান্তি নয়, মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ও সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সমাধানের বিষয়ে এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, প্রতিটি মেট্রো স্টেশনের চারপাশের অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ মিটার এলাকাকে ‘নো বিজনেস জোন’ ঘোষণা করে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্টেশনকেন্দ্রিক একটি সমন্বিত মোবিলিটি প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে পথচারী চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে এবং মেট্রোরেলের পরিবেশ শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নিরাপদ রাখা যায়। 

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড–ডিএমটিসিএলের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এমন অবৈধ দোকানপাট ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড উচ্ছেদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ৫ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়মিত এই অভিযান পরিচালনা করছেন। পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সহায়তায় আমরা স্থায়ীভাবে এই সমস্যার সমাধান করব।’

প্রস্তুতিমূলক কাজেই ৪ বছর পার রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১০ এএম
আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৪ এএম
প্রস্তুতিমূলক কাজেই ৪ বছর পার রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প
ছবি: সংগৃহীত

উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (আরএমইউ) প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল ২০২৬ সালের মধ্যেই চালু হবে ১ হাজার ২০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল। গড়ে উঠবে একাডেমিক ভবন, গবেষণা কেন্দ্র ও শিক্ষার্থীদের আবাসন।

কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও হাসপাতাল, একাডেমিক ভবন কিংবা আবাসিক হলের মতো মূল অবকাঠামোর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। সম্পন্ন হওয়া কাজেও ধরা পড়েছে একাধিক প্রকৌশলগত ত্রুটি। ফলে প্রকল্পের অগ্রগতি ও নির্মাণকাজের মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় চার বছরের বাস্তবায়নকাল ও শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও প্রকল্পটি এখনো প্রস্তুতিমূলক পর্যায়েই আটকে রয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি ৩৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৩৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। কিন্তু আইএমইডি বলছে, এই অগ্রগতির বড় অংশই জমি অধিগ্রহণ, ভূমি ভরাট, সীমানাপ্রাচীর ও প্রবেশদ্বার নির্মাণের মতো প্রাথমিক কাজ। অথচ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ১ হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতাল, একাডেমিক ভবন, গবেষণা অবকাঠামো, আবাসিক হল, ইউটিলিটি ব্যবস্থা এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহের মতো কাজ এখনো নির্মাণপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

জানা গেছে, ২০২২ সালের জুনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা ছিল ২০২৬ সালের জুন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রায় ৩৯১ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইটের গাঁথুনিতে অতিরিক্ত পুরু মর্টার ব্যবহার, মর্টারের মিশ্রণে অসামঞ্জস্য, যথাযথ কিউরিং না করা, ইট বসানোর ত্রুটি, দেয়ালের সরলরেখা বজায় না রাখা এবং কোথাও কোথাও নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া রড-সিমেন্টের কংক্রিটের কয়েকটি অংশ নির্ধারিত চাপ-সহনশীলতা অর্জন করতে পারেনি।
 
প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির আরেকটি বড় কারণ অর্থ ব্যয়ের নিম্নহার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৬ কোটি ৭ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৮ শতাংশ। এর পরের অর্থবছরেও ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ২২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থ বরাদ্দ থাকলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

আইএমইডির প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে কেনাকাটায় ধীরগতি। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী মোট ৬১টি ক্রয় প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে ৪১টি পণ্য, ১৩টি নির্মাণ, পাঁচটি সেবা এবং দুটি ভৌত সেবা প্যাকেজ। এ পর্যন্ত মাত্র একটি পণ্য প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৪০টি পণ্য প্যাকেজের ক্রয় প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। কোনো সেবা প্যাকেজেও অগ্রগতি নেই। আটটি নির্মাণ প্যাকেজের দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হলেও হাসপাতাল, একাডেমিক ভবন ও অন্যান্য প্রধান অবকাঠামোর নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি।

আইএমইডি প্রকল্পের ধীরগতির পেছনে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, সীমানা বিরোধ, বন বিভাগের অনুমোদনে বিলম্ব, বর্ষাকালের জলাবদ্ধতা, নকশা পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং বালু সংকটের কথা উল্লেখ করেছে। তবে সংস্থাটি মনে করছে, এসব সমস্যার বড় অংশই যথাযথ পরিকল্পনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কার্যকর তদারকির অভাবের ফল। প্রতিবেদনে দ্রুত দরপত্র সম্পন্ন, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, কঠোর প্রকৌশল তদারকি এবং নিয়মিত স্বাধীন মান পরীক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, ‘আইএমইডির প্রতিবেদনের বিষয়গুলো আমাদের নজরে এসেছে। প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বরিশালে দুই মামলা: মৃত, কারাবন্দিরা আসামি, মামলা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৯ এএম
বরিশালে দুই মামলা: মৃত, কারাবন্দিরা আসামি, মামলা নিয়ে প্রশ্ন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

বরিশালের বানারীপাড়া ও মহানগরে দায়ের হওয়া দুটি পৃথক মামলা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বানারীপাড়ায় একটি মামলায় দীর্ঘদিন এলাকায় না থাকা ও আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গভীর রাতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। 

অন্যদিকে বরিশাল মহানগরের একটি নালিশি মামলায় চারজন মৃত ব্যক্তি, কারাগারে থাকা সাবেক এক সংসদ সদস্য, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং বিএনপির ছয় নেতা ও জামায়াতপন্থি এক পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধেও মিছিল, বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে এ ধরনের মামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বানারীপাড়া থানায় গত ১৯ জুন রাত ৪টা ৩৫ মিনিটে ইউনিয়ন শ্রমিক দলের নেতা মো. রাসেল বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের ৪৪০ নেতা-কর্মীর পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি সালেক মল্লিক শিমুলকে আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে গরদ্বার গ্রামে বাদীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো এবং বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। পরে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দাবি, মামলায় নামধারী ৪০ আসামির অধিকাংশই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে দীর্ঘদিন এলাকায় নেই। তাদের ও আসামিদের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বানারীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মওলাদ হোসেন সানা ২০২৪ সালের জুনের পর থেকে এলাকায় যাননি। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে এবং তিনি আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। সাবেক সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম মনিকেও কয়েক বছর ধরে এলাকায় দেখা যায়নি। একইভাবে পৌর যুবলীগের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, আওয়ামী লীগ কর্মী জসিম মীর, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল হুদা ও ছাত্রলীগের সভাপতি ফোরকান আলী হাওলাদার, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন রায়ও দীর্ঘদিন আত্মগোপনে রয়েছেন। এসব ব্যক্তি কীভাবে ওই রাতের ঘটনায় অংশ নিলেন?

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. একরামুল হক বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি বিস্ফোরণের আলামত পেয়েছেন। মামলার তদন্তের স্বার্থে এর বেশি মন্তব্য করা যাবে না বলে তিনি জানান।

বানারীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মজিবর রহমান বলেন, মামলায় আবদুল্লাহ ফকির নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মামলার অন্যতম আসামি ও সাবেক সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম মনি বলেন, পুরো ঘটনাটি সাজানো। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হয়রানির উদ্দেশ্যেই এ মামলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, মামলার ঘটনার সময় এবং মামলার দায়েরের সময়ের পার্থক্য তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। আর গভীর রাতে মামলাটি করা হয়েছে, এটিও কি সম্ভব?

একই মামলার আসামি উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি সালেক মল্লিক শিমুল বলেন, তিনি মামলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না। বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছেন, তাকে আসামি করা হয়েছে। বাদী রাসেলকেও তিনি চেনেন না।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম মিঞা বলেন, ‘বিষয়টি পরে জেনেছি। তদন্তাধীন মামলা নিয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে চাই না। তবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাই।’

বাদী মো. রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

নালিশি মামলায় মৃত চারজনও আসামি

গত ৫ জুলাই বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল জেলার সাবেক সমন্বয়ক মারজুক আবদুল্লাহ একটি নালিশি মামলা করেন। আদালত অভিযোগটি সরাসরি আমলে না নিয়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।

মামলায় নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের ২৪৮ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১০, ১৬ ও ২২ জুন তারা বরিশাল নগরে মিছিল, সড়ক অবরোধ, বোমা বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে নাশকতা চালান। তবে মামলার আসামির তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২১২ নম্বর আসামি খন্দকার রেজাউর রহমান ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি, ১৯৮ নম্বর আসামি আবুল ফারুক হুমায়ুন ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ, ২২৫ নম্বর আসামি এইচ এম হাফিজুর রশিদ ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর এবং ১৯৫ নম্বর আসামি মোহাম্মদ আলী হাওলাদার একই বছরের ২৬ জুলাই মারা যান। অথচ তাদের বিরুদ্ধে মিছিলে অংশ নেওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।

১৯৮ নম্বর আসামি মৃত আবুল ফারুক হুমায়ুনের ছেলে শহরিয়ার রিজন আত্মগোপনে থেকে খবরের কাগজকে বলেন, ‘তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আমি গোপনে এসে ককটেল মেরে আবার চলে গেলাম। কিন্তু বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে। তিনি কি কবর থেকে উঠে এসে বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন?

এ ছাড়া মামলার ২ নম্বর আসামি সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ এবং ১৫১ নম্বর আসামি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম খোকন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া ১ নম্বর আসামি সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ১২ নম্বর আসামি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম জাহাঙ্গীর হোসেন আত্মগোপনে রয়েছেন। ৩ নম্বর আসামি সজ্জাত সেরনিয়াবাত ভারতে অবস্থান করছেন। এ ছাড়া মামলার এজাহারভুক্ত অধিকাংশ আসামিই দীর্ঘ দুই বছর ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। দুই বছর তাদের এলাকায় দেখা যায়নি।

একই মামলায় ১৭১ নম্বর আসামি করা হয়েছে বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য ও সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর মজিদা বোরহানকে। ১৪৯ নম্বরে রয়েছেন নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা মো. ইউনুস। ১৫৮ নম্বরে রয়েছেন ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ওই ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক মাসুম। ১৬৩ নম্বরে রয়েছেন ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হুমায়ন কবির, ১৬৫ নম্বরে সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর রাশিদা পারভীন এবং ১৭৪ নম্বরে সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর সেলিনা আক্তার।

এ ছাড়া ৫১ নম্বর আসামি করা হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) নেতা এইচ এম রফিকুল বাড়ির স্ত্রী কাজী আফরোজাকে।

বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে আমার মা, ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির বর্তমান উপদেষ্টা ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক নারী কাউন্সিলর মজিদা বোরহানকে। তাকে কী হিসেবে আসামি করা হয়েছে, সেটি জানার জন্য বাদীর সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি।’
কাজী আফরোজা বলেন, ‘মামলার কাগজ সাজিয়ে আমার কাছে লোক পাঠানো হয়েছিল। মোটা অঙ্কের টাকা দিলে মামলায় নাম থাকবে না, এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়। যেহেতু আমি আওয়ামী লীগ করি না এবং আওয়ামী লীগের কোনো কর্মকাণ্ডেও ছিলাম না, তাই টাকা দিইনি। এখন দেখি, আমার নামও আসামির তালিকায় দেওয়া হয়েছে।’

বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মীর জাহিদুল কবির বলেন, ‘শুনেছি, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলায় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা ইউনুস মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর জিয়াউল হক মাসুমসহ আরও কয়েকজন বিএনপি নেতাকেও এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছে।’
বরিশাল মহানগর পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, ‘বোমা-ককটেল ফাটিয়ে মিছিল হলে আমরা অবশ্যই জানতাম। অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেনি। আদালত যেহেতু তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করব।’

অভিযোগের বিষয়ে মারজুক আবদুল্লাহ বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নগরে মিছিল করেছেন এবং বোমা ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। এসব ঘটনার ভিত্তিতেই তিনি মামলা করেছেন। আসামির তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, সাক্ষীদের তথ্য অনুযায়ী তালিকা করা হয়েছে। কোনো ভুল থাকলে পরে সংশোধন করা হবে।

এদিকে দুটি মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক দাবি করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এর নিন্দা জানিয়েছেন এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ফৌজদারি মামলায় এজাহার বা অভিযোগপত্রে মৃত ব্যক্তি, ঘটনার সময় কারাগারে থাকা ব্যক্তি কিংবা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বাস্তবসম্মত সুযোগ ছিল না–এমন ব্যক্তিদের আসামি করা হলে তা তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাজু হাওলাদার পলাশ বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আদালত কোনো নালিশি মামলা সরাসরি গ্রহণ না করে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, আসামিদের অবস্থান, ঘটনাস্থলে উপস্থিতি, আলামত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার অমিল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো মামলায় ইচ্ছাকৃতভাবে নিরপরাধ ব্যক্তি বা মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে—এমনটি প্রমাণিত হলে তা আদালতের দৃষ্টিতে গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একইভাবে তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব হলো কোনো পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে সব তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে আদালতে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দাখিল করা।