ঢাকা ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
সকালে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা, খেলা মোবাইলে দেখবেন যেভাবে ৭ মিনিট ছিলেন মৃত, ফিরে এসে বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়েন সোলবাক্কেন মাঠে নামছে ইংল্যান্ড-নরওয়ে, একাদশে আছেন যারা বিশ্বকাপ খেলে দেশে ফেরার পর তারকা ফুটবলারের মৃত্যু আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে পর্তুগিজ রেফারি বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর কলম্বিয়ার ফুটবলারকে হত্যার হুমকি ফেসবুক অনেক ছোটখাটো রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী: বিটিআরসি চেয়ারম্যান যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা মানেনি, অভিযোগ আরাঘচির নেতানিয়াহুর ছেলে বদলে ফেললেন নিজের নাম টানা বর্ষণে আগামীকালও বন্ধ থাকবে চবির সব পরীক্ষা বন্যা-পাহাড়ধস স্থায়ীভাবে ঠেকানো সম্ভব নয়: ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বন্যার্তদের পাশে সরকার, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় চলছে সর্বাত্মক সহায়তা ৬ রেকর্ডে শুরু জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতার আনোয়ারায় বন্যাদুর্গতদের পাশে জেলা ছাত্রদল ১২২ পরিবারকে উদ্ধার, ৮০টি পরিবারে ত্রাণ বিতরণ পুঠিয়ার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা দেখে মুগ্ধ মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত কেরানীগঞ্জে গ্যাসলাইন মেরামতের সময় বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৩ এক মায়ের বেঁচে থাকার যুদ্ধ পানিবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সেনা ও নৌবাহিনী সান্ত্বনার জয়ে হোয়াইটওয়াশ এড়াল বাংলাদেশ ফরিদপুরে দাঁড়িয়ে থাকা পিকআপে বাসের ধাক্কা, নিহত ৫ প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী কতদিন টানা বৃষ্টি থাকবে, জানাল আবহাওয়া অফিস নবীনদের স্বপ্নযাত্রায় অনুষ্ঠিত হলো এডাস্টের বর্ণাঢ্য নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঋণ গ্রহীতার ট্যাক্স ফাইল প্রস্তুতে সতর্ক হোন শিখা অনির্বাণ চালুর উদ্যোগ নিন বন্যা ও পাহাড়ধসে ৪৪ প্রাণহানি, ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক কার্যক্রম চলমান: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০২৬ মুকুট জিতলেন সামানজার সাঈদ একাত্তরে যাদের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, তাদের ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর

ঢাকার গণপরিবহন সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনায় ওজর আপত্তি বাসমালিকদের

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৫, ০৫:৪৫ এএম
আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:০৬ এএম
সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনায় ওজর আপত্তি বাসমালিকদের
কোনো রুটে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে যেতে নারাজ বাসমালিকরা। ছবি: খবরের কাগজ

গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর গণপরিবহনকে শৃঙ্খলায় আনতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্প তথা ঢাকা নগর পরিবহনকে সক্রিয় করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। 

রাজধানী ঢাকা ও শহরতলি ঘিরে ৩৮৮টি বাস রুটকে ৪২টি রুটে নামিয়ে আনা, তারপর সেই ৪২টি রুটে আলাদা আলাদা বাস কোম্পানি গঠন করে সড়কে বাসের রেষারেষি বন্ধ করা ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এতে বাদ সেধেছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। 

ঢাকার বাসমালিকদের এই সংগঠনটি বলছে, কোনো রুটে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে যেতে তারা নারাজ। ঢাকায় বাস চালাতে তারা বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটিকে মানতে নারাজ। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) রীতিমতো অগ্রাহ্য করে তারা এই সংস্থার প্রায় সব উদ্যোগ ভেস্তে দিতে চলেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা নগর পরিবহনে যুক্ত হতে বাসমালিকদের মধ্যে যারা আবেদন জানিয়েছিলেন, তাদের পরিবহনের অনেক বাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে গেছে। আগামী মে মাসের মধ্যে ফিটনেসবিহীন বাসগুলো রাজধানীর সড়ক থেকে উঠিয়ে নিতে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা মানতে একদম নারাজ তারা।
 
এগিয়ে গিয়েও থমকে গেল বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্প 
ঢাকা নগর পরিবহন নামে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্প শুরু হয় ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর। তখন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) থেকে ৩০টি এবং বেসরকারি অপারেটর ট্রান্স সিলভা থেকে ২০টি বাস চালু করা হয়েছিল। ৫০টি বাসের রুট ছিল কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, শাহবাগ, মতিঝিল হয়ে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর পর্যন্ত। এক বছর ঘুরতে না ঘুরতে ট্রান্স সিলভা পরিবহন তাদের বাসগুলো তুলে নেয়। বিআরটিসিও লোকসানের মুখে প্রথমে বাস কমিয়ে দেয়। পরে একেবারে বন্ধ করে দেয়। 

সরেজমিন দেখা গেছে, বিআরটিসির কোনো বাস ঢাকা নগর পরিবহন রুটে চলাচল করছে না। 

এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের ১১ নভেম্বর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রশাসক ও বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভার আয়োজন করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের আওতাধীন রুটগুলোতে বাস চলতে হলে ঢাকা নগর পরিবহনের আওতায় আসতে হবে।

বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের পরিচালক ধ্রুব আলম খবরের কাগজকে জানান, সে সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢাকা মহানগরের ২৪, ২৫, ২৭ ও ২৮ নম্বর রুটসহ ৪২টি রুটে বাস পরিচালনায় আগ্রহীদের থেকে আবেদনপত্র গ্রহণ করতে শুরু করে ডিটিসিএ। গত বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৪২টি রুটে দুই শতাধিক পরিবহন কোম্পানির মালিক আবেদন জানান। তারা এসব রুটে প্রায় তিন হাজার বাস পরিচালনা করতে চান। আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা নগর পরিবহনের সবুজ গুচ্ছে (গ্রিন ক্লাস্টার) আবারও বাস চালু করতে তোড়জোড় শুরু করেছেন তারা। 

এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে গেলেও সংকট শুরু হয়েছে গত ২১ জানুয়ারি থেকে। ওই দিন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর সভাপতিত্বে ডিএমপি কার্যালয়ে ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, ‘আমরা ঢাকা নগর পরিবহনে কোনো বাস দিতে পারব না। ঢাকা নগর পরিবহন চালাতে হলে ডিটিসিএ নিজ উদ্যোগে দুই হাজার বাস এনে চালাক। কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে বাস চালাতে আমরা বাধ্য নই। ঢাকা সড়ক পরিবহনে বাস চালাতে আমাকে বাধ্য করতে পারে না কেউ।’

সাইফুল আলম আরও বলেন, ‘আমি এই সড়কে বাস নামিয়ে কী লাভটা পাব? আমাকে কোনো ফ্যাসিলিটি না সাবসিডি দেওয়া হয়েছে? ডিটিসিএর মতো সংস্থা পরিবহন খাতের জন্য কী করেছে? তারা একের পর এক কনসালট্যান্সির নাম করে সরকারের টাকা খাচ্ছে।’ 

এ বিষয়টি পরে খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা। এ সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ বলেন, ‘আমরা বাস রুট রেশনালাইজেশনের আওতায় থাকতে চাচ্ছি না। আমরা পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) মহোদয়ের সহযোগিতায় সড়কে বাস চালাব।’

ঢাকা নগর পরিবহনের প্রকল্পটি যেন ভেস্তে না যায়, সে জন্য জোর প্রচেষ্টা করছে ডিটিসিএ। সংস্থাটির পরিচালক নীলিমা আখতার খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাসমালিকরা এগিয়ে গিয়েও আবার পিছিয়ে গেছেন। আমরা তাদের নিয়ে আরও দু-তিনটি সভা করব। এরপরে কিছু ভালো খবর পাবেন।’

রুট পারমিট, ফিটনেস নেই, তবু বাসমালিকরা সেসব গাড়িই আনতে চান এই প্রকল্পে 
বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্প তথা ঢাকা নগর পরিবহনে যুক্ত হতে গেলে আধুনিক, মানসম্পন্ন বাস দিতে হবে বাসমালিকদের। কিন্তু এই বাসমালিকদের বড় অপকর্ম ধরা পড়ে ডিএমপির একটি পরিসংখ্যানে। 

সেই পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি) অনুমোদিত ঢাকার ১১০টি সচল রুটে এখন বাস চলছে ৪ হাজার ৫৪৬টি। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন বাসের সংখ্যা ১ হাজার ৫৩টি। এসব রুটে অনুমোদিত গাড়ির সংখ্যা ৭ হাজার ৪৩। 
ডিএমপি, বিআরটিএর নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোনো কোনো পরিবহনের ৯০-৯৫টি বাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (২০ বছরের বেশি) ফুরিয়ে গেছে অনেক আগে। যেমন: এ-২২২ রুটে গাজীপুর পরিবহনের ব্যানারে বাসের সংখ্যা ২০৫। তবে বৈধ রুট পারমিটধারী বাসের সংখ্যা ১১০। এ পরিবহনে ২০ বছরের বেশি বয়সের বাস রয়েছে ৯৫টি। 

এ-২২০ রুটে প্রভাতী বনশ্রী পরিবহন লিমিটেডের বাসের সংখ্যা ১১৮। এর মধ্যে বৈধ রুট পারমিটধারী বাসের সংখ্যা ১০০। মেয়াদোত্তীর্ণ বাসের সংখ্যা ১৮। অথচ এ পরিবহনের মালিক নতুন করে ২৬টি বাসের রুট পারমিটের জন্য আবেদন করেছেন। 

বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, নিজেদের রুট পারমিটবিহীন বাসের পাশাপাশি বিভিন্ন রুটে চলমান রুট পারমিটবিহীন বাসগুলোকেও নিজস্ব ব্যানারে পরিচালনার তোড়জোড় শুরু করেছে এসব পরিবহন কোম্পানি। যেমন- দুলদুল পরিবহনের ২৯টি বাসের সবগুলোর রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি বাস তারা অন্য কোম্পানির ব্যানারে পরিচালনা করছে। এসব বাস নিজেদের ব্যানারে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অন্য রুটের ১৩টি বাসসহ মোট ৩৮টি বাস নিয়ে পুনরায় দুলদুল সার্ভিস চালু করতে তোড়জোড় করছেন মালিক। অনাবিল পরিবহনের ৫১টি বাসের মধ্যে ৪২টির রুট পারমিট নেই। তারাও নানা রুট থেকে বাস এনে এখন ৮৩টি বাস পরিচালনা করতে চাণ। এমন মালিকদের সংখ্যা ৫১ জন।

ঢাকা নগর পরিবহন প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলেন, ‘এই প্রকল্পে কোনোভাবেই যখন এসব বাসমালিককে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে, তখন তারা আমাদের প্রকল্প নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি করেছেন। সমন্বিত বাস পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আসবেন না বলে এখন আরটিসি সভায় গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে চাইছেন।’

সমাধান তবে কোথায় 
ঢাকা মহানগরীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে হলে সরকারি পরিবহনব্যবস্থা চালু করতে হবে বলে মনে করেন পরিবহন খাত বিশেষজ্ঞরা। 

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আরটিসির রুট আর ঢাকা নগর পরিবহনের রুট বিদ্যমান থাকায় এখন সংকট তৈরি হয়েছে। এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় না হলে সড়কে বিশৃঙ্খলা থেকেই যাবে। একই সড়কে তো দুই ধরনের ব্যবস্থাপনা চলতে পারে না।’ 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, বেসরকারি বাসমালিকদের ওপর ভরসা করে সড়ক ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো যাবে না। তাদের লক্কড়ঝক্কড় বাস দিয়ে কোনো গণপরিবহনব্যবস্থা চলতে পারে না। সরকারকে এখন অন্তত চার হাজার নতুন বাস আনতে হবে। 

তিনি বলেন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত সেসব বাস সড়কে নামলে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমবে। এতে সড়কে যানজট কমবে, বাসের ট্রিপের সংখ্যা বাড়বে, আয়ও হবে বেশি। এই ব্যবস্থাটি এই সরকারকে শুরু করে দিয়ে যেতে হবে। তার পরের সরকারকে এই ব্যবস্থা চলমান রাখতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে রাজধানীতে বেসরকারি মালিকদের গাড়ি চলে না। আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা শুরু করতে না পারলে কোনো উন্নতি দেখি না। 

সিফাত/

আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব পাবে ঋণচুক্তি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ১০:১৬ এএম
আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব পাবে ঋণচুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসছেন। আগামীকাল রবিবার তারা আসতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের  কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিনিধিদল বৈঠকে বসবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারে আইএমএফ প্রতিনিধিদল রবিবার (আগামীকাল) থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবে। সূচি অনুযায়ী সফরের প্রথম দিন তারা অর্থ বিভাগের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করবে। প্রথম বৈঠকে সরকারের নতুন ঋণ চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

একই সঙ্গে নতুন বাজেট, রাজস্ব ঘাটতি, রাজস্ব নীতি, রাজস্ব সংস্কার, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার কথা আছে। দ্বিতীয় বৈঠকে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীর গতি, নতুন জাতীয় পে-স্কেলের অর্থায়ন এবং এ খাতে সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। ব্যাংক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠান, রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়েও বৈঠকে কথা হবে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব আদায় বাড়াবে এমন শর্তে আইএমএফ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে ঋণ দিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে বলে অঙ্গীকার করলেও পারেনি। এখন বর্তমান সরকারের সঙ্গে নতুন চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এবারে রাজস্ব আদায়ে অনেক বড় ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের চাপ আছে। এমন অবস্থায় নতুন ঋণ চুক্তি করতে হলে সরকারকে অবশ্যই রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে। 

এরই মধ্যে আইএমএফ থেকে এনবিআরের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরকে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়। পরে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আইএমএফ ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা আদায়ের জন্য বলা হলেও আদায় হয় ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা।

আইএমএফ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের কর–জিডিপির অনুপাত দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৩ করার শর্ত দেয়। এই শর্ত পূরণ করতে হলে ৬৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করা প্রয়োজন থাকলেও তা পারেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে কর-জিডিপির অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অতিরিক্ত ৭৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে রাজস্ব আদায়ের কথা থাকলেও আদায় করতে ব্যর্থ হয় এনবিআর। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির সর্বশেষ বছর অর্থাৎ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাতের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

এই অর্থবছরে অতিরিক্ত আরও ৯৬ হাজার কোটি টাকা আয় করার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। কিন্তু সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে কর জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশ এবং অতিরিক্ত আদায় দূরে থাক, ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এমন পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে এনবিআর ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা কোন কৌশলে আদায় করবে, তা জানতে চেয়েছে আইএমএফ।

দাতা সংস্থা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে নতুন পে-স্কেল কার্যকরে অর্থের উৎস কী, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এবারের বৈঠকে এসব আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। চলতি অর্থবছরে প্রজ্ঞাপন জারি করে সব পণ্যে অভিন্ন ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ আরোপের বিষয় নিয়েও এবারের বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা আছে।   

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আশাবাদী এনবিআর চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হবে।’ 

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আইএমএফের বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য প্রণীত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে বিনিয়োগের জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যোগাযোগ করছেন। বন্ধ কলকারখানা চালু করতে সরকার ধাপে ধাপে ৬০ হাজার কোটি টাকা অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি ৪৪ কারখানা বেসরকারি খাতে সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে সমগ্র অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর অবস্থানে আছে। মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হবে। এসবের প্রভাবে রাজস্ব আদায় বাড়বে। এ ছাড়া সরকার অপ্রত্যাশিত ব্যয় খাতে বড় অঙ্কের অর্থ রেখেছে, যা চলতি অর্থবছরে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে কাজে লাগানো হবে। নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা জানাবে সরকার। বর্তমান সরকার নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে।

অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, নতুন ঋণ পেতে হলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিষয়ে সন্তোষজনক পরিকল্পনা জানাতে হবে। এ ছাড়া নতুন পে-স্কেলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগানের বিষয়েও নিশ্চয়তা দিতে হবে। রাজস্ব খাতের সংস্থার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হবে বলে মনে করছি। ব্যাংক খাতের সুশাসন নিয়ে বর্তমান সরকার কী করতে চায় তা নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা। এসব নিয়ে বহুবার দাতা সংস্থা কথা বলেছে। এখন দেখার বিষয় বর্তমান সরকার আইএমএফ-কে কতটা সন্তুষ্ট করে ঋণ নিতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা আনতে বর্তমান সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে তাও বিস্তারিত জানানো হবে। বিশেষভাবে কতগুলো প্রকল্প বাতিল করা হচ্ছে, কেন বাতিল করা হচ্ছে এবং বিদ্যমান ও নতুন প্রকল্পে গতি আনতে সরকার কী করতে যাচ্ছে, তা নিয়েও আলোচনা হবে। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান সরকার প্রকল্পের নানামুখী দুর্নীতি কমাতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি করে ড্যাশ বোর্ড করা হচ্ছে। এখানে উল্লেখ করতে হবে প্রকল্পের অগ্রগতি। এ ছাড়া কী কারণে প্রকল্পে গতি আসছে না তার কারণও উল্লেখ করতে হবে।

কাজে লাগছে না কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
কাজে লাগছে না কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী
তৈরি পোশাকশিল্পে কাজ করছেন প্রায় ৫০ লাখ কর্মী (বয়স ২৫-৪৯)

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। একে অনেকেই বোঝা মনে করলেও আসলে তা জনসম্পদ। জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশের বেশি কর্মক্ষম। তাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। এই বয়সের জনসংখ্যাই বিভিন্ন খাতে কর্মরত আছেন। বয়সের দিক দিয়ে তারা কাজের উপযোগী। কৃষি, শিল্প, সেবা ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন।

  • বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বেশি কর্মক্ষম (১৫–৬৪ বছর), যা দেশের জন্য একটি বড় জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ তৈরি করেছে।
  • গুণগত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি; ফলে শিক্ষিত বেকারত্বও বাড়ছে।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবে। তাই এখনই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি

রপ্তানি আয় বাড়াচ্ছেন। বিদেশেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। রেমিট্যান্স, প্রবাসী আয়েও রেকর্ড করছেন এই তারাই। তারপরও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে কাজে লাগানো যায়নি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার বয়স কাঠামো পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি সুযোগ বা সম্ভাবনা। এর পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য গুণগত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যা আমাদের দেশ এখনো অর্জন করতে পারেনি।

আজ ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই প্রথমবারের মতো ৯০টি দেশে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশও বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করছে। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটি অতিক্রম করে। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) পরিচালনা পরিষদ এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড থাকা মানে একটি দেশের উন্নতি সাধন করার অপার সম্ভবনার দুয়ারে অবস্থান করা। কর্মক্ষম জনসংখ্যা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপি) সংজ্ঞা অনুযায়ী, যখন কোনো দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে এবং সেটা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, তখনই তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। জনমিতির হিসাবে, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে একটি রাষ্ট্রের জন্য উৎপাদনশীল, কর্মমুখী ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সক্রিয় বিবেচনা করা হয় এবং একটি দেশের মানবগোষ্ঠীর এ পর্যায়কে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য মানবসম্পদ হিসেবে দেখা হয়।

১৫ থেকে ৬৪ বছরের মানুষের সংখ্যা বেশি

বিবিএস বলছে, ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মানুষের সংখ্যাই দেশে বেশি, যা ৬৫ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মানুষ ৩৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। তারাই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখছেন। তৈরি পোশাক শিল্পে এই বয়সের (২৫-৪৯) প্রায় ৫০ লাখ কর্মী কাজ করছেন। এই তালিকার বাইরেও কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের অবদান রয়েছে রপ্তানি আয়ে। তাদের অবদানের কারণেই বিদায়ী (২০২৫-২৬) অর্থবছরে ৪৮ বিলিয়ন (৪ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে রপ্তানি আয়।

২৫ থেকে ৪৯ বছরের লাখ লাখ মানুষ কাজ করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সদ্য সমাপ্ত বছরে মোট ৩৫.৫৬ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ) ডলারের রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। তবে প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে বিশ্ববাজারে তাদের মাসিক বেতন অনেক কম। তাই এ বিশাল জনসংখ্যাকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা অপরিহার্য, যেন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল কাজে লাগানো যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বেকার বা কর্মহীন মানুষ বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতি বছর ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষিত মানুষ বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। বিআইডিএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যার মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার তিন বছর পরও শিক্ষার্থীদের ২৮ শতাংশ বেকার থাকছেন।

বাজেটে কর্মসংস্থানের দিকে নজর

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েই চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিচ্ছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই শিল্প এবং রুগ্‌ণ ও বন্ধ কলকারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল-২০২৬ ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপপরিচালক (ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হেলথ উইং) মো. আলমগীর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহায়তা অনুপাত ইকোনমিক সাপোর্ট রেশিও (ইএসআর) ১৯৯১ সালে ০.৫৫ থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২২ সালে ০.৯১-এ পৌঁছেছে। ২০৪১ সালের দিকে প্রায় ০.৯৮-এ পৌঁছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য ২০৪১ সালকে বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময় সময় নির্দেশ করা হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, ২০৪১ সালের পর ইএসআর ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে ২০৭১ সালে ০.৮৬-এ নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ ২০৭১ সালের পর থেকে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতার চাপ বাড়বে। জনমিতিক লভ্যাংশের পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে গুণগত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান আবু হাসনাত মো. কিশোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের জনসংখ্যা বোঝা না। কারণ নির্ভরশীলতার চেয়ে কর্মক্ষম জনসংখ্যাই বেশি। ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ (মুনাফা) আসছে। দিন বদলের ধাক্কায় অধিকাংশ পরিবারে আয়মুখী মানুষ বাড়ছে। নির্ভরশীলতা কমছে। তবে যত মুনাফা পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যায়নি। কারণ সম্প্রতি বেকারত্বের হার বেড়েছে। দক্ষ জনশক্তি বাড়ছে না। কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ডিভিডেন্ড কাজে লাগানো যায়নি। জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তরুণদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাজে লাগাতে হবে। কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।’

পুলিশকে বারবার টার্গেট, অপ্রতিরোধ্য মব সহিংসতা!

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫২ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
পুলিশকে বারবার টার্গেট, অপ্রতিরোধ্য মব সহিংসতা!
ছবি: খবরের কাগজ

মব সহিংসতা কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না, বরং এই অপরাধ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করেই অনেকে উন্মাদের মতো ‘মব সন্ত্রাস’ চালিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পরিকল্পিতভাবে বা টার্গেট করে মব সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। 

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পুলিশের মনোবল ও সাংগঠনিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে সংঘবদ্ধ মব সহিংসতা ঘটাতে শুরু করে, যা পরে একধরনের ‘মব কালচারে’ রূপ নেয়। সেই ভয়ানক তৎপরতার মাত্রা আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা কমলেও মব সহিংসতার ধারাবাহিকতা এখনো যথেষ্ট চলমান। 

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এক আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় ঢুকে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা সংঘবদ্ধভাবে থানা ভবনে ভাঙচুর ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মারপিটের শিকার হয়ে কষ্টে-দুঃখে কান্নায় ভেঙে পড়েন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সচেতন মহলসহ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনেক পুলিশ সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে চরম ক্ষোভ ও সমাজের প্রতি হতাশা প্রকাশ করেন। 

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) সারা দেশে ৩১৯ পুলিশ সদস্য মব বা সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন বা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ১১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। 

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক মনে করেন, মব সন্ত্রাসের ঘটনা অনেক আগে থেকেই ঘটে আসছে। কিন্তু চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, ব্যক্তিগত শত্রুতার ফলে টার্গেট করে এবং গুজবসহ নানা প্রেক্ষাপটে একের পর এক যেভাবে মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে, তা রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে চরম আঘাত হেনেছে। মবের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের একধরনের সমর্থন বা উসকানি দেখা যায়।

এ ছাড়া ওই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘ভঙ্গুর’ অবস্থার সুযোগে এ ধরনের বেআইনি অপতৎপরতা ব্যাপক বেড়ে যায়। সে সময় সরকারের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা মব সন্ত্রাসকে যৌক্তিক করার জন্য ইঙ্গিতপূর্ণ নানা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, বর্তমানে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় বসার পরেও মব সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, বরং সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছেই। সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপক। 

এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, “মবের মতো আইনবিরুদ্ধ কাজও সমাজে যখন প্রতিনিয়ত ঘটে এবং একধরনের ‘বৈধতা পায়’, তখন একটা শ্রেণির কাছে তা ‘স্বাভাবিক’ বলে প্রতীয়মান হওয়া বিচিত্র নয়। কেউ কেউ মনে করেন, এভাবেও বিচার করা যায় বা বিচার হয়। বাংলাদেশে এই বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সূত্র ধরে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, যা সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা ছড়াচ্ছে। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ফলে মবের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ ও মবের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোরতা অনুসরণ করা দরকার। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।” 

বারবার টার্গেটের শিকার হচ্ছে পুলিশ

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে, কর্তব্যরত অবস্থায় অপরাধী ও দুষ্কৃতকারীদের মব সন্ত্রাস বা বিভিন্নভাবে পুলিশের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলার ঘটনা ঘটছে। গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশজুড়ে মোট ৩১৯ জন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২ জন করে পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হন। পরের মাসগুলোতে এই প্রবণতা আরও বাড়ে, যেখানে মার্চে ৬৩ জন, এপ্রিলে ৬৬ জন, মে মাসে ৫৫ এবং গত জুনে ৫১ জন পুলিশ সদস্য বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে হামলার শিকার হন। 

গত ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে ‘কবজি কাটা’ নামে পরিচিত একটি ছিনতাইকারী চক্রের আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়ে ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ চাপাতির কোপে আহত হন। তার আগে ১১ জুন শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত হন দুই পুলিশ সদস্য।

এমনকি দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় অনন্য ভূমিকা রাখা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাও বাদ যাচ্ছেন না মব সহিংসতা থেকে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হেঁয়াকো বাজারের একটি শপিংমলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেরিতে পৌঁছানোর অভিযোগ তুলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মারধর এবং গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়। 

এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক আইজি মুহাম্মদ নুরুল হুদা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগেও পুলিশ হামলার শিকার হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সংখ্যাটা অনেক বেড়েছে। সাধারণ মানুষও মবের শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন। ফলে এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ দৃশ্যমান করতে হবে। সরকার এসব বিষয়ে নিশ্চয়ই কাজ করছে, সে কারণে আগের চেয়ে এই প্রবণতা কমেছে। কিন্তু পরিস্থিতির আরও উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকার ও বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিকের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। 

নব্য ‘মব সংস্কৃতি’ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান-জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি

একটি গুজবকে কেন্দ্র করে বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়ায় থানায় সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর ন্যক্কারজনক আক্রমণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। 

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, আগৈলঝাড়া থানা পুলিশ স্থানীয় রিয়াজ ফকির (২৬) নামে এক আসামিকে চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে থানায় মাদকের মামলা ছিল। রিয়াজ ফকির সে সময়েও ছিলেন মাদকাসক্ত। মাদকের প্রভাবে তিনি থানা হাজতে নিজের মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম হন। এতে রিয়াজ ফকির অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ সেই রাতেই রিয়াজ ফকিরকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য গভীর রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

অথচ রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে কতিপয় ব্যক্তি আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করে। গুজবনির্ভর এ ধরনের হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকিস্বরূপই নয়, বরং বাংলাদেশে গড়ে ওঠা নব্য ‘মব সংস্কৃতি’, প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার-প্রক্রিয়া ও জননিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকি, যা একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ বাংলাদেশ পুলিশ তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে তাদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত বলে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আশঙ্কা করছে।

কারা কী কারণে করছে, খুঁজে বের করতে হবে

মুহাম্মদ নুরুল হুদা
আইনকানুন নিজের হাতে উঠিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। পুলিশ আগেও মব হামলার শিকার হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তবে মব কেন ঘটছে এবং কারা, কী কারণে করছে, সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে। এ বিষয়ে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে মব সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালেও মবের অনেক ঘটনা ছিল। ওই সময়ের পরিসংখ্যান দেখলে সেটি বোঝা যাবে। তখনো মানুষ মনে করেছিল, দেশ স্বাধীন, আমরাও স্বাধীন হয়েছি, তাই কোনো পরোয়া না করেই যেকোনো কিছুই করা যাবে। ঠিক ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরও অনেকে মনে করেছে, তারা স্বাধীন, সেজন্য দেশে এমন মব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, অভ্যুত্থানের পর যত মব হয়েছিল, সেই পরিমাণ মবের ঘটনা নিশ্চয়ই এখন নেই। এরপরও সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে সেটিও কমে আসবে বলে আশা করছি। মবের ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছে, তাড়াতাড়ি সেগুলোর চার্জশিট ও বিচার করা গেলে মব কালচার বা মব সন্ত্রাস কমে যাবে।
এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকারি দল মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে মব সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব। পাশাপাশি দেশের যে জায়গাগুলোতে মব ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে সতর্ক থাকা এবং যারা মব সৃস্টির চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

সাবেক আইজিপি

মবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে

মনজিল মোরসেদ

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৮ মাস ধরে যেভাবে মব সন্ত্রাসের চর্চা হয়েছে, এখন এটি কমতে সময় লাগবে। কিন্তু এটি কমাতে চাইলে/বন্ধ করতে চাইলে সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তো মব সন্ত্রাসের চর্চা হয়েছে। এখন সরকার মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। তার মানে অ্যাকশন শুরু হয়েছে। কিন্তু কেবল কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিলে হবে না, সব ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে দেখলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতা একজন অভিনেত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘ওই মহিলাকে যে জুতার বাড়ি মারতে পারবে তারে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেব। জুতার বাড়ি মেরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা। এখন কেউ মব উস্কানি বলতে আসলে ওইডারে ভরা বাজারে পিটামু।’ এ রকম সাইবার মবও হচ্ছে এখন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তো শুনলাম না। সশরীরে মব হচ্ছে, সাইবার মব হচ্ছে–কিন্তু এসবের কোনোটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে, আবার কোনোটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে না। তাতে তো মব সন্ত্রাস বন্ধ হবে না। বন্ধ করতে হলে সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে, প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ

ড. তৌহিদুল হক 

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে মব সহিংসতার নানা ধরন প্রকাশ পাচ্ছে। কোনো একটি সমাজে কিংবা দেশে আইনের শাসন যথাযথভাবে প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে মব সহিংসতা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ মানুষ নিজেই নিজের ওপর সংঘটিত কোনো অন্যায়, বৈষম্য কিংবা অবিচারের বিচার করতে উদ্যত হয়। বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সরকারের উচিত, এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।

বাংলাদেশে মানুষের নাগরিক প্রাপ্যতা কিংবা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রশ্নে দায়িত্বশীল আচরণ এবং সামাজিক সংবেদনশীলতার প্রশ্নে প্রত্যাশিত সূচক অত্যন্ত নিম্নগামী। আইনের প্রয়োগ এবং রাষ্ট্র কর্তৃক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সামাজিক পরিচয় কিংবা শ্রেণি বিভাজনের কারণে সৃষ্ট সামাজিক কদর অর্থাৎ রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের কাছে কোনো ব্যক্তি কত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিবেচ্য। 
এই বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আবার এসব অভিযোগের সত্যতাও নানা সময়ে নানাভাবে প্রমাণিত। যখন আইনের প্রয়োগ কিংবা আইনের দৃষ্টি সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তখন রাষ্ট্র বিচার করবে এমন বিশ্বাস ব্যক্তি করতে পারে না। তখন নিজেই বিচার করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং নানা ধরনের আইন পরিপন্থি ব্যবস্থা নেয়। 

বাংলাদেশে মব সহিংসতার রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ পুরোনো। দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষণীয় যে কোনো দল কিংবা অর্থ-ক্ষমতার বিচারে প্রভাবশালী ব্যক্তি কতিপয় লোক একত্রিত করে চলমান রাজনৈতিক ধারার বিপরীত অবস্থানে থাকা কাউকে অভিযুক্ত করে শায়েস্তা করা বা উচিত শিক্ষা দেওয়ার নামে আইনবিরোধী ব্যবস্থা নেয়। আবার চলমান রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে যারা আছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিয়ে এই ধরনের মব সহিংসতা চালালে সেটি সমাজের মধ্যে একটি শ্রেণি আছে যারা চলমান রাজনৈতিক ধারায় বিশ্বাস করে, তারা এই ঘটনার সামাজিক এবং রাজনৈতিক বৈধতা উৎপাদন করে। 

মবের মতো আইনবিরুদ্ধ কাজও সমাজে যখন প্রতিনিয়ত ঘটে এবং বৈধতা পায় তখন একটা শ্রেণির কাছে তা ‘স্বাভাবিক’ বলে বৈধতা পায়। কেউ কেউ মনে করে এভাবেও বিচার করা যায় বা বিচার হয়। 

আইনের বাইরে গিয়ে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা বা ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের জন্য নিজের শক্তি কিংবা শক্তি ভাড়া করে অন্যের ওপরে অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করার প্রেক্ষাপট কোনো একটি দেশে সার্বিক শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। বাংলাদেশে এই বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সূত্র ধরে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ক্ষমতা এবং অর্থের বিচারে শক্তিশালী ব্যক্তিরা নিজ নিজ স্বার্থ আদায় এবং সমাজকে একটি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে অস্থিরতা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি, যা আইনমান্যকারী নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা ছড়াচ্ছে। মব সহিংসতা থেকে পরিত্রাণের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মবের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ ও মবের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কঠোরতা অনুসরণ করা দরকার।  

সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

চলছে সাইবার মব!

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
চলছে সাইবার মব!
ছবি: সংগৃহীত

যখন-তখন যেখানে-সেখানে যে-কেউ মব বা অন্যায়ভাবে শারীরিক সহিংসতার শিকার হতে পারেন। দেশব্যাপী এমন বাস্তবতা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে সম্প্রতি বেড়ে গেছে সাইবার মব। অর্থাৎ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কাউকে নাজেহাল করার চেষ্টা। দেশব্যাপী সাইবার মবের তৎপরতা এমন যে, প্রধানমন্ত্রীর পরিবার থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য বা সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষও এতে বিদ্ধ হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। দীর্ঘদিন ধরে চলমান বটবাহিনীর তাণ্ডবও এক ধরনের সাইবার মব।

সাইবার মবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিকার চেয়ে কেউ কেউ আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সাইবার মবের সাম্প্রতিক আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অশালীন মন্তব্য।

এই মন্তব্যের অভিযোগের পর গত ২২ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক কিশোর কলেজছাত্রকে (১৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুন রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ওই কলেজছাত্র একটি ফেসবুক আইডি থেকে জাইমা রহমানকে নিয়ে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন শনিবার রাতে আখাউড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পলাশ মিয়া ও পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রিফাতুল ইসলাম আখাউড়া থানায় পৃথকভাবে অভিযোগ করেন।

তাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জাইমা রহমানের মানহানি করা হয়েছে এবং সামাজিকভাবে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ওই কলেজছাত্রকে আখাউড়া থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পুরোনো একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। বিচারক তাকে সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এদিকে চলতি সপ্তাহের আরেকটি ঘটনায়ও সাইবার মব প্রসঙ্গটি খুব আলোচনায় আসে। এতে মদের বোতল সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলের এক সংসদ সদস্যের একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যাচাই করে দেখা গেছে, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি।
ফেসবুকে পোস্ট করা ওই ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে–‘এক বোতল মদ একাই খেয়ে দেশকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দিলেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম।’

গত ৭ জুলাই ছবিটি পোস্ট করা হয়। এর দুই দিন আগে ৪ জুলাই এক ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি মাদকবিরোধী বক্তব্য দেন। লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দল এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করে। টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রাম ‘জাফরনগর স্মার্ট ভিলেজ’।

চারদিকে মাদকের থাবার মধ্যে প্রত্যন্ত গ্রাম ‘জাফরনগর স্মার্ট ভিলেজ’ খেলাধুলায় এতটা উদ্যমী ও উদ্যোগী! তাই তিনি আয়োজক ও বিজয়ী দলকে মডেল হিসেবে দেখিয়ে তার সংসদীয় পুরো আসনে এমন খেলাধুলার আয়োজন করবেন বলেও সেখানে ঘোষণা দেন। এতে মাদকের থাবা কমে আসবে বলে বিশ্বাস সংসদ সদস্যের।

বক্তব্যে তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। কেউ যদি মাদকসেবীদের ধরে থানায় সোপর্দ করে, তাহলে তাকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াব।

এআই দিয়ে বানানো ছবি ফেসবুকে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি গতকাল শুক্রবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, এই ঘটনায় সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা করেছি। এটি যে এআই দিয়ে বানানো ছবি, তা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে। ফ্যাক্টচেক করে গণমাধ্যমে এই নিয়ে সংবাদও প্রকাশ হয়েছে। আমার দেওয়া মাদকবিরোধী বক্তব্যের কারণে তারা আমার চরিত্রহননের চেষ্টার অংশ হিসেবে এটা করেছে। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এখন হরহামেশাই এমন সাইবার মব হচ্ছে। তবুও মাদকবিরোধী অবস্থানে আমি দৃঢ় আছি। কিছু করার নেই। মাদক আর বেয়াদবে সমাজটা ভরে গেছে। দৃঢ় অবস্থান না নিলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।

এআই দিয়ে বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবিতে দেখা যায়, সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম একটি বিছানায় বসে মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন। বিছানার অপর প্রান্তে বসে আছেন আরও দুই ব্যক্তি। জ্যাকব মিল্টন (Jacob Milton) নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ছবিটি পোস্ট করা হয়। ছবিতে দেখা যায়, বিছানার মাঝখানে একটি ট্রেতে মদের বোতল, বাটিভর্তি চানাচুর, গ্লাস ও একটি জগসদৃশ বস্তু।

এদিকে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন প্রসঙ্গে সম্প্রতি অভিনেত্রী, নির্মাতা, প্রযোজক ও সংগীতশিল্পী মেহের আফরোজ শাওনের দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টকে ‘অবমাননাকর’ বলছেন কেউ কেউ। এই নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ১ জুলাই ফেসবুকে নিজ অ্যাকাউন্ট থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহ উদ্দীন আম্মারের একটি ঘোষণা আসে। এতে আম্মার শাওনকে জুতার বাড়ি মারতে পারলে ১ লাখ টাকা এবং জুতার আঘাতে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

পোস্টে আম্মার লেখেন, ‘ওই মহিলাকে যে জুতার বাড়ি মারতে পারবে তারে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেব। জুতার বাড়ি মেরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা। এখন কেউ মব উসকানি বলতে এলে ওইডারে ভরা বাজারে পিটামু।’

এর পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে শাওন গতকাল দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, আমি কোনো আইনি ব্যবস্থা নিইনি। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে আমি এখনো কিছু ভাবিনি।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমেই আমি এই নিয়ে কথা বলেছি। এই প্রসঙ্গে আমি নতুন করে কিছু বলব না।’
সম্প্রতি তিনি সামাজিক মাধ্যমে তার বক্ত্যব্যের ব্যাখ্যায় জানিয়েছেন, তিনিও ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন।

ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাস সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, যাদের সন্তান মারা গেছে, যার ভাই মারা গেছে বা যার পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেছে। কিন্তু আমার স্ট্যাটাস তাদের প্রতি ছিল না। আমার স্ট্যাটাস ছিল যারা জুলাই যুদ্ধটাকে সাজিয়েছে। যারা সেই ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ করেছেন।

ফেসবুকে দেওয়া পোস্টের পর শাওনকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ও সহিংস কর্মসূচির ঘোষণা এবং ইঙ্গিত করতেও দেখা গেছে। এই অবস্থায় শাওনের পাশে দাঁড়িয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মডেল পিয়া জান্নাতুল। 

তিনি বলছেন, আজকে শাওন আপার সঙ্গে যেটা হয়েছে; এ ঘটনা একটি সভ্য সমাজ ও দেশে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু শাওন আপা নয়; একটা মেয়ের সঙ্গে এ ধরনের মবের কথা হলে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। সেটা যে পার্টিই হোক না কেন, একটা মেয়ের সঙ্গে যদি এটা হয়, তা কোনোভাবেই একটা সভ্য দেশে গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো মানুষের সঙ্গেই মব করা হলে, তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে মেহের আফরোজ শাওন ইস্যুতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি এসব মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি অন্য শিল্পীদেরও শাওনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নিয়ে উপহাস এবং এর স্মৃতিস্তম্ভ অবমাননার অভিযোগে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও মাহিয়া মাহি এবং শান্তা ফারজানা নামের আরেক নারীর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। রাজধানীর শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান গত শনিবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন এই জিডি করেছে। আইনি পদক্ষেপের বাইরে শাওন, পিয়া জান্নাতুল ও মাহিদের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে অব্যাহতভাবে চলছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও অশ্রাব্য পোস্ট-মন্তব্য।

প্রাক-নিকার সভায় থাকবে আরও নতুন থানার প্রস্তাব

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১১:১৭ এএম
প্রাক-নিকার সভায় থাকবে আরও নতুন থানার প্রস্তাব
ছবি: সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে নতুন থানা, নৌ থানা ও পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের একাধিক প্রস্তাব নিয়ে প্রাক-নিকার সচিব কমিটিতে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী রবিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে দুপুর আড়াইটায় প্রাক-নিকার সচিব কমিটির এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ সংক্রান্ত নোটিশে এ কথা বলা হয়েছে।

সভায় কক্সবাজারে একটি নতুন থানা, ভোলায় একটি পূর্ণাঙ্গ নৌ থানা এবং বগুড়া ও কুমিল্লায় দুটি নতুন পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করার কথা রয়েছে।

প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

সভার আলোচ্যসূচির মধ্যে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানাকে বিভক্ত করে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের বটতলী এলাকায় ‘মাতামুহুরী থানা’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এ থানার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৫৮টি নতুন পদ সৃষ্টি, ২৯টি যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম টিওঅ্যান্ডইভুক্ত করারও প্রস্তাব রয়েছে। এ বাবদ বছরে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয় হবে। প্রস্তাবটিতে পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও বিভাগীয় কমিশনারের সুপারিশ রয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সার-সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ভোলা জেলায় নৌ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় পূর্ণাঙ্গ ‘ধলী গৌরনগর নৌ থানা’ স্থাপনের প্রস্তাবও সভায় উঠছে। এ থানার জন্য ৩৫টি পদ সৃষ্টি, ১২টি যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক কোটি ২৬ লাখ টাকা।

বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের কামতারা এলাকায় নতুন ‘কামতারা পুলিশ তদন্তকেন্দ্র’ স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য ৩১টি পদ, ১৩টি যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংযোজন প্রস্তাবের পাশাপাশি এর জন্য বছরে প্রায় এক কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় হবে এমন উল্লেখ রয়েছে সার-সংক্ষেপে।

একই সঙ্গে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানাধীন ‘সুলতানপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্র’ স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ তদন্তকেন্দ্র পরিচালনায় ২২টি পদ সৃষ্টি ও ৫টি যানবাহন টিওঅ্যান্ডইভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এ জন্য বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৮ লাখ টাকা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, চারটি প্রস্তাবই পুলিশ অধিদপ্তরের সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, রেঞ্জ ডিআইজি ও বিভাগীয় কমিশনারের মতামত নিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রাক-নিকার সভায় প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা শেষে নীতিগত সম্মতি পাওয়া গেলে পরে সেগুলো প্রাক-নিকার সচিব কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি ও সেবার পরিধি বাড়বে, অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।