দেশব্যাপী নতুন করে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে শিশুদের ‘হাম’ রোগ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। শিশুদের মধ্যে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ কর্মকর্তা ও অভিভাবকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
পাঁচ হাজারের বেশি শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হামের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়াই এই প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির প্রধান কারণ। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না থাকায় আক্রান্তদের দুর্ভোগও বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতির জন্য অভিযোগের তির যাচ্ছে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অনেকেই মনে করছেন, সে সময়ের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের এই খাতে অজ্ঞতা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা হাম প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন–গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরজাহান বেগম কী যোগ্যতায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
ইউনূসের আমলে টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হামসহ অন্য টিকাদান কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবে চলমান ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে ড. ইউনূসের সরকার। এর পর থেকে প্রতিবছরের নিয়মিত টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ড. ইউনূসের সময়কালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির জন্য কোনো কার্যকর অপারেশন প্ল্যান (ওপি) গ্রহণ করা হয়নি। ফলে হামসহ শিশুদের অন্য টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর ফলে এখন হামের মৌসুমের সময় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই নথি বিশ্লেষণ করলে তা আরও স্পষ্ট হয়।
ইপিআই নথি অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে গড়ে ৯০ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়। ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশে। তবে ২০২৫ সালে এসে চিত্র পাল্টে যায়। ওই বছর এমআর-১ টিকার কাভারেজ নেমে আসে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে এবং এমআর-২ টিকার কাভারেজ ৫৭ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এমন তথ্য তুলে ধরে সমালোচনা করেছেন চিকিৎসক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার। তিনি এক ফেসবুক পোস্টে টিকাদান কর্মসূচির অবনতির চিত্র তুলে ধরেন।
গতকাল সোমবার নিজের ফেসবুকে উপহাস করে তিনি লিখেছেন, ‘এই হলো ইউনূসের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাজ। আমি যখন টিকার বিষয়ে বলেছিলাম, তখন বট বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। দেখেন কী করেছে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়। হামের টিকা শুধু না। সব টিকার হার কমিয়ে দিয়েছে। ৫৯.৬%। থ্রি জিরো চিবানো সব চাটার দল এখন কোথায়?’
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিও ভাবতে বলেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে সায়ের লেখেন, গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরজাহান বেগমকে ঠিক কোন যোগ্যতায় স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পদে বসিয়েছিলেন ড. ইউনূস? এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে জুলকারনাইন সায়ের বলেন, দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হামের প্রকোপে ৪১ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি-ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়ার কারণে আজ দেশে হামসহ আরও ৮-১০টি রোগের টিকার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নূরজাহান বেগম বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে কী কী কাজ করেছেন, সেসবের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে। আমরা জানতে আগ্রহী ইউনূস সাহেবের পছন্দে নিয়োগ পাওয়া এই মহিলা আসলে কী করেছেন।’
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর ৯ মাসের শিশুকে হামের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়। ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ টিকার আওতায় আনা হতো দেশের ৯০ শতাংশ শিশুকে। এই কার্যক্রম চলমান থাকে। পরিবারের অবহেলা বা অসচেতনতার কারণে বাকি পড়ে থাকে ১০ শতাংশ শিশু। তাদের জন্য প্রতি চার বছর পরপর ক্যাম্পেইন করে ৫০ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়।
কিন্তু ২০১৬ ও ২০২০ সালের সর্বশেষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি’র মাধ্যমে ওই শিশুদের জন্য কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় ইউনূস সরকার আসার পর এদিকে কোনো মনোযোগই দেওয়া হয়নি। শুধু হামই নয়, কোনো ধরনের টিকার জন্য ‘ওপি’ করা হয়নি। যার ফলে এখন টিকাবঞ্চিত শিশু ৫০ শতাংশ, যা চলতি মৌসুমে ভয়াবহ আকারে ধারণ করেছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর (ইপিআই) সারিয়ার সাজ্জাত সাংবাদিকদের জানান, ক্যাম্পেইনে ২০২৫ সালে টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে তা হয়নি। চলতি বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে হামের টিকা পাঠানো হলেও কর্মসূচি বাস্তবায়নের অর্থ এখনো বরাদ্দ না হওয়ায় তা পড়ে আছে মহাখালীর ইপিআই ভবনে। তিনি বলেন, ‘২০২০ সালে একটা ক্যাম্পেইন হয়েছিল। রুটিন অনুযায়ী ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে।’
দেশে হামসহ সব টিকার সংকট
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে সব ধরনের টিকার সংকট চলছে। কেন্দ্রীয় গুদামে ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নেমেছে। শুধু হামের টিকাই নয়, ইপিআই কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি–এই ছয়টি টিকার মজুত শূন্য। আইপিভি ও টিসিভি চলবে জুন পর্যন্ত এবং এইচপিভির মজুত আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মিথ্যা তথ্যে বিভ্রান্তি
গত রবিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সামনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দাবি করেন, আট বছর আগে ‘মিজেলসের’ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং এরপর আর কোনো গভর্নমেন্ট ভ্যাকসিন দেয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন দাবিটি মিথ্যা বলে জানিয়েছেন রিউমর স্ক্যানার টিম। অনুসন্ধান করে তারা জানায়, গত আট বছরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল যে দাবি করেছেন তা সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, পাঁচ বছর আগে ২০২০ সালেও হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার, যা ২০২১ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল। কর্মসূচির বাইরেও নিয়মিত টিকা দেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে।
হামের টিকা মিলবে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে হামের টিকা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হামসহ ছয়টি রোগের টিকা কিনতে ইউনিসেফকে ৬০৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে টিকা এলে ভ্যাকসিন কর্মসূচি বাড়ানো হবে।’
এ সময় চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের পর আট বছর হামের টিকার কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি।’
শিশু হাসপাতালে হাই-ডিপেন্ডেন্সি অ্যান্ড আইসোলেশন ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক ডা. রিয়াজ মোবারক সাংবাদিকদের বলেন, ‘এবার দেখতে পারছি মহামারি। আগে দেখা যেত না, এটা হঠাৎ করে কেন হলো। এটার কারণ হতে পারে, শিশুদের ওপর নানা রকমের ভাইরাসের আক্রমণ হচ্ছে। ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাচ্ছে। যার কারণেই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।’