শাংহাইয়ে যখন ২০২৬ সালের বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্মেলন শুরু হয়, তখন ‘বুদ্ধিমান সঙ্গী, যৌথভাবে ভবিষ্যৎ গঠন’ প্রতিপাদ্যের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই সবার ক্ষমতায়নের হাতিয়ার, নাকি এটি পুঁজি ও প্রযুক্তিগত বৈষম্যকে আরও গভীর করবে? চাইলেই এখন বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো প্রশ্নটি এড়াতে পারে না।
সম্মেলনটির তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল বিশ্ব এআই সহযোগিতা সংস্থা (ডাব্লিউএআইসিও) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং এআই গ্লোবাল গভর্ন্যান্স অ্যাকশন প্ল্যানের উপস্থাপন। বৈশ্বিক উত্তরের দেশগুলোর মতো এটি কোনো নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নয়। এতে বিশেষভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ‘বুদ্ধিমত্তার বৈষম্য’ বা ইন্টেলিজেন্স ডিভাইড কমানোর ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কেন বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ
এআই শাসনব্যবস্থায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত। বিশ্বের ৬০টিরও বেশি এআই শাসন কাঠামোর মধ্যে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর প্রস্তাবনার পরিমাণ পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম। অন্যদিকে উন্নত দেশ ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে উন্নত অ্যালগরিদম, কম্পিউটিং সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সম্পদ। বিপরীতে দক্ষিণের অনেক দেশকে এখনও ‘কম্পিউটিং মরুভূমি’ বলা হচ্ছে, যেখানে দেশগুলো ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব হারানোর গভীর চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়েছে।
এটি শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবধান নয়, নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণেরও বৈষম্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে শাংহাই সম্মেলনে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে প্রযুক্তিগত একচেটিয়াকরণের বিরোধিতা করেছে চীন। সেইসঙ্গে মানবকেন্দ্রিক, কল্যাণমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য এআই শাসনের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেছে। পেরুর গণমাধ্যম বলছে, চীনের এই উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাঠামোগত ব্যবধান কমিয়ে ডিজিটাল সক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব জোরদারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
হাংচৌ রায়: মানবকেন্দ্রিক নীতির অনন্য নজির
সম্মেলনে নীতিগত আলোচনার পাশাপাশি চীনের বিচারব্যবস্থার সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত উঠে এসেছে। আলোড়ন সৃষ্টিকারী হাংচৌ ‘এআই মান-পরীক্ষক প্রতিস্থাপন’ মামলায় দেখা গেছে— ৩৫ বছর বয়সী এক কর্মীকে প্রতিষ্ঠান জানায়, এআই ব্যবহারের ফলে তার পদ অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। এরপর তার বেতন কমানো হয় এবং পরে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। হাংচৌ উচ্চ আদালত এই চাকরিচ্যুতিকে বেআইনি ঘোষণা করে এবং প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ৬০ হাজার ইউয়ানেরও বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি বা ব্যয় কমাতে এআই ব্যবহার করা একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সেটি কর্মী ছাঁটাইয়ের আইনি ভিত্তি হতে পারে না। কর্মীকে বাস্তবিকভাবে প্রতিস্থাপন না করে এবং বিকল্প সমাধান নিয়ে আলোচনা না করে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ঝুঁকি শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
একই অবস্থান বেইজিং ও কুয়াংচৌর আদালতও নিয়েছে। এসব রায় স্পষ্ট করেছে যে, প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্বিচারে কর্মী ছাঁটাইয়ের বৈধতা তৈরি করে না এআই।
রায়টি সম্মেলনে প্রচারিত ‘কল্যাণকর বুদ্ধিমত্তা’র সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে বলা হয়, প্রযুক্তি মানুষের উন্নয়নে কাজ করবে, পুঁজির খরচ কমানোর অজুহাত হবে না। হাংচৌ উচ্চ আদালতের বিচারকও বলেছেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ পদায়নের সুযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

সম্মেলন থেকে আদালত: সুস্পষ্ট শাসন পথ
শাংহাই সম্মেলনের দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা উদ্যোগ এবং হাংচৌ আদালতের রায়কে পাশাপাশি রাখলে শাসন বিষয়ক একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। তা হলো—এআই শাসনে চীনের প্রস্তাবিত ধারণাটি প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে মানুষের কল্যাণে যুক্ত করতে চায়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে শুধু নিয়ম অনুসরণকারী দেশ নয়, বরং নিয়ম প্রণয়নের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেয়।
বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো এখন ব্রিকস ও বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে ‘উন্নয়নের অধিকার অগ্রাধিকার’ ভিত্তিক শাসন ধারণাকে এগিয়ে নিচ্ছে। ২০২৬ সালের সামার দাভোস সম্মেলনেও এই প্রবণতা প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো শুধু ‘প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি চায় না, বরং পরিকাঠামো, স্বায়ত্তশাসিত মডেল ও সক্ষমতা বাড়ানোর দাবিও জানায়’। এ সম্মেলনের মাধ্যমেই মূলত দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে ‘যৌথভাবে নিয়ম ও মানদণ্ড’ তৈরির একটি কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছে চীন।
এআই’র ঢেউ এখন অপ্রতিরোধ্য। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোরও উচিত হবে না চুপচাপ এর প্রভাব মেনে নেওয়া, বরং সক্রিয়ভাবে নিয়ম-নির্ধারণে তাদের অংশ নেওয়া উচিত।
পরিশেষে, শাংহাই সম্মেলনের ঐকমত্য থেকে হাংচৌর বিচারিক রায়; সবই এক সুতোয় গাঁথা। এতে যে অভিন্ন বার্তাটি উঠে এসেছে তা হলো—প্রযুক্তির সীমা আছে, পুঁজির আছে বাধ্যবাধকতা এবং মানুষের মর্যাদা ও অগ্রগতি সবসময়ই প্রযুক্তিগত যুক্তির ঊর্ধ্বে। এটিই চীনের অনুশীলন। ‘কীভাবে এআই সবার উপকারে আসবে?’ বৈশ্বিক দক্ষিণের মৌলিক এ প্রশ্নের এটিই সরাসরি উত্তর।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা, বেইজিং।