ছেলেবেলায় অনেকের স্বপ্ন থাকে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। পরিবারের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এরকম স্বপ্ন দেখাতে বেশি ভালোবাসেন। ভবিষ্যতের পেশা বাছাইয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন লালিত হয় বুকে। অনেক বাবা-মা সন্তানকে চিকিৎসক বানানোর জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেন। সেই সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করে এ পেশা অর্জন করতে হয়।
ইদানীং পত্রিকা খুললেই সামনে আসে দিন দিন এ মহৎ পেশা কলুষিত করা হচ্ছে। ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র জালিয়াতি করে চান্স পাওয়া ৩০০ শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করেছে পলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এদের বেশির ভাগ এখন এমবিবিএস পাস করে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত। কেউ কেউ অপরাধ ঢাকতে দেশের বাইরে অবস্থান নিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো ডাক্তার হয় দেশের মেধাবী সন্তানরা। কিন্তু এরকম জালিয়াতি করে স্বাস্থ্যসেবায় নাম লেখানো ডাক্তাররা তার মেধা দিয়ে কতটুকু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারবেন!
‘খবরের কাগজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘শাস্তির মুখে ৫০০ পলাতক ডাক্তার।’ অনেকেই দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। অনুপস্থিত থেকেও অনেকেই নিচ্ছেন বেতন-ভাতা। পদ আটকে রাখায় অন্যদের পদায়ন হচ্ছে বিঘ্নিত।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের হেমাটোলজির রেজিস্ট্রার ডা. জাকি ইয়ামানি ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। শুনানি ও তদন্ত শেষে তাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮-এর বিধি ৩ (খ) ও ৩ (গ) মোতাবেক অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন তা জানে না কর্তৃপক্ষ। ‘খবরের কাগজ’ পত্রিকা থেকে সম্ভাব্য অবস্থানগুলোয় খোঁজাখুঁজি করেও তার বর্তমান অবস্থান জানা যায়নি।
এরকম বেশকিছু তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখার তথ্য অনুসারে এভাবে গত দুই বছরে সারা দেশে কমপক্ষে ৫০০ চিকিৎসককে ‘অসদাচরণ ও পলায়ন’-এর দায়ে বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। অভিযোগের ফাইলও লম্বা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। তবে স্বাস্থ্য প্রশাসন বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতজনকে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে, বাস্তবে আরও বেশি সংখ্যক চিকিৎসক এ ধরনের অপরাধ করেন বছরের পর বছর। আবার অনেকে প্রভাব খাটিয়ে তদবির করেও অপরাধ থেকে মুক্তি পেয়ে যান।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা ‘খবরের কাগজ’কে বলেন, ফাঁকিবাজ ও পলায়নপর চিকিৎসকদের জন্য আমরা রীতিমতো অতিষ্ঠ। দুই বছরেই শাস্তির আওতায় ৫০০ জনের বেশি হলেও গত ১০ বছরে শাস্তিপ্রাপ্ত পলাতক চিকিৎসকের সংখ্যা কয়েক হাজার হবে।’
সরকারি চাকরি ছেড়ে এক ধরনের পালিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এত সাধনার সরকারি চাকরি ছেড়ে কেউ সহসা পালাতে চায় না। অনেকেই পদায়ন, পদোন্নতি ও বদলিজনিত বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হন। অনেকে হন দলীয় কারণে। অনেকে কোনো দল না করেও ‘নিরীহ’ হওয়ার কারণে কারও সাপোর্ট না পেয়ে বঞ্চিত হন। একপর্যায়ে তারা চরম হতাশ হয়ে কেউ বিদেশে পাড়ি জমান, কেউবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে বাধ্য হন। কেউ কেউ পেশা থেকে বিদায় নেন।’
কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে একজন চিকিৎসক শুধু পেশাকেই কলুষিত করছে না, নিরীহ অসহায় রোগীদের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার থেকেও করছে বঞ্চিত। আস্থা কাটাতে মেডিকেল ছাত্রাবস্থায় একটি মোটিভেশন কোর্স রাখা যেতে পারে। যেকোনো পরিবেশে ভবিষ্যৎ চিকিৎসকরা যেন খাপ খাইয়ে নিতে পারেন সেজন্য তাদের মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। শুধু বিভাগীয় শাস্তিই সমাধান নয়, কেন এমন ঘটনা ঘটছে সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য চিকিৎসকদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।