জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠ এখন উত্তপ্ত। সেই সঙ্গে রাজনীতিতে এই ‘হরতাল কালচার’ অর্থনীতির চলমান সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে রাজনৈতিক পরিবেশ ততটাই সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। সমঝোতা ও ঐকমত্য না হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন সহিংসতার রূপ পেতে চলেছে।
রাজনৈতিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। গত রবিবার হামলাকারীদের আঘাতে পুলিশ কনস্টেবল আমিরুল ইসলাম পারভেজের মৃত্যু হয়। এই মহাসমাবেশ রাজধানীর মানুষকে অনেকটাই অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। গণপরিবহন না থাকায় যাত্রীদের পড়তে হয়েছে অসহনীয় দুর্ভোগে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবেস্টনী এলাকায় প্রধান বিচারপতির বাসভবনেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। কাকরাইল-পল্টন হয়েছে রণক্ষেত্র। সমাবেশ পণ্ড হওয়ায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল পালন করেছে। বহুল আলোচিত মহাসমাবেশ ঘিরে চারদিকে উৎকণ্ঠা-উদ্বেগে সাধারণ মানুষ নাজেহাল। সাধারণ মানুষ চান শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। কিছুদিন ধরে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবে সমাবেশকে ঘিরে নানারকম গুজব জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
ঢাকায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘাতের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ তাদের এক্স হ্যান্ডলারে (সাবেক টুইটার) এক প্রতিক্রিয়ায় সব পক্ষকে শান্ত এবং সহিংসতা থেকে নিবৃত্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এতে সহিংসার ঘটনায় সম্ভাব্য ভিসা বিধিনিষেধের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
বেশকিছু জায়গায় দায়িত্ব পালনকালে অনেক সাংবাদিকও আহত হওয়ার খবর এসেছে। রাজপথে সহিংসতা কোনো সমাধান নয়। পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ও রাজনৈতিক উত্তেজনায় পরিবেশ বিনষ্ট হলো। বড় দুই দলের সহাবস্থানে থেকে সমঝোতার রাস্তা আরও জটিল হয়ে গেল।
এদিকে বড় সমাবেশ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলের শক্তি জানান দিল। এমন অবস্থায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হয়েছেন গ্রেফতার। ডিএমপি কমিশনার জানিয়েছেন, হরতালের নামে নৈরাজ্য হলে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। পূর্বানুমতি ছাড়াই রাজধানীতে সমাবেশ করল জামায়াত। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তিনি উদ্ভূত ঘটনার জন্য বিএনপিকে দায়ী করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন করতে গিয়ে জনসভায় ঘোষণা দিলেন, ‘লুটেরা-সন্ত্রাসীদের হাতে যাতে দেশ না পড়ে। কারণ তাদের হাতে দেশের মানুষ ও উন্নয়ন নিরাপদ নয়। আওয়ামী লীগকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে পুরো দেশের নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা হয়েছেন সোচ্চার। তারা দুই দলকেই সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংলাপ ও সমঝোতার পরামর্শ দিচ্ছেন বিভিন্ন মিডিয়ায়।
ইলেকশন মনিটরিং ফোরামের উদ্যোগে গত শনিবার অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে রাজনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতার বিকল্প নেই বলে মনে করেন দক্ষিণ এশিয়ার নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তারা আরও বলেন, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও সহযোগিতা।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে অর্থনীতিতেও টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি (এফবিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম ‘খবরের কাগজ’কে বলেছেন, ‘হরতাল সবসময়ই ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য খারাপ। আমরা বলে এসেছি এটা অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।’
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর ‘খবরের কাগজ’কে বলেন, দেশটা আঠারো কোটি মানুষের। শুধু রাজনীতিবিদদের নয়। সবাই চিন্তায় আছে, কবে আমাদের রাজনীতি ম্যাচিউরড হবে, রাজনীতিবিদদের বোধোদয় ঘটবে। কবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থিতিশীলতা আসবে, অর্থনীতি আবারও সঠিক ধারায় ফিরে আসবে।’
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার পরিবর্তনে প্রথম দরকার সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন। মানুষ আর সহিংস রাজনীতি দেখতে চায় না। রাজনীতিবিদদের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। রাজনীতিবিদদের হতে হবে জনবান্ধব। জনগণের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু বিগত বছরগুলোয় তা অনেকটাই পরিলক্ষিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে দেশের জানমালের ক্ষতি হয়। এ ধরনের সংঘর্ষ-সহিংসতা এড়াতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাড় দিয়ে হলেও সমঝোতায় পৌঁছানো প্রয়োজন।