বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির দিক থেকে তুলনামূলক পিছিয়ে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। সম্প্রতি খবরে উঠে এসেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। যে পাঁচ-ছয়টি বিষয়ের ওপর পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয় তার মধ্যে প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিকমান সূচক অন্যতম। র্যাঙ্কিং নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠানভেদে এই পয়েন্টের তারতম্য থাকলেও এ অংশটিকে বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ওয়েব সাইটের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যভিত্তিক কিউএস র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সূচকের জন্য ১৫ পয়েন্ট রাখা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট ৫, ইন্টারন্যাশনাল শিক্ষক ৫ ও ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ওয়ার্ক ৫ পয়েন্ট। অন্যদিকে টাইমস হায়ার এডুকেশন সাড়ে ৭ পয়েন্ট (ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক স্টুডেন্ট ২.৫, ইন্টারন্যাশনাল স্টাফ ২.৫, ইন্টারন্যাশনাল কোলাবোরেশন ২.৫ পয়েন্ট) রেখেছে। এ ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান বলছে, সবচেয়ে বেশি ১৯৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী আছে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের উপ-পরিচালক মাহবুবুল আলম খবরের কাগজ-কে বলেন, ‘বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ আছে। আগে যারা ভর্তি হয়েছিলেন তারাই এখন কন্টিনিউ করছেন।’
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩০ জন শিক্ষার্থী আছে। অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অফিসের পরিচালক অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দীন বলেন, ‘হলের আসন সংখ্যা অনুপাতে বিদেশি ছাত্রদের জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হয়। এ সংখ্যা কখনো ৫০ ছাড়ায়নি। তবে সর্বোচ্চ ৩৫-৪০ জন ভর্তি হয়েছিল ২০১৫-১৬ সালে। ভিসা জটিলতার কারণে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে ভর্তির আবেদন অনেক কমে গেছে।’
বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে প্রায় ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ২০ জন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের প্রতিবেদকের। তাদের মতে, আবেদন অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা ও মানসম্মত সুযোগ-সুবিধার অভাব বড় কারণ। এ ছাড়া ভাষা জটিলতা, শিক্ষাবর্ষের ভিন্নতা, ওয়েবসাইটে নিয়মিত আপডেট না হওয়া, অধ্যাপকদের পাবলিক ডোমেইন ও রিসার্চ প্রোফাইল না থাকা, পর্যাপ্ত বৃত্তি সুবিধা না থাকা, কোর্স কারিকুলাম হালনাগাদ না হওয়া, মানসম্মত জার্নালে শিক্ষকদের প্রকাশনা না থাকাকে বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়তে আগ্রহী না হওয়ার বড় কারণ।
অভিযোগ রয়েছে, ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অনেক সময় লেগে যায়। অনেক দূতাবাস সহায়ক ভূমিকা পালন করে না। মন্ত্রণালয় থেকে ক্লিয়ারেন্স না পেলে শিক্ষার্থীরা অফার লেটার পায় না। যে কারণে ভর্তি প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এভাবে বিদেশি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. আলমগীর বিষয়টি নিয়ে বলেন, ‘দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে। ভর্তির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বাধীনতা দিতে হবে। আর, ভিসার বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখবে।’
দেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোর বার্ষিক কার্যক্রমের তথ্যউপাত্ত-সংবলিত পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এ প্রতিষ্ঠানের ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ৮০৪। এরপর ক্রমাগত কমতে কমতে ২০২১ সালে কমে হয় ৬৭৭। এ হিসাবের বাইরে থাকা মেডিকেল কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী কিছুটা বেড়েছে।
বিদেশি শিক্ষার্থীরা যাতে উৎসাহিত হয় সেজন্য ভিসা কার্যক্রম সহজতর করতে হবে। ভর্তি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা রাখা যাবে না। বিদেশি শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাইলে প্রথমত দেখতে চাইবে সুন্দর পরিবেশ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আছে কি না। সেজন্য বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য মানসম্মত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যলয়গুলোকে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে নিতে হলে বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অন্তর্ভুক্তি বিশেষভাবে দরকার রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট অনেক সময় হালনাগাদ থাকে না, সেটাও দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের পাঠদান ও পাঠ্যক্রম দুটোই গতিশীল ও যুগোপযোগী করতে হবে।