বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষা চর্চার এক পবিত্র স্থান। কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয় যদি কোনো কারণে হয়ে যায় কলুষিত! তাহলে বিদ্যাশিক্ষার সেই ঐতিহ্যবাহী পাঠশালার গায়ে লেগে যায় কালিমা। গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটেছে দেশের ঐতিহ্যবাহী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও বহিরাগত এক যুবকের বিরুদ্ধে। ধর্ষণের এ ঘটনায় শনিবার রাতেই চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জরুরি সিন্ডিকেট সভা করে অভিযুক্তদের সনদ স্থগিত এবং ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। হয়েছে তদন্ত কমিটিও। ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে ক্যাম্পাসে মশাল মিছিল করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, মহিলা পরিষদ এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জাবিতে নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় কমিশন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র স্থানে এ ধরনের অপরাধ কোনোভাবেই কাম্য নয়। বারবার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এর পেছনের কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযুক্তকে দ্রুত সময়ে গ্রেপ্তার করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধুবাদ জানাই।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে ধর্ষণের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার সঠিক বিচার হয়েছে কি না, সেটিই এখন প্রশ্ন। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে প্রায়ই সামনে চলে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে সঠিক মানুষ তৈরির কারিগর। অথচ সেই পবিত্র স্থানটিকে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়ে লেখাপড়ার নেতিবাচক পরিবেশ ও শিক্ষাঙ্গনকে খারাপ বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন ক্রমেই যেন অগ্রসরমান। ক্ষমতার অপব্যবহার কখনোই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অলংকার হতে পারে না।
এখানে যারা অপকর্ম করেছেন, তাদের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতাও রয়েছেন বলে অভিযোগ এসেছে। এটি দলীয় আদর্শের বাইরের এক অন্ধকার অনুসরণ। ক্ষমতাকে পুঁজি করে এ ধরনের অপরাধ যারা করছেন, তাদের টুঁটি চেপে ধরার সময় এসেছে। শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কৃতি-গবেষণা সবকিছুতেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজ অনেক এগিয়ে। এখানে অনেক ভালো মানের গবেষণা হচ্ছে, গবেষক তৈরি হচ্ছেন। শিক্ষকরাও দেশ ও দেশের বাইরে শিক্ষা ও গবেষণায় প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেন। অথচ শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের জঘন্য কর্মকাণ্ড দেশের সব ছাত্র-শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। নাগরিক সমাজ আজ চিন্তিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েও চিন্তা করতে হয় অভিভাবকদের। যে, তাদের সন্তান সঠিকপথে আছে কি না। ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এগুলো শিক্ষাঙ্গনের আঙিনায় কেন? দেশের কোথাও থাকবে না এই ধরনের গর্হিত কর্মকাণ্ড।
তথ্যমতে, গত ৯ বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বহিরাগত নারীকে শারীরিক হেনস্তার অন্তত ১০টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। আন্দোলনও এসব নিয়ে কম হয়নি। ২০১৫ সালে ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসে এক নারী লাঞ্ছিত হন। একই বছর পহেলা বৈশাখে নৃগোষ্ঠীর এক ছাত্রীর যৌন হেনস্তা, ছিনতাই ও মারধরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ছিলেন। এ ছাড়া ৬ মার্চ দোল উৎসবে এক ছাত্রীর গায়ে রং দেওয়ার দায়ে ছাত্রলীগের এক নেতাকে তিন মাসের জন্য ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলম বলেন, ‘ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ও অস্থায়ী দোকানপাট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অছাত্রদের আবাসিক হল থেকে বের হওয়ার নির্দেশনা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হবে। তারা বের না হলে বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্যাম্পাসে অনুমোদনহীন রিকশা চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। গঠিত কমিটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে বলেও জানান তিনি।’
ধর্ষণ ঘটনায় জড়িতদের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তসাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজেই লেখাপড়ার নিরাপদ পরিবেশ খুঁজে পায়। নির্যাতনের শিকার নারী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকার উদ্যোগী ভূমিকা নেবে। এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।