মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও বাংলাদেশের কাছে কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মূলে রয়েছে রাজ্যটির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদ। বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রধানত এ কারণে যে, সেখানে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুততর হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে প্রতিবেশীসহ পশ্চিমা দেশগুলো রাখাইন প্রদেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজ্যটিতে চীন ও ভারত মেগা প্রকল্প নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। উভয় দেশই রাখাইন রাজ্যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলেও তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুত থাকায় রাজ্যটিকে এসব দেশের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মায়ানমারে যুদ্ধ চলছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোয়। ওপারের মর্টার শেল এপারে এসে পড়ছে। মানুষও মারা যাচ্ছেন। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। মায়ানমারের অনেক নাগরিক বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। মায়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। এ ক্ষেত্রে দ্রুত তাদের ফেরত পাঠাতে হবে। সীমান্তবর্তী এলাকায় আতঙ্কিতরা ঠাঁই নিচ্ছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। এদিকে মায়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে জাতিগত বিদ্রোহীদের চলমান সংঘর্ষে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন ৩২৮ জন। ঢাকায় নিযুক্ত মায়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়েকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে মায়ানমার, বাংলাদেশের সঙ্গে তা করতে চাইছে না।
ভারত থেকে বিমানযোগে এসব নাগরিককে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেও বাংলাদেশে আশ্রিতদের ফিরিয়ে নিতে চায় নৌপথে। ইতোমধ্যে মায়ানমার সরকার জাহাজ পাঠিয়েছে কক্সবাজারে।
রাখাইনে বাংলাদেশের স্বার্থ মূলত প্রতিবেশীসুলভ। অঞ্চলটিতে স্থিতিশীলতা ফিরলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সহজ হতো। এ ছাড়া বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তার জন্যও রাখাইনে স্থিতিশীলতা চায় বাংলাদেশ। এদিকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ বাড়ছে। অপরাধ বাড়লে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের জন্যও সমস্যা তৈরি হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব খর্ব করতে মায়ানমারকে কাছে টানছে ভারত। তাই রাখাইনে বড় ধরনের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। চীন যেহেতু রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দর করছে, তাই ভারত চাইছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাখাইনের সিটওয়ে বন্দর প্রকল্পের কাজ। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সমুদ্রপথে কলকাতার সঙ্গে রাখাইনের সিটওয়ে সংযুক্ত হবে। বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে সিটওয়ে বন্দর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা থেকে ভারতের সেভেন সিস্টারসখ্যাত সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহনে এ রুটটি ব্যবহৃত হবে।
অপরদিকে রাখাইন রাজ্যে চীনের অন্যতম প্রধান স্বার্থ প্রাকৃতিক সম্পদ। চীনের সঙ্গে ইতোমধ্যে মায়ানমারের মোট ৩৩টি চুক্তি হয়েছে। চীন রাখাইনে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণেও চুক্তি করেছে। চাওকপিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে চীন বিনিয়োগ করছে ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার। রাখাইন রাজ্যের চাওকপিউ টাউনশিপের মাদে দ্বীপে ১৫০ হেক্টর ও রামরি দ্বীপে ৯৬ হেক্টর জমিতে এই দুই প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে।
রাখাইন রাজ্যে রাশিয়ার সরাসরি অর্থনৈতিক স্বার্থ না থাকলেও দেশটি মায়ানমারের সামরিক সরকারের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে। এ কারণে রাশিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে তেমন কথা বলে না। মায়ানমারে অস্ত্র বিক্রি না করতে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয় গত বছরের শেষ দিকে। সেই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় চীন ও রাশিয়া। রাখাইন রাজ্যের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অঞ্চলটির প্রতি আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এ জন্য রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ ছাড়া তারা তেমন উচ্চবাচ্য করে না। অর্থনৈতিক স্বার্থ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে রাখাইন রাজ্য ঘিরে। দেশটি ভারত মহাসাগরে তার উপস্থিতি বাড়াতে চায়।
মায়ানমারে গৃহযুদ্ধের কারণে সীমান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং আশ্রয় নেওয়া সেনা ও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাবাসনে চীন-ভারতের পাশাপাশি আসিয়ান সদস্যদেশগুলোরও সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ জন্য দফায় দফায় এসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছে ঢাকা।
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোয়াড পুরোপুরি চীনবিরোধী জোট। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা আগে ভারতের চোখ দিয়ে এই অঞ্চলকে দেখত। এখন যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির পরিবর্তন হচ্ছে। তারা সরাসরি এই অঞ্চলে সম্পৃক্ত হতে চায়, যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত প্যাসিফিকের মতো ভারত মহাসাগরে তার সরাসরি উপস্থিতি বাড়াতে। যেটি হয়তো ভারত পছন্দ না-ও করতে পারে।’ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ এখন অনেকটাই অনিশ্চয়তার দিকে।
বর্তমান যে সমস্যা তা কূটনৈতিক উপায়েই সমাধানের সময় এসেছে। এ জন্য বাংলাদেশকে আরও কৌশলী ভূমিকা নিতে হবে। বাংলাদেশের উচিত হবে যুদ্ধে না জড়িয়ে জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করে কূটনৈতিক কৌশলে সমস্যার সমাধান করা। এ বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবে বলে আমরা আশা করি।