ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল। এমনিতেই সব খাদ্যপণ্যের দাম এখন আকাশচুম্বী। তার ওপর সামনে রমজান। প্রতিবছর রমজান মাসে এই সমস্যাটা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দাম কমিয়ে আনে। কিন্তু আমাদের দেশে উল্টো চিত্র দেখা যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার শুধু রোজায় ইফতার সারতেই ব্যয় বেড়ে যাবে অন্তত ৪০ শতাংশ। সারা বিশ্বে রোজায় মুসল্লিরা খাবারের পেছনে একটু বেশি ব্যয় করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বছরে মুসল্লিরা খাবারের পেছনে যে ব্যয় করেন এর ১৫ শতাংশই খরচ করেন রমজান মাসে।
সরকার কয়েকটি পণ্যে শুল্ক ভ্যাটে ছাড় দিলেও এর কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। রমজানের অনেক পণ্যের দাম দুই বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৫০ থেকে শতভাগ। অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলেও বাংলাদেশে এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হারের ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে চারটি শ্রেণিতে রেখেছে। বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাদ্যের মূল্যস্ফীতি শ্রেণিতে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ হিসাবে প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, ভুটান ও নেপালে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম ছিল। অনেক বেশি ছিল পাকিস্তানে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হার বেশি বেড়ে গেলে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী খাদ্যসংকটে পড়বে।
গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতা কম থাকায় ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে মুনাফা অর্জনের জন্য নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর সুযোগ পায়। দেশে বর্তমানে সরবরাহসংকট না থাকলেও কিছু অসাধু আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীর একটি অংশ রমজানকে সামনে রেখে বাড়তি মুনাফা পেতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে দেশের অন্যতম ভোজ্যতেল সরবরাহকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ ভোক্তাদের সুবিধায় একদিকে যেমন বেশি তেল আমদানি করছে, অন্যদিকে দামের ক্ষেত্রেও নিয়েছে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। সবাই যখন তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, এস আলম সেখানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিপ্রতি এক টাকা কমে বিক্রি শুরু করেছে।
আমদানি আদেশের তথ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে পণ্য সরবরাহের আগেই অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়িয়ে থাকে। ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের এ ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ডের কারণে দ্রব্যমূল্য অনেক বেড়ে যায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাব দৃশ্যমান হয় না।
রমজান মাস আসতে বাকি আরও এক সপ্তাহ। এরই মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বাজারে বাড়তে শুরু করেছে চাল, তেল, চিনি, আটা, ময়দা, ডাল, ছোলা, ব্রয়লার, মুড়ি ও চিড়াসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম। এজন্য ব্যবসায়ীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডলারসংকট ও ঋণপত্র খোলা নিয়ে জটিলতাকে বেশি দায়ী করছেন। এখন দেশের বাজারে মার্কিন ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ডলার সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার বিভিন্ন নীতিমালা প্রয়োগ করেছে। রমজান উপলক্ষে পণ্য আমদানির সুযোগ রেখে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ও নীতি বিভাগ। পণ্যগুলো হলো ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল, মটর, পেঁয়াজ, মসলা, চিনি ও খেজুর। সে ক্ষেত্রে রমজান উপলক্ষে নিত্যপণ্যের দাম আরও কমার কথা থাকলেও ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়াচ্ছে।
ক্ষুদ্র, বড়, মাঝারি ও করপোরেট ব্যবসায়ীরা তাদের সুবিধামতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বেশি দামে মজুত ও বিক্রি করে থাকেন। ফলে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ওয়াহিদা আক্তার জোর দিয়ে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়।
পাকিস্তানের ফেডারেল সরকার রমজান মাস উপলক্ষে ভর্তুকি মূল্যে আটা, ঘি ও চিনি সরবরাহের জন্য ৬৪৮ কোটি ৪০ লাখ রুপি বরাদ্দ দিয়েছে। রমজান মাসে সর্বাধিক সংখ্যক নির্ধারিত সুবিধাভোগীকে সেবার আওতায় আনার জন্য অতিরিক্ত ১ কোটি ২৭ লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে পরিষেবা দেওয়া হবে।
রমজান সংযমের মাস। ব্যবসায়ীদেরও অতি মুনাফা ত্যাগ করে সংযমী হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। পণ্যভিত্তিক সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে টাস্কফোর্স গঠন করে বাজার তদারকি বাড়াতে হবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই রমজানে খাদ্যপণ্যের দাম সহনীয় হবে বলে আশা করা যায়।