মধুমতী নদীর কোল ঘেঁষে টুঙ্গিপাড়া গ্রাম। সেই গ্রামেই ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মেছিলেন এক শিশু। বাবা-মায়ের আদরের খোকা একসময় হয়ে উঠলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই ছোট্ট খোকাই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন তার অবিস্মরণীয় কর্মের মাধ্যমে। শিশুদের কাছেও বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠলেন আরেক শিশুগুরু। শিশু-কিশোরদের তিনি প্রাণভরে ভালোবাসতেন, সে কারণে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম প্রস্তাব করেন বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চ জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালনের জন্য। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন মন্ত্রিসভা ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পরে ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ থেকে প্রতিবছর দিনটি সরকারিভাবে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে।
শিশুরা মুক্তচিন্তা ও মুক্তমনে নিজেদের জীবনকে যাতে প্রস্ফুটিত করতে পারে, সে জন্য তিনি বহু কাজ করেছেন। বিশেষ করে শিশুদের সব অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশু-কিশোরভক্ত খোকা কালক্রমে যখন বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি হলেন, তখনো শিশু-কিশোরদের তিনি ভোলেননি। খোকা শৈশবে বা কৈশোরে স্বাধীনতা ভোগ করেছেন, নিজেকে মেলে ধরেছেন প্রজাপতির মতো। এ দেশের শিশু-কিশোররা যাতে আনন্দে হেসে-খেলে মুক্ত-স্বাধীন হয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ ও পরিবেশ পায়, সে কথা তিনি মনেপ্রাণে সব সময় ভেবেছেন।
শিশুপুত্র রাসেল বঙ্গবন্ধুর নয়নের মণি এবং বাংলাদেশের সব শিশুর প্রতীক। তিনি রাসেলকে এ দেশের সব শিশুর মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, শিশু হও, শিশুর মতো হও। শিশুর মতো হাসতে শেখো। দুনিয়ার ভালোবাসা পাবে। আসলে বঙ্গবন্ধু ছিলেন শিশুর মতো সরল মানুষ, তার হাসিও ছিল শিশুর মতো। আর তাই সারা পৃথিবীর ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু শিক্ষা-সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমেও শিশুদের অনুপ্রাণিত করতেন। তিনি মনে করতেন যে, শিক্ষা-সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া ছেলেমেয়েরা মুক্তমনা স্বাধীনচেতা হতে পারবে না। তাই তিনি কচি-কাঁচা নামক শিশু সংগঠনটিকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করার পরই বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হলেন। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তারের আগমুহূর্তে বলেছিলেন, এই পাঁচ বছর তোমরা শিশু সংগঠন কচি-কাঁচার মেলার মাধ্যমে কাজ করো। নিজেদের সচল রাখো। তিনি পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা মাথায় নিয়ে অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ৫ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের পরিকল্পনা তার সময়ই হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বলতেন, শিশুদের যথাযথ শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটলে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হবে। প্রতিটি শিশুর মাঝেই বঙ্গবন্ধুর চেতনা ছড়িয়ে পড়ুক। দেশপ্রেমিক মানবহিতৈষী নাগরিক হিসেবে নিজেকে মেলে ধরুক একালের শিশুরা। জাতীয় শিশু দিবস সফল হোক, সার্থক হোক।