বান্দরবানের রুমায় পরিকল্পিতভাবে পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ করে ব্যাংক ডাকাতির মিশনে নামে সন্ত্রাসী বাহিনী। কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) দুর্ধর্ষ কায়দায় প্রায় ১০০ জনের সন্ত্রাসী দল সোনালী ব্যাংক ঘেরাও করে হামলা চালায়। পরে টাকা লুটসহ ম্যানেজারকে অপহরণ করে নিয়ে যায় তারা। গত মঙ্গলবার ঘটে যাওয়া বান্দরবানের ঘটনায় সমঝোতার শর্ত ভঙ্গ করে পর পর দুই দিন ব্যাংক ডাকাতিকে নিছক ডাকাতি হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন এর মাধ্যমে পার্বত্য এলাকার সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট সরকারকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এর পেছনে বিদেশি ইন্ধন থাকার বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরা খবরের কাগজকে বলেন, কেএনএফ-এর সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। এখন তারা সেই চুক্তি ভঙ্গ করে সরকারি ব্যাংকের টাকা লুট করেছে, ম্যানেজারকে তুলে নিয়ে গেছে। তাদের এই কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে তারা সরকারের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
২০১৭ সালে নাথান বম এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করলেও ২০২২ সালে এটি আলোচনায় আসে। রাঙামাটির সাজেকের বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা ও আলীকদম- এই নয়টি উপজেলা নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত একটি পৃথক রাজ্য দাবি করে আলোচনায় এলেও তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম এখনো বান্দরবানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পাহাড়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণে মদদ, ব্যাংক লুট এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একাধিক সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ খবরের কাগজকে বলেন, ২৪ ঘণ্টার কম সময়ে বড় আকারে দুটি ব্যাংকে হামলা ও অস্ত্রশস্ত্র লুট নিঃসন্দেহে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ঘটনাটিকে ব্যাংক ডাকাতি আখ্যা দেওয়া হলেও তা নিছক চোর-ডাকাতের অপরাধকর্ম নয়। এসব আক্রমণের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শগত প্রণোদনা ও লক্ষ্য, যার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এসব সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড করছে। এসব কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় তাদের বিশ্বাস নেই । তাদের উদ্দেশ্য আরও বড়। স্বায়ত্তশাসন কিংবা বাংলাদেশের সীমান্তের পাশের ভারত ও মায়ানমার অংশের কুকি চিন জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে বড় আকারের ঐক্য গড়া ও বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা।
উন্নয়নের ছোঁয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সংযোগ সড়ক হচ্ছে। পাহাড়ি জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। কৃষিতে এক ধরনের বিপ্লব সাধিত হয়েছে। পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনার দ্বার রচিত হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে এখানে বিদেশি কালো ছায়া থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
ব্যাংক হলো আর্থিক সুরক্ষার এক নির্ভরতার জায়গা। সেখানে সহজেই যদি এমন কার্যক্রম সন্ত্রাসীরা চালায়, তাহলে সাধারণ মানুষের নির্ভরতার জায়গা চরম হুমকির মধ্যে পড়ে। এসব ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা নিছক অপরাধ নয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড পাহাড়ের শান্তি, নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। পাহাড়ে অস্ত্রের সরবরাহ বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে এবং সহজেই পাওয়া যায়। এ কারণে অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে অবাধে সেই অস্ত্রের বিচরণ সহিংসতার মাত্রাকে ছড়িয়ে দেয়। ব্যাংক ডাকাতিতে জড়িত সবার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে যেসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী রয়েছে, তাদের তৎপরতা বন্ধে রাষ্ট্রীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারকে আন্তরিকতার সঙ্গে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে- সেটিই প্রত্যাশা।