অর্থনীতিতে আশঙ্কা ও স্বস্তি উভয়ই আছে। সম্প্রতি ডলারের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। ফলে লেনদেনের ভারসাম্যে ইঙ্গিতপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ওপর। দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকট বেড়েছে। গ্যাসের অভাবে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দামের লাগাম টেনে ধরা মুশকিল হয়ে পড়ছে। সরকারি আয়ের অন্যতম বড় উৎস রাজস্ব আহরণে ঘাটতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগ নেওয়ার পরও নিয়ন্ত্রণে আসেনি মূল্যস্ফীতি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও স্বস্তি মিলছে না। কমেনি ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। নতুন বিনিয়োগ নেই। কমে গেছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। এই কঠিন সময়ে স্বস্তির জায়গাটা হচ্ছে, মন্দার কবলে পড়েনি অর্থনীতি। জিডিপির প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়নি। তবে সুখবর হচ্ছে, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স আয় খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি।
রিজার্ভ কিছুটা সহজলভ্য হয়েছে। ফলে লেনদেন ভারসাম্যে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা প্রাক্কলন করা হয় ৭.৫ শতাংশ। অবশ্য সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় সাড়ে ৬ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী এবার বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি হবে না।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ৮ মাসের রপ্তানি আয় ৩ হাজার ৮৮৫ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৭০৮ কোটি ডলার।
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক ঊর্ধ্বতন পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসায় বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটি। কারণ প্রায় ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হার দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এটাকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। টাকার বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। কিন্তু রিজার্ভ সংকট পুরোপুরি কাটেনি বলে জানান তিনি।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে, করোনাকালীন অর্থনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল এই রেমিট্যান্স। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আশু পদক্ষেপ হিসেবে প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে আমদানির ক্ষেত্রে ডলার সমস্যা যাতে অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য প্রবাসী আয় আকর্ষণে মনোযোগী হতে হবে। বৈধ পথে অধিক পরিমাণে যাতে রেমিট্যান্স আসে সে জন্য নতুন প্রণোদনা, সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।
রেমিট্যান্স বাড়াতে নতুন নতুন বাজারের সন্ধান করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা সীমিত রেখে, সরকারি ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে পারলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে উঠবে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স যাতে আরও বেশি আসে, সে ব্যাপারে উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।