গত ১০ দিনের সহিংসতায় হঠাৎ করে পথ হারিয়েছে দুর্দান্ত গতি পাওয়া প্রবাসী আয়প্রবাহ। সাম্প্রতিক সহিংসতা ও তা নিরসনে কারফিউ এবং সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির কারণে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ অনেকটাই কমে গেছে। এ বছরের জুনে সর্বোচ্চ দুই দশমিক ৫৪ বিলিয়ন বা ২৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পায় বাংলাদেশ। ইন্টারনেট নিষ্ক্রিয় থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা ও আন্তব্যাংক সার্ভার বন্ধ ছিল। ফলে আমদানি-রপ্তানির মতো আন্তর্জাতিক লেনদেন যেমন হয়নি, তেমনি রেমিট্যান্সও আসেনি।
অথচ গত মে মাসে ডলারের দর সমন্বয় করার পর ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স বাড়ছিল। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে রেমিট্যান্সের অবদান প্রায় ৫ শতাংশের মতো। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক খবরের কাগজকে বলেন, কিছু ব্যাংক নিজস্ব এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে থাকে। সে হিসেবে কিছুটা কম রেমিট্যান্স সংগ্রহ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের প্রথম ১৮ দিনে গড়ে প্রতিদিন রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৮ কোটি ডলার। কিন্তু ১৯ তারিখ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ছয় দিনের মোট রেমিট্যান্স আসে মাত্র ৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা স্বাভাবিক সময়ের এক দিনেরও সমান নয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রেমিট্যান্সের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে ডলারসংকট চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানাভাবে সেই সংকট উত্তরণের চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত ক্রলিং পেগ পদ্ধতির সূচনা করে। এ পদ্ধতিতে ডলারের দর ১১০ টাকা থেকে ৭ টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা হয়। ডলারের এ দরকে বাজারমুখী দর বিবেচনায় নিয়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর অংশ হিসেবে ওই পদ্ধতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ইতিবাচক ফলাফলও পেতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত ৩০ জুন শেষ হওয়া অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স আসে ২৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয় ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগের দুই অর্থবছরে (২০২২-২৩ এবং ২০২১-২২) দেশে রেমিট্যান্স আসে যথাক্রমে ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন এবং ২১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার।
এ বছর ডলারের দর বাড়ানোর পর মে থেকে জুন- দুই মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ৪ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন বা ৪৭৯ কোটি ডলার। মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রবাসীরা রেমিট্যান্সের প্রতি ডলারের দর পাচ্ছেন ১১৭ টাকার সঙ্গে বাড়তি আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা। এতে ডলারপ্রতি দর পড়ছে ১২০ টাকার মতো। বিশ্লেষকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই মূল্যায়ন করছেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন খবরের কাগজকে বলেন, ডলারের দরে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এখন ডলারের সরবরাহ বেড়েছে এবং দর ১১৭ থেকে ১১৮ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল আছে। ডলার সংকটের কারণে আমদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি কিছুটা উন্মুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সময়মতো আমদানি হলে এর প্রভাব পড়বে বাজারে। মূল্যস্ফীতি কমবে। আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি ও এআইআইবিসহ উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ এসেছে। এর প্রভাবও পড়ছে অর্থনীতিতে।
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তী সহিংসতার কারণে প্রবাসীদের একটি অংশ বৈধ পথে রেমিট্যান্স না পাঠিয়ে হুন্ডিতে পাঠানোর ক্যাম্পেইন শুরু করেছে বলে তথ্য এসেছে। এ অবস্থায় রেমিট্যান্স কমে গেলে দেশে ডলারের দর আরও বেড়ে মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
প্রবাসী আয়ের প্রবাহ উত্তরণে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রেমিট্যান্স যাতে বেশি পরিমাণে আসে সে বিষয়টি অবশ্যই প্রাধান্য দিয়ে কৌশল বা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ইন্টারনেট সেবা সক্রিয় করে দিতে হবে। যত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে ততই দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে।