বায়ুদূষণ আজ রাজধানীবাসীর সবচেয়ে বড় সমস্যা। বিশ্বব্যাপী রোগের বোঝা বড় হওয়ার পেছনে এই বায়ুদূষণের ভূমিকা রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিষণ্ণতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে বায়ুদূষণের সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিন নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শিল্প ও কারখানার ধোঁয়া, উন্মুক্তভাবে ফেলে রাখা নির্মাণসামগ্রী থেকে ধূলিকণা বাতাসে মিশছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া শহরের বাতাসকে আরও অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে। ফলে রাজধানীবাসীর ফুসফুসে প্রতিদিন বিষ ঢুকছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বায়ুদূষণই এখন ঢাকার মানুষের মৃত্যু ও শ্বাসযন্ত্রের রোগের অন্যতম কারণ। দূষিত বায়ু স্নায়ুরোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যানসার ও কিডনি রোগের অন্যতম কারণ। বায়ুদূষণ, সবুজ এলাকা কমে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে রাজধানী ঢাকা ভয়াবহ পরিবেশসংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রায়ই বিশ্বের সর্বোচ্চ দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা মহানগরী শীর্ষে উঠে আসে। এতে হুমকির মুখে পড়ছে নগরবাসীর স্বাস্থ্য। গবেষকরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা একসময় বসবাসের অনুপযোগী নগরীতে পরিণত হবে। তাদের মতে, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, সবুজায়ন, জলাধার সংরক্ষণ এবং সঠিক নগর পরিকল্পনা ছাড়া রাজধানীকে বসবাসযোগ্য রাখা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি ‘রাজধানী ঢাকার টেকসই উন্নয়নে বিকেন্দ্রীকরণ ও পরিবেশ সুরক্ষা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় পরিবেশ উপদেষ্টা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে ঢাকার সমস্যা বাড়ছে। রাজধানীর জনসংখ্যা আর যেন না বাড়ে, তা নিয়ে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে ঢাকার সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, একটি শহরে মাথাপিছু কমপক্ষে ৯ বর্গমিটার সবুজ জায়গা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় এ মান অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সূত্রাপুর, কলাবাগান, বংশাল, মিরপুর ও রামপুরার মতো এলাকাগুলো এখন প্রায় শতভাগ কংক্রিটে মোড়ানো। কোথাও খোলা জায়গা ও পর্যাপ্ত গাছপালা নেই। সবুজ হারানোর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তাপমাত্রায়। ১৯৮০ সালের পর থেকে ঢাকার গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন গড়ে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির নিচে নামছে না। ঢাকার কিছু কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গবেষকদের মতে, যদি এ হারে সবুজ কমতে থাকে, তাহলে ২০৩৫ সালের মধ্যেই ঢাকার ৭০ শতাংশ মানুষ তাপ ও দূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) ২০২৫-এর গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স বিশ্বের বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা তিন ধাপ পিছিয়ে ১৭১তম অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ রাজধানীতে থাকলেও সবুজের ঘাটতি ও অতিরিক্ত উষ্ণতা জীবনযাপনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার উন্নয়নকে মহানগরের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য যথাযথ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে।
রাজধানীবাসী এখন ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। চারদিকে শুধু দূষণ আর দূষণ। সেই সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পরিবেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই দূষণরোধে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমরা চাই পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ, তাহলেই রাজধানীর ওপর থেকে চাপ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।