অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে গত পরশু হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তা মাইলফলক হয়ে থাকবে।
১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা ছিল, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয় সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এ দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়। কিন্তু এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত সেই যৌথব্যবস্থা বাতিল করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করল। একই সঙ্গে যাতে এ ব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করা যায় সেজন্য তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠারও নির্দেশ দিয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে একটা ঐতিহাসিক রায়।
চতুর্থ ও পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে মূল সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এবার তারা সেই কর্তৃত্ব ফিরে পেল। আদালত রায়ে ঠিকই বলেছেন, দুই দফায় সংশোধিত আইনটি ছিল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখন বিচার বিভাগ শুধু কাগুজে স্বাধীন হবে না। সত্যিকারের স্বাধীনতা এর কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের কাছে উপস্থিত হবে। আদি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের পুনর্বহাল হওয়া তাই খুবই ইতিবাচক বলা যায়। আদি সংবিধানে বলা ছিল, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।
আদালত এবার সেকথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন। রায়ে বলেছেন, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আছে, যাদের স্বাধীন পরিচয় রয়েছে। অথচ বিচার বিভাগের জন্য কোনো সচিবালয় গঠিত হয়নি। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের নির্দেশনা উল্লেখ করে আদালত বলেন, বিচার বিভাগ অবশ্যই নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হবে। অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হবে। কার্যক্রম ও কাঠামোগতভাবে বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের স্বাধীন অঙ্গ। স্বাধীনভাবে কাজ করতে এবং সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের অন্য দুটি অঙ্গ (আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগ) থেকে বিচার বিভাগ পৃথক; নির্বাহীর ছাতার নিচে কিংবা মিশে কাজ করতে পারে না। পৃথক বিচার বিভাগ সাংবিধানিক অধিকার।
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে উচ্চতর আদালতই অধস্তন আদালতকে তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে ন্যস্ত থাকার ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছিল। বিগত বছরগুলোতে নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সব দেশেই বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হয়ে বিচারসংক্রান্ত যাবতীয় কাজ করে থাকে। এখন আমাদের সেই সাংবিধানিক অধিকার ফিরে এল, প্রতিষ্ঠিত হলো। আইন মন্ত্রণালয় তথা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে অধস্তন আদালতের কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হলো।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ ছিল মৌলিক অধিকারের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এবার স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর হলেও সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গগুলো থেকে বিচার বিভাগের পৃথক্করণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে’; এই প্রতিশ্রুতি কার্যকর হতে চলেছে। এখন থেকে ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট একচ্ছত্রভাবে অধস্তন আদালতকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি অবশ্যই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য একটি মাইলফলক।
১৯৭২ সালের সংবিধান নিয়ে অনেক সময় বিতর্ক তোলা হয়, কিন্তু এই রায়ের মাধ্যমে সেই সংবিধানে ফিরে যাওয়ার যে রায় হলো, সেটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক রায়। একজন প্রথিতযশা আইনজীবীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরা বলতে চাই, অন্তর্বর্তী সরকার এই রায় বাস্তবায়ন করে দিয়ে যাবে। রায়টি বাস্তবায়িত হলে তা বিচার বিভাগের সংস্কার হিসেবেই গণ্য হবে। অনেকটাই নিশ্চিত হবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের বিষয়টি।