দেশে একের পর এক মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেই চলেছে। মব সন্ত্রাস দমনে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা কাজে আসছে না। বরং নতুন রূপে মবের ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে কবর থেকে লাশ তুলে এলোপাতাড়ি আঘাত ও প্রকাশ্যে উল্লাস করে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা সবাইকে হতবাক করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এ বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার শেষ কোথায়! সব ধরনের বর্বরতাকে হার মানিয়েছে এ ঘটনা। কেউ কেউ এ ঘটনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা বা সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও সরকার এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
সচেতন মহলের দাবি, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বা প্রেক্ষাপটের সুযোগ নিয়ে অনেকে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মব সন্ত্রাস দমনে যথার্থ ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ কারণে দেশে মব সন্ত্রাসের প্রবণতা বাড়ছে বলে অনেকে মনে করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক শক্তি বা সমর্থন ছাড়া কেবল পুলিশ দিয়ে মব সন্ত্রাস দমন করা যাবে না। নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তির হাতে দেশের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হলেই মব সন্ত্রাসের মতো অপরাধ কমে যাবে।
এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক খবরের কাগজকে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন হয়ে যখন স্বেচ্ছাচারী হয়, তারও নির্যাতন-নির্মমতার ধরন থাকে, যা বিগত সরকারের আমলে আমরা দেখেছি। কিন্তু যখন রাজনৈতিক সরকার থাকে না, তখন মব ভায়োলেন্স বা যেকোনো অপরাধই বাড়তে থাকে। এর মানে আবার এই নয় যে, রাজনৈতিক শক্তি বা দল ছাড়া সরকার চালানো যায় না। তবে রাজনৈতিক সরকার অবশ্যই তুলনামূলক ভালোভাবে দেশ চালাতে পারে। কারণ তাদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি থাকে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৪-এর আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ২২০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৯৬ জন এবং চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ১২৪ জন। ৮ মাসে সবচেয়ে বেশি নিহতের সংখ্যা গত আগস্টে, ওই মাসে ২১ জন নিহত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মব সন্ত্রাসের ঘটনা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের অভাবও মব সন্ত্রাস বেড়ে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় এসব দমাতে পারছে না বা সক্ষমতাও দেখাতে পারছে না। কিছু ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটু কঠোর পদক্ষেপ নিতে গেলেও সেখানে তারা সমালোচনার মুখে পড়ছে। তার পরও দেশের স্বার্থে সেনাবাহিনীকে এগিয়ে আসতে হবে। গতকাল অবশ্য সেনা সদর ব্রিফিং করে বলেছে, ‘মব সহিংসতা দমনে কাজ চলছে, কেউ মব সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর হবে সেনাবাহিনী।’
মব সন্ত্রাসের বিস্তার ঠেকাতে সরকারকে দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বপ্রথম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মব সন্ত্রাস রাষ্ট্র প্রতিহত করতে না পারলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে। দেশে আইন না মানার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে মব সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এগুলো এখনই দমন করতে না পারলে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। জনগণকেও সচেতন হতে হবে। আশা করছি, সরকার দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে মব সন্ত্রাসে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।