ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি মাইলফলক স্থাপিত হলো। ছোটখাটো দু-একটি অভিযোগ ছাড়া ডাকসু এবং হল সংসদ নির্বাচনের ভোট পর্ব সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়। এরপর ঘোষণা করা হয় ফলাফল। ফলাফলকে মেনে নেওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও ধন্যবাদার্হ হয়ে থাকবেন। নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানাই।
নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশও ছিল অনেক ভালো। ভোট চলাকালে ক্যাম্পাসে প্রার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে সহজ-স্বাভাবিক সহাবস্থান। পরিবেশ ছিল সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের আবহে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। কোনো ধরনের সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। স্বস্তির বিষয় ছিল এটাই। ভোটাররা অবাধে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। ধারণা করা যায়, এই নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে তাদের অনেকেই জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখবেন। অতীতে এমনটাই দেখা গেছে। ডাকসু থেকে অনেক নেতা জাতীয় পর্যায়ে উঠে এসেছেন। জাতীয় রাজনীতিতে তারা অবদান রেখেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারা সব সময়ই চ্যালেঞ্জের। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন প্রায় দেড় হাজার প্রার্থী। ডাকসুর ২৮টি পদের বিপরীতে ৪৭১ জন এবং ১৮টি হল সংসদে ২৩৪ পদে প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৩৫ জন। এর মধ্যে বিভিন্ন পদে ৬২ জন ছাত্রী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
প্রার্থীসংখ্যার মতো এই নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যাও ছিল বিপুল, ৩৯ হাজার ৮৭৪ জন। এদের মধ্যে ছাত্র ভোটার ছিলেন ২০ হাজার ৯১৫ এবং ছাত্রী ভোটার ১৮ হাজার ৯৫৯ জন। কেন্দ্র ছিল ৮টি আর তাতে বুথের সংখ্যা ছিল ৮১০। বোঝাই যায়, এ ছিল এক বিশাল আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় এসব সামলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করেছে।
অতীতে জাতীয় নানা ইস্যুতে ডাকসুকে জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, স্বাধীনতা সংগ্রামে ডাকসু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। জাতীয় পর্যায়ে যেসব দল রাজনীতি করে তারা সব সময়, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল ডাকসুতে তাদের ছাত্রসংগঠনের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চেয়েছে। এবারই এমন একটা সময়ে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, যখন কোনো দলীয় সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নেই। তবে নতুন একটি ছাত্রসংগঠন প্রভাবশালী দুজন উপদেষ্টার সরাসারি আশীর্বাদপুষ্ট বলে অনেকেই ধারণা করে থাকেন। অন্য দুই প্রধান দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীও এই নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বামধারার কয়েকটি রাজনৈতিক দলেরও দৃষ্টি ছিল এই নির্বাচনের ওপর।
সামনেই জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে মানসিকভাবে এগিয়ে থাকার জন্য ডাকসুর ফলাফলকে যে অনেকেই মানসিকভাবে উজ্জীবিত হওয়ার উপায় ভেবেছেন, বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে তা আঁচ করা গেছে। এই নির্বাচনের খবর ঢাবি ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। খবরের কাগজের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিভিন্ন শীর্ষ রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজ নিজ ছাত্রসংগঠনের প্রার্থীদের পক্ষে মতামত তৈরি করেছেন। দলের প্রার্থীদের পক্ষে স্থানীয় কর্মী-সমর্থকরাও নানা মাধ্যমে প্রচার চালিয়েছেন। কয়েক মাস পরই জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় ডাকসু নির্বাচন অনেক গুরুত্ব পেয়েছে।
ডাকসু নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রত্যাশা ভঙ্গের দীর্ঘ ইতিহাস। এর শতবর্ষের বেশি ইতিহাসে মাত্র ৩৭ বার, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ সময়ে নির্বাচন হয়েছে। সবচেয়ে কম হয়েছে স্বাধীনতার পর; ৫৪ বছরে মাত্র সাতবার। সেদিক থেকে গণ-আন্দোলনের এক বছরের মাথায় এ রকম একটি বড় আয়োজন পারাটা সহজ ছিল না।
গণ-আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা তারুণ্যের মতামত এই নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে। এরা যে গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ থেকে প্রার্থী হয়েছেন, ভোট দিয়েছেন; এর সবই এই নির্বাচনের ইতিবাচক দিক। ভবিষ্যতে সব নির্বাচনে এর প্রতিফলন ঘটবে বলে আমরা আশা করি। বিশেষ করে আমাদের ছাত্ররাজনীতি সুস্থধারায় ফিরবে বলে আমরা আশা করছি। এর প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতেও পড়বে। ছাত্র-প্রতিনিধিত্বের মধ্য দিয়ে আগামী দিনগুলোতে ক্যাম্পাসগুলো নানা কর্মকাণ্ডে মুখর হয়ে উঠবে। সৃষ্টি হবে জাতিকে সব ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব। জয়-পরাজয় নয়, যেকোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করাই বড় কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীসমাজ স্থাপন করল সেই দৃষ্টান্ত।