২০২৩ সালে ছুটি কাটানোর কথা বলে মনীষা মজুমদারের মা তাকে গ্রামের বাড়ি রাউজানে নিয়ে যান। তখন মনীষা নবম শ্রেণির ছাত্রী। ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগে তাকে জোর করে বাল্যবিবাহ দেওয়া হয়। কিন্তু মনীষার মন পড়ে থাকে স্কুলে। তাইতো শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে আবার স্কুল যায় মনীষা। কিন্তু আগের প্রতিষ্ঠানটি তাকে আর ক্লাস করতে দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে মনীষার থাকা-খাওয়া নিয়ে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। এরপর আলোচনার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের নির্দেশে মনীষাকে দেওয়া হয় নগরীর রউফাবাদ সরকারি শিশু পরিবারে। সেখানে থেকেই সে এবার জিপিএ ৩.৪৪ পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।
মনীষার মতোই কষ্টের জীবন জান্নাতুল, উয়ইসিং মার্মা, সামি, নাইমা, বিথী, অ্যানি ও নিশির। তাদের কারও বাবা নেই, কারও মা। ভাইবোনদেরও চেনে না কেউ কেউ। স্বজনদের সঙ্গে কারও যোগাযোগ নেই। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত ওরা। পায়নি ভাইয়ের আদর, বোনের শাসন। গ্রামের মেঠোপথে দলবেঁধে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি অনেকের। এক কথায় ছোটবেলা থেকেই তারা পরিবার হারা। পরিবারের কাউকে না দেখেই সরকারি শিশু পরিবার, ছোটমণি নিবাস ও বিভিন্ন এতিমখানায় কেটে যায় জীবনের অনেক বছর। এত সব না পাওয়া তাদের জীবনে বাধা হতে পারেনি। গতকাল তারা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে।
গতকাল বেলা ১১টা। রউফাবাদ সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) থেকে অংশ নেওয়া আট শিক্ষার্থী ফলাফলের অপেক্ষায় ছিল। জাতীয়ভাবে ঘোষণার পরই তারা শিক্ষকদের সহযোগিতায় এসএসসির ফল জানতে শুরু করে। প্রথমে খুদেবার্তায় নিজের নামের পাশে ‘পাশড’ শব্দটি দেখতে পেয়ে খুশিতে মেতে ওঠে জান্নাতুল ফেরদৌস। এরপর রেজাল্ট জিপিএ ৪.৫৬ জানতে পেরে চোখে-মুখে আনন্দের বহির্প্রকাশ।
তখনো নিজের ফল সম্পর্কে জানে না উয়ইসিং মার্মা। অল্প কিছুক্ষণ পর তার রেজাল্টও ‘পাশ’ আসে। পায় জিপিএ ৪.৫০। এভাবে একজন একজন করে ফল যাচাইয়ের পর সবারই পাস আসে। ইসফাকুন নেছা সামি ৪.১৭ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়, জান্নাতুল নাইমা পায় ৩.৯৩, বিথী আক্তার ৩.৯৪, অ্যানি আক্তার ৩.৭২, মনীষা মজুমদার ৩.৪৪ আর নিশি তংচঙ্গ্যা জিপিএ ২.৮৯ পেয়ে এসএসসি পাস করেছে। খানিক আগে সবার চেহারায় চিন্তার ছাপ থাকলেও ফল শুনে তারা সবাই মেতে ওঠে বাঁধভাঙা আনন্দে।
সরকারি শিশু পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিথীকে ২০০৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর মাত্র আড়াই বছর বয়সে প্রতিষ্ঠানটিতে আনা হয়। ওই সময় পুলিশ এসে তাকে সেখানে দিয়ে যায়। তার গ্রামের বাড়ি ভোলায়। ছোট থেকেই সে এখানে বেড়ে উঠেছে। তবে পরিবারের সদস্যরা এখন তার খোঁজ নিলেও দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্য নেই। বাবা বহু বছর আগে মাকে ছেড়ে চলে গেছেন।
রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটার জান্নাতুল ফেরদৌসের বয়স তখন ৯ বছর। সেই বয়সে তার মা নিজেই পরিবারের অসহায়ত্ব তুলে ধরে মেয়েকে সরকারি শিশু পরিবারে রেখে যান। এরপর থেকে তার দায়িত্ব নেন সেখানকার শিক্ষকরা। তার স্বপ্ন বড় হয়ে সে সরকারি শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক হবে।
উয়ইসিং মার্মার গল্প একই। বান্দরবানে গ্রামের বাড়ি হলেও সেখানে যাওয়া হয় না। গতকাল বিকেলে কথা হলে বলে, ‘পরিবারের কথা মনে এলে চোখে পানি চলে আসে। সবাই পরীক্ষার সময় মা-বাবার দোয়া নিলেও আমরা নিতে পারি না। কারণ তাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয় না। তখন মনে হয় এ পৃথিবীতে আমার কেউই নেই। কিন্তু শিশু পরিবারের সবাই আমাদের সেই কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। বড় হয়ে সে নার্স হতে চায়।’
সরকারি শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক তাসনিম আখতার বলেন, ‘আজকে আমাদের সবচেয়ে খুশির দিন। কারণ মেয়েদের খুশি দেখতে পাচ্ছি। ওদের ভরণপোষণ, পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছু দেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে ওদের ভালোমন্দ দেখি। অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, এর পরও আমরা বেসরকারি সহযোগিতা নিয়ে হলেও তাদের আলাদা কেয়ার নেওয়ার উদ্যোগ নিই।’
চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক উর্বশী দেওয়ান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও আমাদের আন্তরিকতা দিয়ে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তারা আটজন আজ শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অতিক্রম করল। তাদের জন্য শুভকামনা রইল।