দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের দিন এখন নিকটবর্তী। ৭ জানুয়ারি এ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হবে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটের মাঠে নামার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও সতীর্থরা নির্বাচনী দৌড়ে আছে। অপর দিকে নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো রয়েছে ধারাবাহিক আন্দোলনে। বিএনপি সারা দেশে দলীয় নেতা-কর্মীদের গণগ্রেপ্তার ও কারাদণ্ডের কঠিন সময়ের মধ্যেই বড় ধরনের শোডাউনের পরিকল্পনা করছে।
রাজনীতির এই দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে জনজীবনে প্রভাব পড়ছে। বাসে আগুন, রেললাইন কেটে ফেলাসহ সংঘাত-সংঘর্ষও চলছে বিভিন্ন এলাকায়। নাশকতার ঘটনাও ঘটেছে। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলছিল একদল দুর্বৃত্ত। স্থানীয় লোকজন ধাওয়া দিলে পালিয়ে যায় তারা। এ সময় এলাকাবাসীর প্রচেষ্টায় বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় এ পথে চলাচলকারী চিলাহাটি-খুলনাগামী আন্তনগর ট্রেন ‘সীমান্ত এক্সপ্রেস’। এর আগে রেলস্টেশনের মাঝামাঝি রেলপথের একটি অংশ কেটে রাখে দুর্বৃত্তরা।
সরকারি দল থেকে যেমন নির্বাচন বানচালের দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্তের অভিযোগ তোলা হচ্ছে; তেমনি নির্বাচন বর্জনকারীদের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হচ্ছে নিপীড়ন-নির্যাতন, হামলা-মামলা, জেল-জুলুমের। গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে এমন সহিংস ঘটনায় পুলিশসহ এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েক শ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সামনে ‘ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে’। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বলছে, ‘বিএনপি সন্ত্রাস করলে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব না।’
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় রাজনৈতিক দলই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছে। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন ঠেকাতে বাসে আগুন রেললাইনে নাশকতা সমর্থন করে না যুক্তরাষ্ট্র।’
অবরোধের কারণে ঢাকাসহ সারা দেশে সহিংসতা-নাশকতা দমন করতে পুলিশ পুরস্কার ঘোষণা করেছে। পুলিশের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগকারীদের ব্যাপারে তথ্য দিলে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৮ অক্টোবর থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে এক পুলিশ সদস্যসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। গত ২৮ অক্টোবর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৩৭টি গাড়িতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। পাশাপাশি এ সময় দুর্বৃত্তরা ২৪১টি যানবাহন ভাঙচুর করেছে। পুলিশের আশঙ্কা, নির্বাচনকে ঠেকানোর নামে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আরও বেশি সক্রিয় হবে। এতে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।
১৮ ডিসেম্বর থেকে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নির্বাচনী কাজে বাধা হতে পারে, এমন রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, নির্বাচন কমিশনের এ সিদ্ধান্ত জনবিদ্বেষী, সংবিধানবিরোধী ও নজিরবিহীন। তবে আওয়ামী লীগ বলছে, এ সিদ্ধান্ত যথার্থ।
বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের কথা। এমন পরিস্থিতিতে সামনে কী ঘটবে দেশে এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সামনের দিনগুলো সহিংস হবে, না শান্তিপূর্ণ হবে, তা নিয়ে সংশয় দানা বেঁধে উঠছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেখানে মানুষের আস্থার সুযোগ নিয়ে কেবল ক্ষমতা আর অর্থবিত্তের রাজনীতি চলবে, সেখানে সহিংসতার রাজনীতি চলতেই থাকবে। ভাগের রাজনীতিতে সহিংসতার শঙ্কা থাকে। আদর্শ নীতির ভিত্তিতে রাজনীতি স্বচ্ছ করা না গেলে এই সহিংসতার আশঙ্কা থাকবেই।’
সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি নিশ্চিত করা একান্ত দরকার। তা না হলে আগামী প্রজন্ম এ থেকে শিক্ষা নিয়ে ভুল পথেই পরিচালিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক চরিত্র উদার করতে হবে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এ চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন ত্রুটিবিচ্যুতি ও ভুলের কারণে অপশক্তি ক্ষমতায় চলে আসে। এটা গণতান্ত্রিক দেশে কখনোই কাম্য হতে পারে না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সহিংসতার পথ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থেকে দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।