গত ১৮ ডিসেম্বর পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। প্রবাসী কর্মীর ভূমিকা ও তাদের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘ। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘প্রবাসী কর্মীরা উন্নয়নের অংশীদার, সমুন্নত রাখব তাদের অধিকার’।
প্রবাসী কর্মীরা বহু টাকা খরচ করে পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে কাজের খোঁজে প্রতিবছর বিদেশে যান। অনেকের ভাগ্য বদল হয়, স্বপ্নপূরণ হয় নানা কাঠখড় পুড়িয়ে। এর মধ্যে অনেককে লাশ হয়ে ফিরতে হয় দেশের মাটিতে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক বছরের তথ্য অনুসারে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরে বিদেশ থেকে মোট ৪ হাজার ১৪৩ জন শ্রমিকের লাশ এসেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৪৫ জনের লাশ এসেছে গত মে মাসে। পরিসংখ্যান অনুসারে গত অর্থবছরের আওতায় চলতি বছরের মে মাসে প্রবাসী শ্রমিকদের সর্বোচ্চ লাশ এসেছে বিদেশ থেকে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় লাশগুলো আনা হয়েছে। ওই এক বছরে সব মিলিয়ে এই খাতে সরকার ব্যয় করেছে ১৪ কোটি ৫০ লাখ ৫ হাজার টাকা।
বিদেশে কাজে গিয়ে যারা মারা যান তাদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু হয় অনিরাপদ পথে পাড়ি দিতে গিয়ে। কেউ মারা যান নির্যাতনে, কেউ অমানুষিক পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে, কেউবা বিভিন্ন দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। এদিকে মৃত্যু ছাড়াও বিদেশে কাজের জন্য যাওয়া বৈধ অভিবাসীদের নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে গ্লোবাল কমপ্যাক্ট ফর সেফ, আর্ডালি অ্যান্ড রেগুলার মাইগ্রেশন (জিসিএম) কার্যক্রমের আওতায় উঠে এসেছে প্রবাসী শ্রমিক নিপীড়নের চিত্র।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ ভাষাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। ৪১ শতাংশ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ২৭ শতাংশ অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসুবিধা, ১২ শতাংশ কর্মী খারাপ আশ্রয়স্থল, ১৬ শতাংশ রিক্রুটিং এজেন্সির অসহযোগিতা পেয়ে থাকেন।
সম্প্রতি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিবাসী দিবস উপলক্ষে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এক তথ্যে বলা হয়েছে, যারা বিদেশে গেছেন তাদের অন্তত ২২ শতাংশ উন্নত জীবনের আশা নিয়ে অভিবাসী হয়েছেন। সেমিনারে বিদেশফেরত ১০০ জনের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ৪৫ জন ইউরোপের পথে পাড়ি দিয়ে মাঝ পথ থেকেই ফিরে এসেছেন। ৩০ জন ইউরোপে ঢুকলেও কোনো কাজ করার আগেই ধরা পড়ে দেশে ফিরেছেন। আর বাকি ২৫ জন কিছু সময় কাজ করার পর ধরা পড়ে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।
সেমিনারের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে শুরু করে ২০২১ সাল পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পেরেছেন ৬২ হাজার ৫৮৩ জন। এ ক্ষেত্রে অনেকেই এজেন্ট, মধ্যস্বত্বভোগী (দালাল), মধ্যস্থতাকারী, পেশাদার চোরাচালানকারী এবং অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর মাধ্যমে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। অনেকেই দেশে কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন প্রচেষ্টার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ জানান, ‘বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অনুসারে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী মারা যান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত (ব্রেইন স্ট্রোক) কারণে। তাদের একটা বড় অংশই মধ্যবয়সী কিংবা তরুণ। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা কিংবা প্রতিপক্ষের হাতেও খুন হন বাংলাদেশিরা।’ মধ্যপ্রাচ্যে যারা মারা যান তাদের বেশির ভাগই প্রচণ্ড গরমে প্রতিকূল পরিবেশে টিকতে পারেন না। আরেক দিকে অমানুষিক পরিশ্রম থেকে মানসিক চাপের কারণে সাধারণত স্ট্রোক বা হৃদরোগের মতো ঘটনা ঘটে।
বিএমইটির পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, প্রতিবছরই বাড়ছে বৈদেশিক কর্মসংস্থান। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের জনশক্তির সিংহভাগ রপ্তানি হয়। এই জনশক্তির বেশির ভাগ শ্রমনির্ভর পেশায় নিয়োজিত এবং বেতনও কম। এ জন্য সরকারকে প্রবাসীদের প্রবাসে পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আর্থিক ও অন্যান্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করতে পারলে তারা প্রবাসে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে। তাদের শূন্য হাতে বা কফিনে লাশ হয়ে আসতে হবে না।
প্রবাসী কর্মীদের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। শ্রমিকদের অদক্ষতার দুর্নাম ঘুচিয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অবশ্য সরকারকে বৈধ অভিবাসনের মাধ্যমে নতুন নতুন বাজার খুঁজতে হবে। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ দেশে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। যার মাধ্যমে দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। সে জন্য প্রবাসীদের সুরক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। অবশ্য সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব জনশক্তি রপ্তানিতে পড়ছে।