ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দর উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম। ১৯৯৪ সাল থেকে আখাউড়া স্থল শুল্কস্টেশন দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি চলছে। পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়ায় ২০০৮ সালে স্থল শুল্কস্টেশন থেকে পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে যাত্রা শুরু করে আখাউড়া স্থলবন্দর। দিনে দিনে যাত্রীদের কাছে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পছন্দের পথ হয়ে উঠেছে আখাউড়া স্থলবন্দরটি। যাত্রীদের কাছ থেকে ভ্রমণ কর বাবদ রাজস্ব আহরণও বাড়ছে। তবে রাজস্বের পরিমাণ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা মিলছে না আখাউড়া স্থলবন্দরে।
চিকিৎসা ও ভ্রমণের উদ্দেশে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১০০০ যাত্রী আখাউড়া স্থলবন্দর ব্যবহার করে ভারতে যাতায়াত করেন। বিভিন্ন উৎসবে এ সংখ্যা প্রায় তিন গুণ হয়। পণ্য রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি সরকার যাত্রীদের ভ্রমণ কর বাবদও বিপুল রাজস্ব পায় বন্দরটি থেকে। বর্তমানে প্রতিদিন এক থেকে দেড় কোটি টাকার হিমায়িত মাছ, রড, সিমেন্ট, পাথর, তুলা, প্লাস্টিক, কাঠের ফার্নিচারসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। রপ্তানি করা পণ্য ত্রিপুরা থেকে সরবরাহ করা হয় উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতেও।
আখাউড়া স্থল শুল্কস্টেশন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে পারাপার হয়েছেন ২ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি যাত্রী। এ সময় যাত্রীদের ভ্রমণ কর বাবদ সরকার রাজস্ব পেয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত বন্দর দিয়ে যাত্রী পারাপারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৩ হাজার ৬০০। সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৬ কোটি ১৮ লাখ ৯৩ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত যাত্রীর ভ্রমণ কর ৫০০ টাকা থাকলেও চলতি অর্থবছর থেকে তা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। ভারতীয় যাত্রীদের বাংলাদেশে ভ্রমণের জন্যও এই কর দিতে হয়। তবে বন্দরে কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেন যাত্রীরা।
জরাজীর্ণ কাস্টমস ভবনের ছোট এক কক্ষে কাস্টমসের কাজ শেষ করে যাত্রীদের আরেক ভবনে যেতে হয় ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের জন্য। এরপর সেখান থেকে বিজিবি চৌকি পার হয়ে যেতে হয় ইমিগ্রেশন ভবনে। ইমিগ্রেশন ভবনটিও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে আরও কয়েক বছর আগেই। তবু ঝুঁকি নিয়ে এই ভবনে যাত্রীদের ইমিগ্রেশনের কাজ করা হয়। এ ছাড়া পর্যাপ্ত জায়গা না পেয়ে ভবনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় যাত্রীদের। পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থাও নেই।
আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীরা অভিযোগ করে বলেন, যাত্রীদের জন্য তেমন কোনো সেবা নেই। ট্রলি সুবিধা না থাকায় যাত্রীদের লাগেজ বহনে সমস্যা হয়। এ ছাড়া ইমিগ্রেশন ভবনে যাত্রীদের জন্য সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নেই। এতে করে নারী, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। অথচ আগরতলা স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এবং ব্যাগেজ স্ক্যানিং সুবিধা পান একই ছাদের নিচে। যেখানে যাত্রীদের জন্য আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
আখাউড়া স্থলবন্দর পার হলেই আগরতলা শহর। সেখান থেকে মাত্র ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিলেই আগরতলা বিমানবন্দর। এ ছাড়া রেলস্টেশনও শহরের কাছাকাছি। ফলে আকাশ ও রেলপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশি যাত্রীরা দেশটির পর্যটন শহরগুলোয় যাতায়াত করতে পারেন। এতে খরচও সাশ্রয় হয়। মূলত এসব কারণেই আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে যাত্রী পারাপার বাড়ছে।
দুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে আখাউড়া স্থলবন্দরে আধুনিক ইমিগ্রেশন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০১৬ সালে পুরোনো ইমিগ্রেশন ভবনের পাশে শুরু হয় ভবনের নির্মাণকাজ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন জটিলতায় নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিভিন্ন শর্তে নির্মাণকাজ শুরু হলেও ২০২০ সালের মাঝামাঝিতে আবার তা বন্ধ হয়ে যায়।
আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট পুলিশের পরিদর্শক ইন্সপেক্টর হাসান আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা নিজেরাও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি। তাদের বিভাগ সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন ইমিগ্রেশন ভবনটি হয়ে গেলে যাত্রীরা এক ছাদের নিচেই সব ধরনের সেবা পাবেন।’
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এই বন্দরটি ব্যবসা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সে জন্য সবার আগে দরকার বন্দরটির যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা। সীমান্ত আইন জটিলতায় নির্মাণকাজটি বন্ধ রয়েছে। এ জন্য বিষয়টি দিয়ে দুই দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ের ফলপ্রসূ আলোচনা প্রয়োজন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইমিগ্রেশন ভবনটি নির্মাণ করে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা হোক, সরকারের কাছে সেই প্রত্যাশা।