ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় জনজীবন স্থবির। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে গেছে আবহাওয়ার ধরন। পৌষের শুরুতে তেমন শীত অনুভূত না হলেও বিদায়বেলায় বাড়ছে শীতের প্রকোপ। দেশজুড়ে জেঁকে বসেছে কনকনে শীত। শৈতপ্রবাহের এই হিমেল হাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। শীতবস্ত্রের অভাবে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।
গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলী ও চুয়াডাঙ্গা জেলায়- ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পাবনার ঈশ্বরদী ও দিনাজপুরেও তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
দেশের অধিকাংশ স্থানে ঘন কুয়াশায় সূর্যের দেখা মিলছে না। ফলে দিন ও রাতে প্রায় একই রকম শীত পড়ছে। আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়ার কারণে তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য যদি ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে আসে, তা হলে বেশি শীত পড়ে। দিনের বেলায় সূর্যের আলো না থাকায় রাতের তাপমাত্রা কম ওঠানামা করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উত্তরের হিমেল হাওয়া।
দেশজুড়ে শীতের প্রকোপ দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। ফলে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন। একান্ত কোনো প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। অনেকে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। তবে বেশি ভুগছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের নিয়মিত আয়ে পড়েছে ভাটা। আবার কেউ কেউ স্বল্পমূল্যে শীতবস্ত্র কিনতে পুরোনো পোশাকের দোকানে ভিড় জমাচ্ছেন।
মহসীন নামে এক ইজিবাইকচালক খবরের কাগজকে বলেন, ‘কয়েক দিন থাকি ঠাণ্ডা অনেক বেশি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কুয়াশাত কিছু দেখা যায়ছে না। লাইট জ্বালে জানটা হাতোত নিয়া পাকা রাস্তা দিয়া গাড়ি চালাইছি। বিকাল ৪টার পর ফির ঘন কুয়াশাত শুরু হয়। সন্ধ্যা হইলে লাইট জ্বালেও কিছুই দেখা যায় না।’
অন্যদিকে শীতকালীন রোগ জ্বর, সর্দিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। শয্যা কম থাকায় হাসপাতালে শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। নীলফামারী হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আউয়াল খবরের কাগজকে বলেন, ঠাণ্ডাজনিত রোগ থেকে বাঁচতে সচেতনতার পাশাপাশি ভিটামিন ‘সি’-জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ঠাণ্ডা একদমই লাগানো যাবে না।
ঘন কুয়াশার কারণে সড়কে যান চলাচল, নৌপরিবহন ও বিমান উড্ডয়ন-অবতরণে ব্যাপকভাবে বিঘ্ন ঘটছে। বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার এলাকায় ঘন কুয়াশায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে কুয়াশায় ফেরি ও লঞ্চ চলাচল সকালে এবং রাতে বন্ধ ছিল। অন্যদিকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ঘন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা কম থাকায় সৈয়দপুরগামী তিনটি উড়োজাহাজ ঢাকা থেকে উড্ডয়ন করতে পারেনি।
আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক খবরের কাগজকে জানান, পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে ১৭ বা ১৮ জানুয়ারির দিকে বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির পর তাপমাত্রা আরও কমে যাবে। ২০ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তীব্র শীত থাকবে।
এই মৌসুমে বৃষ্টি হলে ধানের বীজতলা ও আলুখেত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে কৃষকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। প্রচণ্ড শীতে মানুষের আয় কমে গেছে। অন্যদিকে দ্রব্যসামগ্রীর দামও ক্রয়ক্ষমতার ঊর্ধ্বে চলে গেছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছেন বিপদে। শীতবস্ত্রের অভাবে অনেক নদীভাঙা মানুষ বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। তা ছাড়া ছিন্নমূল মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, চলমান শৈত্যপ্রবাহ আরও কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা কমে গিয়ে বৃষ্টি হতে পারে। ফলে শীত বেড়ে আরও কিছুদিন থাকবে।
প্রচণ্ড শীতে নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। এমন হাড়কাঁপানো শীতে তাদের বেঁচে থাকাই কঠিন। শীতবস্ত্রহীন মানুষ নিদারুণ কষ্টে দিন যাপন করছেন। আসুন, আমরা সবাই শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই।