কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বেশ কিছু সংস্থার মধ্যে ৯টি সংস্থার কাজের প্রত্যাশিত অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো নয়। অথচ সরকার দেশের কৃষিব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়ন, গবেষণা ও আধুনিকায়নে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। সরকারের ১৭টি সংস্থা এ কাজে জড়িত। কিন্তু সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, প্রকল্প গ্রহণ, গবেষণা কিংবা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকছে এসব সংস্থা। মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পর্যালোচনা সভায় এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি ওই ৯টি সংস্থা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থও ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারছে না বলে সভায় আলোচনা হয়।
সভায় উপস্থিত কৃষি খাতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা অনেকটা আক্ষেপ করেই বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, কয়েকটি সংস্থার কারণে কৃষিব্যবস্থার যে উন্নতি ঘটেছিল তা খর্ব হচ্ছে। কেনাকাটায় দুর্নীতি ও অনিয়মের ভয়ে কোনো কোনো কর্মকর্তা প্রকল্পের কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এটাও প্রকল্পের একটা বড় সমস্যা, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে মারাত্মক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিছু অসাধু কর্মকর্তা প্রকল্পের কেনাকাটার জন্য মুখিয়ে থাকেন, কীভাবে তারা নিজেদের মতো করে টেন্ডার দিয়ে স্বার্থ হাসিল করতে পারেন। অপরদিকে অনেক কর্মকর্তা সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে কঠোর থাকেন। তারা ন্যূনতম কোনো ছাড় বা অনিয়মকে প্রশ্রয় দেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ফাইল আটকে থাকে। এমনকি কোনো কোনো গবেষণামূলক কার্যক্রমও অনেকে এড়িয়ে যেতে চান বলে কাজের মূল্যায়নের দিক থেকে খারাপ পর্যায়ে থাকে প্রতিষ্ঠান।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত প্রকল্পগুলোর অক্টোবর ২০২৩ পর্যন্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। ওই পর্যালোচনায় মন্ত্রণালয়ের ১৭টি সংস্থার মধ্যে ১৫টির কার্যক্রমকে বিবেচনায় রাখা হয়।
কিছু কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, কেনাকাটার প্রক্রিয়া শুরু করতে না করতেই নানা ধরনের ঝামেলা এসে পড়ে। নানা অনিয়মকে প্রশ্রয় দিতে হয়। শিডিউল তৈরি করে কার্যাদেশ দেওয়া পর্যন্ত মাথা খারাপ হয়ে যায়। এমন কিছু চক্র চেপে ধরে, যা এড়ানো মুশকিল হয়ে পড়ে। তার চেয়ে বরং যত কম কেনাকাটা বা প্রকল্পে হাত দেওয়া যায়, ততই নিরাপদ থাকা যায়। নয়তো একদিকে মানসম্মানের ঝুঁকিতে থাকতে হয় কিংবা চাকরি শেষে অডিট আপত্তির চিন্তায় থাকতে হয়। এ ছাড়া অন্যান্য ভয় তো আছেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি গবেষণার অগ্রগতিই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তা না হলে আমাদের দুর্গতির সীমা থাকত না। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতাম না। তবে যতটুকু পিছিয়ে আছি, সেটা হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠানের কিছু কার্যক্রম শৈথিল্যের কারণে। যদিও বছরের শুরুর দিকে পিছিয়ে থাকলেও শেষে আবার দ্রুত অগ্রগতি হয়। যারা বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক হন, তাদের আগেই বুঝেশুনে দায়িত্ব নেওয়া উচিত। কেনাকাটায় দুর্নীতির ভয় থাকলে তার তো এই দায়িত্ব নেওয়াই ঠিক নয়।
সভা থেকে এডিপিভুক্ত প্রকল্পগুলোর কর্মপরিকল্পনা অনুসারে শতভাগ বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সব সংস্থার প্রধানকে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দরপত্র আহ্বান ও বাস্তবায়নের শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার তাগিদ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রেও অবশ্যই পিপিআর-২০০৮ ও বিদ্যমান বিধিবিধান যথাযথ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি-উপকরণ, ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীতে যাতে ওভারল্যাপ না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে।
কৃষিসচিব ওয়াহিদা আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সব সময় চেষ্টা করি সব প্রতিষ্ঠানকেই তৎপর রাখার। যারা একটু দুর্বল তাদের সবল রাখতে আমরা মনিটরিং করি। সভাগুলোতে নানা পর্যবেক্ষণ তুলে ধরি। কাজের গতি বাড়াতে বলি। আমরা সততা চাই, সবাইকে দুর্নীতিমুক্ত দেখতে চাই। তার মানে এটা নয়, কোনো কর্মকর্তা সততার অজুহাতে কাজ না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করবেন না; অপরিহার্য গবেষণা প্রকল্প থেকে নিজেদের এড়িয়ে রাখবেন। এসব হলে প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে পড়বে।’
দেশের সার্বিক কৃষিব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়নের জন্য এ দেশের মাটি ও আবহাওয়াকে বিবেচনায় রেখে গবেষণা ও আধুনিকায়নে জোর দিতে হবে। প্রকল্প পরিচালকদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে। তার অধীনস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তাদের কাজের জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অপরাধ করলে বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, তা সরকারি কেনাকাটা হোক বা সেবাকাজে হোক। পিছিয়ে থাকা সাতটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। তা হলেই দেশের কৃষিব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়ন আশাব্যঞ্জক হবে।