সরকার সামাজিক সুরক্ষার আওতায় সমাজের অসহায় ও দুস্থদের জন্য মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে সেলাই মেশিন বিতরণ, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ভিজিডি, মহিলা হোস্টেল, কিশোর-কিশোরী ক্লাবসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ও নানা খাতে বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সেই বরাদ্দকৃত টাকা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ উঠে এসেছে খবরের কাগজের প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন কর্মসূচি ও নানা খাতে মোট ৩৬৮ কোটির বেশি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। মোট ১৮৪টি অডিট আপত্তির বিপরীতে জালিয়াতি ও আত্মসাতের মাধ্যমে এই টাকা নয়ছয় করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের এক প্রতিবেদনে এ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, মোট ৩৬৯ কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে একই অধিপ্তরের বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে। এ ক্ষেত্রে মোট ১৯৫টি আপত্তির মধ্যে সম্পূর্ণ ও আংশিক মিলিয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৮টি। অর্থাৎ ৮৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ আপত্তিই নিষ্পত্তির বাইরে আছে। নানা দুর্নীতি ও অনিয়মে মোট ১৯৫টি অডিট আপত্তি দিয়েছে অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগ। এর মধ্যে রাজস্ব খাতে ১০৪টি আপত্তির বিপরীতে টাকার পরিমাণ ২৭১ দশমিক ৭১৯৭ কোটি। অন্যদিকে উন্নয়নের নানা খাতে সর্বমোট আপত্তি ৯১টি, যার বিপরীতে টাকার পরিমাণ ৯৭ দশমিক ৬৬৮৪ কোটি। এর মধ্যে রাজস্ব খাতে সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ছয়টি আপত্তি এবং আংশিকভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে চারটি। আর ১০টি আপত্তির মোট টাকার পরিমাণ ৩৭ লাখ ২৮ হাজার। অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে পাঁচটি আপত্তি এবং আংশিকভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে তিনটি। এই আটটি আপত্তির মোট টাকার পরিমাণ ৯৮ লাখ ৯৩ হাজার।
সে ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ও আংশিক মিলিয়ে মোট নিষ্পত্তি হওয়া টাকার পরিমাণ মাত্র ১ কোটি ৩৬ লাখের কিছু বেশি। অর্থাৎ আপত্তি ওঠা প্রায় ৩৭০ কোটি টাকার মধ্যে ৩৬৮ কোটি টাকার নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। রাজস্ব খাতের ১০৪টি আপত্তির মধ্যে ৯৮টিরই নিষ্পত্তি হয়নি, যার পরিমাণ ২৭১ কোটি টাকারও বেশি। আর উন্নয়ন খাতে ৯১টি আপত্তির মধ্যে ৮৬টি এখনো হয়নি, যার মোট টাকার পরিমাণ ৯৬ কোটির বেশি।
জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা না থাকায় দুর্নীতি এখন সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা। সরকার দুস্থ ও অসহায় মানুষের সহায়তায় এবং নারীর ক্ষমতায়নে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। কিন্তু যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় সেখানে দেখা যায়, দুস্থদের টাকা নিয়েও চলে অনিয়ম-দুর্নীতি। কারণ হিসেবে বলা যায়, দুস্থ নারীদের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই। তাদের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতাও থাকে না। এতে প্রতারিত হন সাধারণ নারীরা। তাদের টাকা অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়।
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, অডিট আপত্তি যেগুলো আছে, সেগুলোর জবাব আমরা তৈরি করেছি। কিছু জবাব পাঠিয়ে দিয়েছি আর কিছু জবাব তৈরি হচ্ছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তাই যে কর্মসূচি যেভাবে চলছিল সেভাবেই চলতে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সামাজিক সুরক্ষার খাতগুলোতে দুর্নীতি ভুক্তভোগীর জীবনকে যেমন কঠিন করে, তেমনি বিচারের দীর্ঘসূত্রতা আরও অনেককে এমন অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া সরকার বা দুদক যখন এসব দুর্নীতির মামলা পরিচালনা করে, তখন অনেক সময় এগুলোর বিচারে দীর্ঘ সময় লাগে। যাদের বিরুদ্ধে এই মামলাগুলো হয়, তারা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে থাকে। ফলে ভুক্তভোগীরা আতঙ্কে থাকেন। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষার মামলাগুলো গুরুত্বপূর্ণ মামলা হিসেবে দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।’
সামাজিক সুরক্ষার খাতগুলো দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। স্ব স্ব বিভাগ তাদের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করলে এ ধরনের দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুক্ত রাখা সম্ভব হবে। যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে সেগুলো যথাযথ তদন্তপূর্বক দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।