করোনার প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ- সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি অনেকটা নাজুক। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডলারসংকট। দেশে ডলারসংকট শুরু হওয়ার পর গত দেড় বছরে ইউএস ডলার বন্ডে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ হারিয়েছে সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার প্রভাবে নিজ দেশে ডলারসংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ধারাবাহিক পতন ডলার বন্ডে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। সময়ে অনিবাসী বাংলাদেশি ও প্রবাসী গ্রাহক ডলার বন্ডে তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে নিয়েছেন। এর বিপরীতে নতুন করে বিনিয়োগ কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। দুটি কারণে ইউএস ডলার বন্ডে গত দেড় বছরে বিনিয়োগ কমেছে। তার একটি হলো, বিশ্বব্যাপী মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ফলে গ্রাহক ব্যয়ের সঙ্গে আয় মেলাতে না পেরে বিনিয়োগ ভেঙে ফেলছেন। অন্যটি হলো বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে ডলারসংকট অব্যাহত থাকা এবং এ থেকে উত্তরণের তেমন কোনো উপায় দৃশ্যমান না হওয়া। এতে গ্রাহক সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। গ্রাহকদের ধারণা, বিনিয়োগকৃত ডলার তিনি আর বৈদেশিক মুদ্রায় ফেরত পাবেন না। ইতোমধ্যে ডলার বন্ডে বিনিয়োগকারীদের অনেককে তাদের পাওনা ডলারে না দিয়ে টাকায় পরিশোধ করায় অসন্তোষ প্রকাশের মতো ঘটনাও ঘটছে।
অনিবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়ার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সরকার ১৯৮৮ সালে প্রথম ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ২০০২ সালে এসে ইউএস ডলার বন্ডের সূচনা করে। মোট দুই ধরনের ডলার বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ পান অনিবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এর একটি ডলার প্রিমিয়াম বন্ড, অন্যটি ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড।
জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২২-এর জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রাহকরা ডলার বন্ডের বিনিয়োগ থেকে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বা সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত গ্রাহকরা তুলে নিয়েছেন ৪ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৩ সময়ে তুলে নিয়েছেন ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। দেড় বছরে মোট তুলে নেওয়া নিট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। ডলারে এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি।
ডলারসংকটে দেশের আমদানি বাণিজ্য সীমিত হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদরা এ ধরনের নিয়ন্ত্রিত আমদানি ব্যয়কে উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। বৈদেশিক ঋণের প্রবাহে গতিশীলতা সৃষ্টির তাগিদও দেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। সরকার অনেক উদ্যোগের মধ্যে ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ ডলার বন্ডে বিনিয়োগের সুদহারও বাড়ায়। সরকার প্রত্যাশা করে, দেশের সংকটময় সময়ে অনিবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা ডলার বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াবেন। ডলার বন্ডে সুদহার বাড়ানোর ফলে বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব আসতে পারে। সারা বিশ্বেই ডলার এখন শক্তিশালী।
ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড স্কিম দুটির রিটার্ন ডলারের পাশাপাশি টাকায় নেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিনিময় হারের বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। আর পাঁচ বছর মেয়াদি ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ডে সুদহার আগের মতোই সাড়ে ১২ শতাংশ রাখা হয়েছে। দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ সার্কুলার পাঠিয়ে সর্বশেষ সুদহারের বিষয়টি গ্রাহককে অবগতির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুটি বন্ডেই বিনিয়োগকৃত অর্থ ডলারে প্রাপ্য। প্রতি ষাণ্মাসিক ভিত্তিতে মুনাফা বিতরণ, বন্ডের বিপরীতে ঋণ গ্রহণের সুবিধাও রয়েছে। নমিনি পরিবর্তন ও বাতিল করা যায়। বন্ড হারিয়ে গেলে, পুড়ে গেলে বা নষ্ট হলে ডুপ্লিকেট বন্ড ইস্যুর সুযোগ রয়েছে। এ বন্ডে বিনিয়োগকৃত অর্থ ও অর্জিত মুনাফা আয়করমুক্ত। এ ছাড়া ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুঝুঁকির সুবিধা রয়েছে। বিনিয়োগকৃত অর্থের জন্য মুনাফা বিনিয়োগকারীর ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় বা ডলারে প্রাপ্তিযোগ্য। গ্রাহকদের সরকারের ওপর আস্থা তৈরি করতে হবে।
এই সংকটকালে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইউএস ডলার বন্ডে বেশি বেশি বিনিয়োগ করতে প্রবাসী ও অনিবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো যেতে পারে। দেশমাতৃকার টানে সংকট উত্তরণে দেশপ্রেমিক নাগরিক নিশ্চয়ই সরকারের এই আহ্বানে সাড়া দেবেন। এ ছাড়া ইউএস ডলার বন্ডে বিনিয়োগ যে লাভজনক, সে সম্পর্কে তাদের অবহিত করতে হবে। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় এ প্রচার ডলার বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াতে সহযোগিতা করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।