যানজটে বিপর্যস্ত রাজধানীবাসীর কাছে ‘ভিআইপি’দের চলাচল বিরক্তি ও ক্ষোভের কারণ। গাড়ি থামিয়ে সাইরেন বা হুইসেল বাজিয়ে চলে যায় ভিআইপিদের গাড়ি। আবার রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে ভিআইপি গাড়ি চলতে দেখে ক্ষোভ ঝাড়েন যানজটে আটকে থাকা অসহায় যাত্রীরা।
দেশে বিদ্যমান আইনে শুধু রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভিভিআইপি। স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি, রাষ্ট্রের শীর্ষ পদ ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা ভিআইপি (গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) মর্যাদার। এর বাইরে অনেকেই আছেন যারা ভিআইপি নন, অথচ রাস্তায় চলাচল করেন ভিআইপির মর্যাদা নিয়ে। আবার কখনো ভিভিআইপি প্রটোকল নিতেও দেখা যায়। তথাকথিত ভিআইপি ছাড়াও তাদের আত্মীয়-পরিজনের গাড়ি সড়কে এক ধরনের মূর্তিমান আতঙ্ক। এসব থামানোর দায়িত্ব যাদের তারাও অনেকটা অসহায়। আবার অনেকে অতি উৎসাহী হয়ে তথাকথিত ভিআইপিদের যাওয়ার পথ করে দেন। রাজধানীর বাইরে জেলা, উপজেলা শহর, বিমানবন্দর, ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল- কোথায় নেই তাদের দাপট!
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া চলাচলের সময় রাস্তার এক পাশ ফাঁকা করে নিরাপত্তা দেওয়ার বিধান আর কারও ক্ষেত্রে নেই। বিদেশি রাষ্ট্রীয় অতিথিদের বেলায় সরকার কেস টু কেস সিদ্ধান্ত নেয়। আর কোনো বাংলাদেশি এই সুবিধা পান না। অন্যরা সাধারণ নিয়মেই চলাচল করবেন। কিন্তু যখন তথাকথিত ভিআইপিরা প্রটোকল নেওয়ার নামে ব্যক্তিগত গাড়ির সাইরেন বাজিয়ে রাস্তার এক পাশ খালি করে চলাচল করেন, তখনই ভোগান্তিটা চরমে পৌঁছে এবং ক্ষুব্ধ হন সাধারণ মানুষ।’
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইভি লাউঞ্জে কে ভিআইপি, কে ভিআইপি নন, তা বোঝা মুশকিল। এ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন নিরাপত্তাকর্মী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। অনেক সময় বিভ্রান্তি ও বিব্রতকর পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় কর্মকর্তারা অনেকের পরিচয় জানতে চান না বা পারেন না। এমনকি পরিচিত মুখ হলেও তারা আসলে ভিআইপি তালিকায় পড়েন কি না, সেটাও নিশ্চিত হতে পারেন না। সব মিলিয়ে চলছে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরের বিমানবন্দরগুলোর ভিআইপি লাউঞ্জের অবস্থাও একই রকম বলে জানান কয়েকজন ভিআইপি যাত্রী।
বিধি অনুযায়ী, দেশের সড়কেই কোনো ভিআইপির জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনা নেই। তাদের জন্য নিরাপত্তা প্রটোকল থাকবে। কিন্তু তাদের চলাচলের জন্য সড়ক বন্ধ বা অন্য কোনো যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। তারা অগ্রাধিকারও পাবেন না। সাইরেন বাজিয়ে রাস্তা ফাঁকা করে কোনো ভিআইপির সড়কে চলাচলের সুযোগ নেই। উল্টো পথে চলা বা অন্য গাড়ি সরিয়ে চলাচলের সুযোগও নেই কোনো ভিআইপির। শুধু রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় সড়কের এক পাশ খালি করে চলাচলের বিধান আছে। ভিভিআইপিদের যাতায়াতের নির্দিষ্ট সড়কটির এক পাশ ফাঁকা করে দেওয়া হয়। সেখানে সাধারণ যান চলাচল বন্ধ করা হয়। তাদের চলাচলের ১৫ মিনিট আগে এ-সম্পর্কিত তথ্য এসএসএফকে জানায় ট্রাফিক বিভাগ। আর এসএসএফও আগেই বিষয়টি ট্রাফিক বিভাগকে জানায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘ভিআইপিরা যখন উল্টো পথে চলাচল করেন, তখন ট্রাফিক পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি চলাচলের ক্ষেত্রে ভিভিআইপি প্রটোকল পাবেন। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ আইন মেনে কাজ করলে ভিআইপির সংখ্যা কমে যাবে। ছোট ভিআইপিদের এড়িয়ে চললেই জনদুর্ভোগ কমে আসবে। আর যদি কোনো ভিআইপি আইন না মানেন, সে ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ভিআইপিদের উপদ্রব থামানো দরকার। যানজটের কারণে সাধারণ মানুষ এমনিতেই পেরেশানিতে আছে। অতিরিক্ত যানবাহন সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। তাদের জন্য বাড়তি চাপ ভিআইপি সামাল দেওয়া। কোনো ভিআইপি আইন না মেনে চললে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং জরিমানা ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নিয়ম না মানলে ট্রাফিক পুলিশ এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে। তারা আইন মেনে কাজ করলে এ ধরনের ভিআইপির সংখ্যা কমে আসবে। সড়কে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।