ভারত মহাসাগরের উপকূল থেকে প্রায় ৪৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে কয়লাবাহী এমভি আবদুল্লাহ নামে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ গত মঙ্গলবার সোমালিয়ান জলদস্যুর কবলে পড়ে। জাহাজটিতে ২৩ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু আছেন। মোজাম্বিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত যাচ্ছিল জাহাজটি। জলদস্যুরা এমভি আবদুল্লাহর গতিপথ পরিবর্তন করে সোমালিয়ার দিকে ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। কয়লাবোঝাই জাহাজটিতে আগুন লাগার শঙ্কা রয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছে। জিম্মিরা সেই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
সোমালিয়ার জলদস্যুরা ছিনতাই করা জাহাজ নিয়েই অন্য জাহাজে অভিযান চালায়। তারা জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই নাবিক ও ক্রুদের জিম্মি করে। জিম্মিদের প্রাণহানির শঙ্কায় তাদের প্রতিরোধ করা বেশির ভাগ সময় সম্ভব হয় না। চাহিদা অনুযায়ী মুক্তিপণ দিয়েই জিম্মি সংকটের সমাধান করতে হয় মালিকপক্ষকে। এ জন্য জাহাজমালিকরা অনেক দিন ধরেই এ পথে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তারা বলছেন, মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) উচিত ভারত মহাসাগর এলাকা অতিক্রমের সময় জাহাজে সশস্ত্র নিরাপত্তা প্রহরী রাখার অনুমতি দেওয়া। কারণ ইডেন উপসাগরে একটি আন্তর্জাতিক ট্রানজিট করিডর আছে। একসঙ্গে পাঁচ থেকে ছয়টি জাহাজ ওই এলাকা পার হয়।
এ সময় আইএমও এবং ন্যাটোর যুদ্ধজাহাজ ও হেলিকপ্টার যৌথভাবে জাহাজগুলোকে পাহারা দেয়। তবে এ নিরাপত্তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় জলদস্যুরা ওই করিডরে পৌঁছানোর ঠিক আগমুহূর্তে জাহাজ ছিনতাই করে। সোমালিয়ার উপকূল থেকে দেড় হাজার নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগরের অর্ধেক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে জলদস্যুরা।
সোমালিয়ান জলদস্যুরা মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দেশের জাহাজ জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর আরব সাগরে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল একই প্রতিষ্ঠানের এমভি জাহানমণি নামে আরেকটি জাহাজ। বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০১১ সালের ১৪ মার্চ জিম্মিদের মুক্তি করা হয়।
১৯৯১ সালে সামরিক শাসন উৎখাতের পর ব্যাপক নৈরাজ্যের মধ্যে পড়ে সোমালিয়া। তারপর প্রায় দুই দশকের বেশি সময় যুদ্ধবিগ্রহে বিধ্বস্ত সোমলিয়ায় কার্যকর কোনো সরকার ছিল না। এই সময়টায় আফ্রিকার মধ্যে দীর্ঘতম উপকূলসমৃদ্ধ সোমালিয়ার জলসীমায় নিরাপত্তার কোনো কোস্টগার্ড বা বাহিনী ছিল না। এতে এই উপকূল অঞ্চলে বিদেশের মাছ ধরা নৌযানের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। সে কারণে স্থানীয় জেলেরা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ফলে সোমালিয়ানরা দস্যুবৃত্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাদের কাছে মৎস্য শিকারের চেয়ে দস্যুতার আয়ের পরিমাণও কয়েক গুণ বেশি হয়ে থাকে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত তিন মাসে সোমালিয়া উপকূলে অন্তত ১৪টি জাহাজ জিম্মি করা হয়েছে। এর মধ্যে ইরানের পতাকাবাহী মাছ ধরার নৌকা এবং লাইবেরিয়ান পতাকাবাহী সেন্ট্রাল পার্ক নামে জাহাজ ছিল। এমভি রুয়েন নামে মাল্টার পতাকাবাহী একটি জাহাজও আটক করেছে সোমালিয়ানরা।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে, ২০০৫ থেকে ২০১২ পর্যন্ত সোমালিয়ান জলদস্যুরা ক্রুদের জিম্মি করে সোয়া ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ আদায় করেছে। নাইজেরিয়ার ফেডারেল ইউনিভার্সিটির লেকচারার স্যামুয়েল ওয়েওল বলেন, ছিনতাইয়ের পেছনে মূল লক্ষ্য মুক্তিপণ আদায় বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান জাহাজ জিম্মির ঘটনাগুলোর নেপথ্যে এটাই মূল কারণ। লোহিত সাগরে হুতিদের নিয়ে আন্তর্জাতিক বাহিনীগুলো বেশি ব্যস্ত থাকার সুযোগে ভারত মহাসাগরের গালফ অব এডেনে তারা আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, জলদস্যুদের কবল থেকে জাহাজ উদ্ধার করা খুবই কঠিন ব্যাপার। অনেক উন্নত দেশের জাহাজও ছিনতাই হয়। এ বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্স আছে। টাস্কফোর্সে নানা দেশ আছে। চীন, ভারতও আছে। তাদের সাহায্য চাওয়া যেতে পারে।
রাষ্ট্রীয় বা সরকারি উদ্যোগের চেয়ে বেশি সক্রিয় ও বেশি উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হয় মালিকপক্ষের দিক থেকে। কারণ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের অনুমতির সময়ে মালিকদের অনেক শর্ত দেওয়া হয়। যেখানে নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয় থাকে। আন্তর্জাতিক কিছু প্রটোকল আছে, সংস্থা রয়েছে যারা নানা প্রক্রিয়া অবলম্বন করে জলদস্যুদের সঙ্গে জাহাজের মালিকপক্ষের সংযোগ ঘটিয়ে দেয়। তাই জিম্মি উদ্ধারে আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্সের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি। জিম্মি উদ্ধারে আন্তর্জাতিক নীতি অনুসরণ করতে হবে। সারা বিশ্বের জলদস্যুকে দমন করতে জাতিসংঘকে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের হাতে জিম্মিদের সুস্থ ও নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকেই।