সম্প্রতি কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষক ও সহপাঠীকে অভিযুক্ত করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায় প্রশাসনকে লাল কার্ড দেখিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। যৌন হয়রানি, ক্যাম্পাসে ধর্ষণ, নিয়োগ-বাণিজ্য, গবেষণা প্রবন্ধ চুরি, উপাচার্য-শিক্ষক দ্বন্দ্বে একাডেমিক কার্যক্রম বিঘ্নসহ নানা বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর মধ্যে গত সোমবার জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে আবেদন করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম ও টেলিভিশন বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী ফারজানা মীম। বিভাগের শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করায় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত তিনি। গত তিন মাসে খবরের কাগজের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের শীর্ষ ১২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত এসব ঘটনা আলোচনায় এসেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসব ইস্যুতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
মানবিক গুণাবলি মানুষের মধ্যে কমে গেছে। আমরা সাংস্কৃতিক দিক থেকে অত্যন্ত নিম্নগামী অর্থাৎ নিচে নেমে গেছি। সে কারণে এসব ঘটনা বাড়ছে। সমাজেও চলছে একধরনের অস্থিরতা। রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা। সামাজিক পরিবর্তনের কারণে নানাভাবে মানুষ সমস্যায় আছে। সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুকসহ অনেক বিষয় যুক্ত হয়েছে। পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সামাজিক বন্ধনগুলোও একরকম আলগা হয়ে গেছে। মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্তির জন্য প্রস্তুতি তেমনটা নেই। যেকোনো ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ইদানীং গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে না। অনেক সময় ট্রল করা হচ্ছে। একসময় মানুষ যখন হতাশায় ভুগতে থাকে, তখন আত্মহননের পথ বেছে নেয়। ধর্মীয়ভাবেও বলা হয়েছে, আত্মহত্যা মহাপাপ, এটা নিয়েও অনুভূতি হালকা হয়ে গেছে। একটা ঘটনা ঘটলে সেটাকে হালকাভাবে দেখা হয়। আবার অনেক সময় ভিকটিমের দিকেই নেতিবাচক আঙুল তোলা হয়। একজন মানুষ বিপদে পড়লে তিনি কাউকে পাশে পান না। নারীদের বেলায় এটি বেশি ঘটে। অনেকেই প্রতিবাদ করার ভাষা হারিয়ে ফেলে সমাজের ভয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার একটা প্রবণতাও রয়েছে। সমাজে জবাবদিহির জায়গাগুলো ফিকে হয়ে গেছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসক হিসেবে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তাদের যোগ্যতা নিয়ে কথা আছে। যিনি প্রশাসক হবেন, তার মধ্যে সংবেদনশীলতা থাকতে হবে। সততা থাকতে হবে। অনেক সময় বিপরীত পক্ষ গুজব ছড়ায়, বুলিং করে। এখানে পলিটিক্স একটা বড় কারণ। যখন কোনো একটি ঘটনা ঘটে, তখন সেটিকে নির্মোহভাবে তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলে এ ধরনের ঘটনা কমে আসবে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রক্টরিয়াল বডি কিংবা যৌন হয়রানি সেল থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কেন চলছে বা থামছে না, তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি করতে হবে। ছাত্রছাত্রীরা যে অভিযোগগুলো এই সেলের কাছে দিয়ে থাকে, সেগুলোর নিষ্পত্তি কতটুকু এই বডি করতে পারছে তাও দেখা দরকার। ইউজিসিকেও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। দোষীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এ ধরনের সমস্যা সংক্রামক আকার ধারণ করবে। শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা রাখতে হবে। কাউন্সিলর নিয়োগ দিতে হবে। সর্বোপরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সততা ও নৈতিকতার আদর্শ ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত জায়গা হয়ে উঠুক, সেটিই প্রত্যাশা।