শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় ৫ জুলাই। এ আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয় ১৫ জুলাই। কোটা আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দুষ্কৃতকারীরা সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। এরপর থেকে সারা দেশে শুরু হয় বীভৎস নাশকতা। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে চলে নারকীয় বলির তাণ্ডব। ডিবির সূত্রমতে, সেদিন ছিল ১৯ জুলাই। রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টায় এক মোটরসাইকেল আরোহীকে তাড়া করে দুর্বৃত্তরা। তাড়া খেয়ে ওই মোটরসাইকেল আরোহী রাস্তার পাশে পড়ে যান।
এ সময় দুর্বৃত্তরা ওই ব্যক্তির ব্যাগ তল্লাশি করে পুলিশের পোশাক ও আইডি কার্ড দেখতে পায়। এ সময় তারা পুলিশ পুলিশ বলে চিৎকার শুরু করে। চিৎকারে আশপাশের আরও কিছু দুর্বৃত্ত ছুটে এসে তাদের হাতে থাকা হকিস্টিক, বাঁশ, লাঠি দিয়ে তাকে মারতে থাকে। ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। তারা লাশ নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে। মোটরসাইকেলটিও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর তার লাশ শনির আখড়া ওভারব্রিজে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আওয়ামী লীগের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গাড়িবহর নিয়ে রওনা দেন জাহাঙ্গীর আলম। গাড়িবহর উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকা পার হওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা গতিরোধ করে। একপর্যায়ে তারা হামলা চালায়। এ সময়ে আন্দোলনকারীদের ইটপাটকেলের আঘাতে জাহাঙ্গীর আলমের মাথা ফেটে যায়। তার মাথায় ১৭টি সেলাই দিতে হয়। অনেকেই আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন। জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত সহকারী জুয়েল মোল্লা গুরুতর আহত হন। তাকে সেখান থেকে উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে আবারও তার ওপর হামলা হয়। একপর্যায়ে তাকে গাছে ঝুলিয়েও পেটানো হয়।
সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হলে লাশ ঝুলিয়ে রেখেই হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত সহকারীকে উত্তরায় হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখার এ ঘটনায় নাশকতার নির্মম পৈশাচিক চিত্র ফুটে উঠেছে। হত্যা কখনো সভ্য সমাজের জন্য কাম্য হতে পারে না। কাউকে হত্যার পর ঝুলিয়ে রাখার ঘটনা মানবতার মর্মস্পর্শী আর্তনাদকেই তাড়িত করে।
দুর্বৃত্তরা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবন, সেতু ভবন ও ভবনের অর্ধশতাধিক দামি গাড়ি, পুষ্টি ইনস্টিটিউট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ফার্মগেটে মেট্রো রেলস্টেশন ও ডিপো, শনির আখড়ায় মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজা, বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, ধানমন্ডি পিবিআই অফিস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, মহাখালীতে বিটিআরসির ডেটাবেজ সেন্টারে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও আগুন দেয়। এতে করে রাষ্ট্রের জনগুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তছনছ হয়ে যায়।
রাজধানীর বাইরেও দুর্বৃত্তরা চালিয়েছে নারকীয় তাণ্ডব। নরসিংদী কারাগারে হামলা করে ভয়ংকর জঙ্গি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের ছিনিয়ে নিয়েছে। বরিশালে র্যাবের কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। গাড়ির ভেতরে থাকা এক র্যাব সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস, পিবিআই অফিস, জেলা হাসপাতাল ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে হামলা, নারায়ণগঞ্জে একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি পুড়িয়েছে। রেললাইন উপড়ে ফেলা, পুলিশ বক্স ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে প্রায় ৩০০ কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাচ্চাকেও গুলি খেয়ে মরতে হয়েছে। অনেকেই রাস্তায় বের হয়ে গুলিতে মরেছেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী দেশবিরোধী ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারেন না। পুলিশ ও সাধারণ মানুষ কোনো হত্যায় অংশ নিতে পারে না। আমরা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সমর্থন করি না। প্রতিটি হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে ভিক্ষুক জাতিতে পরিণত করার ষড়যন্ত্র থেকেই এ তাণ্ডব।
নাশকতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। আর কোনো রাষ্ট্রীয় স্থাপনা এবং জনসাধারণের জানমালের কোনো রকম ক্ষতি না হয়, সেদিকটা সবার আগে দেখতে হবে। ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে চলছে ‘ব্লক রেড’ অভিযান। এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নির্বিচারে জেলে ভরায় সংকট বাড়তে পারে।
নাশকতা সৃষ্টিকারী, সহিংসতার মদদদাতা, সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের পূর্বে খোঁজখবর নিতে হবে। নিরপরাধ সাধারণ মানুষ যাতে গ্রেপ্তার না হয়; সেদিকটা অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে। নাশকতা সৃষ্টিকারী ও সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকটা খেয়াল রাখতে হবে। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সরকার সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সেটিই প্রত্যাশা।