অভাবের তাড়নায় প্রায় ২৮ বছর আগে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মামা মরু মিয়ার মুদি দোকানে কাজ নেন জাহিদুল ইসলাম। বাবার জায়গাজমি না থাকায় সরকারি জমিতে ঘর উঠিয়ে বসবাস করতেন। দোকানে কাজ করার সময় ধীরে ধীরে রাজনীতিতে ঢোকেন উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরেনো জাহিদ। প্রথমে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরে জাতীয় পার্টিতে বেশ সক্রিয় হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাহিদ মালেক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তার হাত ধরেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ঢোকেন তিনি। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মুদি দোকানি জাহিদকে।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের আস্থা অর্জন করায় অনেককে পেছনে ফেলে খুব সহজেই বাগিয়ে নেন মানিকগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতির পদ। এর পরই পরিবহন খাত থেকে শুরু হয় তার একচ্ছত্র চাঁদাবাজি। নিয়ন্ত্রণ নেন পুরো জেলার পরিবহন খাতের। জাহিদ তার আত্মীয়স্বজন, ভাই ও ভাতিজা দিয়ে তৈরি করেন চাঁদাবাজির একটি সিন্ডিকেট। আর তারা প্রতি মাসে বিভিন্ন পরিবহন থেকে আদায় করতেন কোটি কোটি টাকার চাঁদা। আদায় হওয়া চাঁদার বড় একটি অংশের ভাগ দিতেন এমপি জাহিদ মালেককে। সেই টাকার ভাগ পেতেন জেলা ও উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতারাও। ২০২২ সালে গোয়েন্দা সংস্থা জাহিদুল ইসলাম জাহিদের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একটি তদন্ত রিপোর্ট দেয়। এর পরও অদৃশ্য শক্তিতে বন্ধ হয়নি তার চাঁদাবাজি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করে শতকোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া জাহিদের রয়েছে দুটি বহুতল বাড়ি। সদর উপজেলার জয়রা গ্রামে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তিনতলাবিশিষ্ট বাড়ির সৌন্দর্য হার মানাবে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বাড়িকেও। অন্যদিকে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রয়েছে তিনতলাবিশিষ্ট একটি বাণিজ্যিক ভবন। যার নাম দিয়েছেন ‘জাহিদ টাওয়ার’। সেই টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় ছিল তার ব্যক্তিগত অফিস। সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতেন চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি। এ ছাড়া ঢাকার সাভারেও কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ১২ শতাংশের একটি প্লট রয়েছে বলে জানা গেছে। চলাচলের জন্য জাহিদ ব্যবহার করতেন টয়োটা এক্সিও মডেলের গাড়ি। এ ছাড়া শুভযাত্রা পরিবহনে তার দুটি বাস রয়েছে বলে জানা গেছে।
জয়রা এলাকার বাসিন্দা মজিবর জানান, ‘জাহিদের বাবা খুব গরিব হওয়ায় ওরা দুই ভাই তার মামার দোকানে কাজ নেয়। অনেক কষ্ট করে দিন পার করতে দেখেছি। আওয়ামী লীগের আমলে মনে হয় আলাদিনের চেরাগ পেয়েছে। কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে তা তার চলাফেরা দেখলেই বোঝা যায়। এলাকায় দৃষ্টিনন্দন বাড়ি করেছে। আছে দামি গাড়িও। তবে সরকার পতনের পর থেকে পলাতক আছে।’
শরিফুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তি জানান, ‘জাহিদুল ইসলাম জাহিদ তার আপন ভাই মাহিদুল ইসলাম মাহিদ, জসিম, ভাতিজা জকি, জাহিদের চাচা টিটু হাজি, আব্দুল হালিম, জাহিদের চাচাতো ভাই সবুজ, আকতারদের দিয়ে তৈরি করেন চাঁদাবাজির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। চাঁদাবাজির সঙ্গে টেন্ডারবাজি, স্থানীয় এলাকায় জমি দখলসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেরও নেতৃত্ব দিতেন তিনি। চাঁদাবাজির রিপোর্ট করায় কয়েকজন সাংবাদিককে বিভিন্নভাবে হয়রানিও করেছেন এই জাহিদ।’
রফিক নামের স্থানীয় একজন বলেন, ‘প্রচুর নির্যাতন করত এই জাহিদের লোকজন। টাকা ছাড়া ঢাকা-আরিচা রুটে গাড়ি চালাতে পারতাম না। শত শত পরিবহন থেকে মালিক সমিতির নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখিনি প্রশাসনকে। শুনেছি, চাঁদাবাজির একটি অংশ এই অপকর্ম ম্যানেজ করার কাজে ব্যবহার করত জাহিদ।’
রমজান নামের একজন অটোচালক বলেন, ‘জাহিদ ও তার ভাই মাহিদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ ছিলাম। জাহিদ বাস, মিনিবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্রাক, মাইক্রোবাস থেকে চাঁদাবাজি করত। আর তার ভাই জয়রা রুটে চলাচলকারী সব সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন চাঁদা ওঠাত। টাকা না দিলে মারধরও করতে দেখেছি।’
বাসচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘পাটুরিয়া ঘাট থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত প্রতিদিন হাজার টাকার বেশি চাঁদা গুনতে হতো। তবে সরকার পতনের পর থেকে কোনো চাঁদা দিতে হচ্ছে না। এখন আমরা ভালো আছি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ যেন চালকদের জিম্মি করে চাঁদা আদায় করতে না পারে সেই দাবি আমাদের।’
সরকার পতনের পর জাহিদুল ইসলাম জাহিদ পলাতক রয়েছেন। জয়রা এলাকার বাড়িতে তার মায়ের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে আমার দুই ছেলে জাহিদ ও মাহিদ তার মামার মুদি দোকানে কাজ নেয়। পরে জাহিদ রাজনীতির পাশাপাশি ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করে। অনেক কষ্ট করে টাকা-পয়সা কামিয়ে আমার ছেলে একটা বাড়ি করেছে। ঠিকাদারি করেই এগুলো করেছে। ছেলে কোথায় আছে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘৪ তারিখের পর জাহিদ বাড়ি থেকে চলে গেছে। কোথায় গেছে তা বলে যায়নি।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, ‘জাহিদুল ইসলাম জাহিদের চাঁদাবাজি সম্পর্কে সবাই অবগত ছিল। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করা হতো। তার অনিয়ম বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখেছি। স্থানীয়ভাবে মানুষকে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। এ ব্যাপারে সঠিক বিচারের দাবি জানাই।’
১১ আগস্ট (রবিবার) জাহিদ টাউয়ার থেকে চাঁদাবাজি ও অবৈধ টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারার নথি ও ফাইলপত্রসহ বস্তায় ভরে সরিয়ে ফেলার সময় জাহিদের ভাগনে পরিচয়দানকারী মামুন মিয়া নামে এক যুবককে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। পরে সেই নথিপত্রসহ তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে জাহিদ ও তার লোকজন না থাকায় বর্তমানে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে। এতে যানবাহন চালকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে।