ঢাকা ২২ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
ফরিদপুরে পৌর রাজস্ব সংগ্রহে পৌরসভার সঙ্গে ইউসিবির চুক্তি শেষ বিশ্বকাপের ঘোষণা রোনালদোর! দক্ষিণ ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল, ঘরবাড়ি ছেড়েছেন হাজারো মানুষ সৃষ্টিকর্মে চিরকাল বেঁচে থাকবেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক জন-আকাঙ্ক্ষার বাইরে ক্ষমতায় থাকা যায় না উখিয়ায় টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি ৫০ হাজার মানুষ প্রথম দৃষ্টিতেই ফুটে উঠুক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ব্যালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতে ফিফাকে তীব্র সমালোচনায় সেপ ব্লাটার এনআইডি-সংক্রান্ত জরুরি সেবা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেছে ইসি এক মাসে ১০০ ধর্ষণ, শিশুর জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্র! সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত সামাজিক অবক্ষয় সমাজ ও রাষ্ট্রের নীরবতা সোনারগাঁয় ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির উদ্বোধন ফিফার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ উয়েফা টপ টেনে নেই ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির হালান্ড মাশরাফি-রুবেলকে ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড নাহিদ রানার গৌরীপুরে ১০ দিনে ৩ খুন: জনমনে আতঙ্ক অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি চলছে: ইসি মাছউদ King Lear and Three Daughters বিষয়ক Story Writing নিয়ে আলোচনা, ৯ম পর্ব, এইচএসসির ইংরেজি ১ম পত্র চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঝুঁকি, বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ চলমান সংকট রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে বিশ্ববাজারে কমেছে স্বর্ণের দাম রাবিতে ১০ লাখ টাকা বৃত্তি দেওয়ার আশ্বাস ভূমিমন্ত্রীর হোটেল আমারি ঢাকায় শুরু হলো ইন্টারন্যাশনাল লাঞ্চ বুফে নোয়াখালীতে শিশু ধর্ষণ-হত্যা মামলায় আসামির মৃত্যুদণ্ড জার্সির পেছনে কার নাম লিখে খেলছেন হালান্ড? বাংলা কিউআর প্রচারে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের র‌্যালি শেরপুরে শাশুড়ির ভরসায় পরীক্ষা দিলেন পুত্রবধূ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজের সুযোগ স্ত্রীকে হত্যা করে থানায় জিডি করতে গেলেন স্বামী, তারপর...

শুধু জরিমানা নয়, সাজাও দিতে হবে

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২৮ পিএম
শুধু জরিমানা নয়, সাজাও দিতে হবে
মনজিল মোরসেদ

পরিবেশ রক্ষায় সরাসরি মামলা করতে আইনের পরিবর্তন করা প্রয়োজন। শুধু মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করে কিংবা জরিমানার ভয় দেখিয়ে পরিবেশ রক্ষার মূল উদ্দেশ্য সফল হবে না। সাজা দিতেই হবে। মামলার মাধ্যমে সাজা না হলে পরিবেশ দূষণ রোধ করা অসম্ভর। যেসব পরিবেশ আদালত আছে, সেখানে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। কাজের কাজ কিছুই হয় না। এ জন্য আইন পরিবর্তন করতে হবে। পরিবেশ আদালতগুলোকে হাইকোর্টের অধীনে আনতে হবে। যেমনটা আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে আছে। পরিবেশ রক্ষায় মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ও দায়িত্বরতদেরও সদিচ্ছা প্রয়োজন। এ ছাড়া, যেসব ব্যবসায়ী পরিবেশ দূষণ করছেন, তাদেরও বোধোদয় হতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সিনিয়র আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট ও প্রেসিডেন্ট, এইচআরপিবি

এক মাসে ১০০ ধর্ষণ, শিশুর জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্র!

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:২২ পিএম
এক মাসে ১০০ ধর্ষণ, শিশুর জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্র!
দীপু মাহমুদ

এটা শুধু এক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১০০টি প্রশ্নচিহ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে একই জিজ্ঞাসা–উন্নয়নের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কি সত্যিই আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি আমরা এখনো অগ্রগতির সংখ্যার আড়ালে গভীর সামাজিক ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখছি?...

জুন মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ১০০ জন নারী ও কিশোরী। তাদের মধ্যে ৭২ জনই শিশু। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৪ জন, যাদের মধ্যে ১২ জন শিশু। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৩৪ জনের ওপর, যাদের মধ্যে ৩১ জনই শিশু। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১১ জন, উত্ত্যক্তের শিকার ২৯ জন এবং সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন তিনজন। একই মাসে হত্যা করা হয়েছে ৫৪ জন নারীকে, রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ৩৩ জন। ধর্ষণের পর সাত শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

এই পরিসংখ্যান কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ফল নয়, এটি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসা মাত্র এক মাসের ঘটনাপঞ্জি। ২ জুলাই প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, এগুলো সেই ঘটনাগুলো, যেগুলো কোনোভাবে সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছেছে। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, স্থানীয় প্রভাব কিংবা বিচারহীনতার আশঙ্কায় যে বিপুলসংখ্যক ঘটনা থানার জিডি কিংবা আদালতের নথিতেও পৌঁছায় না, সেগুলো এই হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে।

অপরাধতত্ত্বে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে, ‘ডার্ক ফিগার অব ক্রাইম’। অর্থাৎ, সংঘটিত হলেও যেসব অপরাধ কখনোই রাষ্ট্রের নথিতে প্রবেশ করে না, সেগুলোই অপরাধের অদৃশ্য অংশ। যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে এই অদৃশ্য অংশ সাধারণত দৃশ্যমান অংশের চেয়েও বড় হয়ে থাকে। ফলে জুন মাসের ১০০ ধর্ষণের ঘটনা কেবল সংখ্যা নয়, বরং গভীরতর বাস্তবতার দৃশ্যমান প্রান্তভাগ মাত্র।

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো–ধর্ষণের শিকার অধিকাংশই শিশু। ধর্ষণের শিকার ১০০ জনের মধ্যে ৭২ জনই শিশু। ধর্ষণের চেষ্টার শিকারদের মধ্যেও প্রায় সবাই শিশু। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকারদের অর্ধেকও শিশু। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সমাজে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে সেই জনগোষ্ঠী, যাদের নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষমতাই সবচেয়ে কম।

যেকোনো সমাজের নৈতিকতা পরিমাপের সবচেয়ে নির্ভুল উপায় হচ্ছে তার শিশুদের নিরাপত্তার মানদণ্ড। সেই বিচারে এই পরিসংখ্যান কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্র নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক সংকটেরও দলিল।

ধর্ষণকে অনেক সময় ভুলভাবে কেবল যৌন অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। অথচ সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্বের গবেষণা বলছে, ধর্ষণ মূলত ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্যের অপরাধ। এটি নারীর শরীরের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতা হলেও এর লক্ষ্য প্রায়ই নারীকে ভয় দেখানো, নিয়ন্ত্রণ করা এবং সামাজিকভাবে অধস্তন অবস্থানে রাখার প্রচেষ্টা। সে কারণেই যুদ্ধ, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা দুর্বল আইনশৃঙ্খলার সময়ে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

সমকালের প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক চরিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। জুন মাসে বিভিন্ন ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৪ জন নারী ও কিশোরী। রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ৩৩ জন। আত্মহত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, পারিবারিক সহিংসতা, গৃহকর্মী নির্যাতন, অপহরণ, পাচার, শারীরিক নির্যাতন–সব মিলিয়ে এক মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৩৩ জন নারী ও কিশোরী। অর্থাৎ, সমস্যাটি কেবল ধর্ষণের নয়, সমস্যাটি নারীর প্রতি সামগ্রিক সামাজিক সহিংসতার।

বাংলাদেশের উন্নয়ন-আখ্যানের সঙ্গে এই বাস্তবতার গভীর বৈপরীত্য আছে। গত দুই দশকে নারীর শিক্ষার হার বেড়েছে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বেও নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সূচকের বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু উন্নয়নের এই পরিসংখ্যান তখনই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়ে, যখন দেখা যায় মেয়েশিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে নিরাপদ নয়, নারী কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে নিরাপদ নন, এমনকি অনেক সময় নিজের ঘরেও নিরাপদ নন।

আইন আছে, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আছে, কঠোর শাস্তির বিধানও আছে। অপরাধতত্ত্বের মৌলিক সত্য হলো, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা অপরাধ দমনে বেশি কার্যকর। একজন সম্ভাব্য অপরাধী মৃত্যুদণ্ডের ভয় যতটা না পায়, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় দ্রুত ও নিশ্চিত বিচারের সম্ভাবনাকে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তদন্তের ধীরগতি, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা প্রায়ই এই নিশ্চয়তাকে দুর্বল করে দেয়।

এখানে আরেকটি সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের সমাজ এখনো অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে অভ্যস্ত। অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা, সময় কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই মানসিকতা শুধু ভুক্তভোগীর প্রতি অন্যায় নয়, এটা অপরাধীর জন্য সামাজিক আশ্রয়ও তৈরি করে। যে সমাজ ভুক্তভোগীকে নীরব থাকতে শেখায়, সে সমাজ অনিচ্ছাকৃতভাবেই অপরাধীকে সাহস জোগায়।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পঞ্চম লক্ষ্য হলো নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতার অবসান এবং লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই লক্ষ্য কেবল আইনের বইয়ে নতুন ধারা যুক্ত করে অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত ও ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা, আধুনিক ও দক্ষ তদন্ত কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মতির শিক্ষা এবং সর্বোপরি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা অবকাঠামোগত সাফল্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক আরও সহজ প্রশ্ন–শিশু কি নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে? নারী কি নিরাপদে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফিরতে পারেন? কিশোরী কি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের বদলে স্বপ্ন দেখতে পারে?

যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অনিশ্চিত থাকে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, রাষ্ট্রের নৈতিক হিসাবের খাতায় বড় ঘাটতি থেকেই যাবে।

জুন মাসের ১০০ ধর্ষণের ঘটনা তাই কেবল এক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১০০টি প্রশ্নচিহ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে একই জিজ্ঞাসা–উন্নয়নের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কি সত্যিই আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি আমরা এখনো অগ্রগতির সংখ্যার আড়ালে গভীর সামাজিক ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখছি?

লেখক: কথাসাহিত্যিক

চলমান সংকট রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
চলমান সংকট রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে
আবুল কাসেম ফজলুল হক

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ লেখক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণে খবরের কাগজ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। তিনি খবরের কাগজ- নিয়মিত লিখতেন। ২০২৪ সালের আগস্ট খবরের কাগজ- প্রকাশিত তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কলাম পাঠকদের জন্য পুনর্মুদ্রণ করা হলো। -বিভাগীয় সম্পাদক

দেশে সরকার পতনের আন্দোলন চলছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি দিয়ে কতদিন দেশ শাসন করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান করতে হলে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। রাজনৈতিক দলকে নিজেদের দলীয় অবস্থান থেকে রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।...

বাংলাদেশের রাজনীতি খুবই দুর্বল ও নিম্নমানের হয়ে পড়েছে। সরকার যে রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে পরিচালিত হয়, সেই শক্তি মাঝে মাঝে ব্যবহার করার মতো অবস্থায় সরকার থাকে না। রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত। যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ও হলের ছাত্ররা সেই দলের রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে রাজনৈতিক দলের প্রভাব থাকা উচিত নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের প্রভাবের কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলের প্রভাবে শিক্ষক ও ছাত্রদের দুরূহ অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যাচ্ছেন। যখন দেশে কোনো ক্রান্তিকাল আসে, তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনামলে এমন ঘটনা দেখা যায়নি। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে এবারই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এত মানুষ মারা গেল, যা কখনো কেউ চিন্তা করেনি। সরকারের বোঝা উচিত ছিল ছাত্র আন্দোলন বড় আকার ধারণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতাই বলা যায়।

এখন দেশের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এটা জাতীয় জীবনে বড় দুর্যোগের লক্ষণ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকার কেন সমঝোতা করতে পারল না? কোটা সংস্কার আন্দোলন সমাধানযোগ্য ছিল। সরকার কেন ছাত্রদের ওপর বাহিনী নামিয়ে দিল এবং দেশে কারফিউ জারি করল? সরকার ছাত্রদের এভাবে শান্ত করতে পারে না। সেনাবাহিনী ও পুলিশ দিয়ে ছাত্রদের কেন শান্ত করতে গেল। রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান করা দরকার ছিল। বাহিনী দিয়ে কতদিন দেশ শান্ত রাখা যায়? সরকারকে রাজনৈতিকভাবেই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।

বর্তমান সরকারি দল বেশ বড় এবং শক্তিশালী। তা ছাড়া বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শক্তি একদমই ভেঙে পড়েছে। বিএনপি দেখতে অনেক বড় দল মনে হলেও আসলে তেমন শক্তিশালী নয়। তারা ইতোপূর্বে সরকার হটানোর জন্য অনেক আন্দোলন করেছে। কিন্তু তাতে কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। কাজেই জাতীয় রাজনীতির নিম্নগামিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ আছে, তাদের মধ্যেও অনেক সমস্যা রয়ে গেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে যে জাতীয় সমস্যার রূপ নিয়েছে তার সমাধান করা জরুরি। এভাবে বিক্ষিপ্তভাবে দেশ চলতে পারে না। যারা দেশের বুদ্ধিজীবী আছেন, তারাও সরকারকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারছেন না। আন্দোলনকে ঘিরে যখন দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলল, তখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন যে, বিএনপি ও জামায়াত এসব কাজ করেছে। গণমাধ্যমে যা উঠে এসেছে, তাতে মনে হলো অন্য কোনো রহস্য আছে। এর ভেতরে দেশদ্রোহের ব্যাপার আছে, যারা এসব কাজ করে যাচ্ছে।

বর্তমান যে সংকট তৈরি হয়েছে তা সহজে নির্মূল হওয়ার নয়। এ ক্ষেত্রে বিশিষ্টজনরা, বিভিন্ন বাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থা এর উত্তরণে ভালো পরামর্শ দিতে পারবে। তবে সরকার খুব চেষ্টা করলে এই আন্দোলনের ভেতরের রহস্য বের করতে পারবে। সরকার রহস্য ভেদ করে সংকট মোকাবিলা করার পথ বের করতে পারে। সেই রহস্য জনগণকে জানাতেও পারে, না-ও পারে।

সরকার দেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ দিয়ে জামায়াত, বিএনপির লোক গ্রেপ্তার করছে। দেশে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ তারাই করেছে বলে সরকার মনে করছে। তবে ছাত্ররা এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারে না। তাই অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছাত্রদের গ্রেপ্তার করায় দেশের বিপদ আরও বাড়বে। ছাত্ররা কী চায়? তাদের পালস বুঝেই সরকারের সমাধানের পথ বের করতে হবে। ছাত্রদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল এবং সমাধানযোগ্য ছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এত মানুষ মারা গেল? এটা সামান্য কোনো বিষয় নয়। এ কারণেই এ হত্যার বিচার চেয়ে সারা দেশের মানুষ মাঠে নেমে গেছে। তবে এখনো সরকারের হাতেই নিয়ন্ত্রণ আছে। সরকার এই আন্দোলনের বর্তমান প্রেক্ষাপটের রহস্য বের করে সমাধান করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। শিক্ষকদের অনেক আগেই ছাত্রদের সঙ্গে থাকা উচিত ছিল। তা হলে এতগুলো ছাত্রের প্রাণ যেত না। শিক্ষকরাই ছাত্রদের অভিভাবক এবং তাদেরই সর্বপ্রথম ছাত্রদের পাশে এগিয়ে আসা উচিত ছিল। এত শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার ফলে ছাত্রদের অভিভাবকরা তাদের সন্তাদের নিয়ে অনেক চিন্তিত। মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছে অভিভাবকরা। তাদের সন্তানরাও মানসিক ট্রমাতে ভুগছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তান নিশ্চিন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক সংশয় দেখা দিয়েছে।

সুস্থ রাজনীতি না থাকলে জাতি কখনো উন্নতি লাভ করতে পারে না। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি লাভ করেছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে কোনো উন্নতি লাভ করেনি। মানুষের সব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুস্থ রাজনীতি বিরাজ করতে হবে। বর্তমান রাজনীতিবিদদের মধ্যে সেই চিন্তা নেই। আগের দিনে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ছিল, বর্তমানে তা নেই। বুদ্ধিজীবীদের এখন বিশিষ্ট নাগরিক বলে থাকে। রাজনীতিবিদদের ভেতরেই শুধু সমস্যা তা নয়, বাইরে থেকেও কোনো কোনো শক্তি রাজনৈতিক দলগুলোকে অনেকভাবে বুদ্ধি দিয়ে দেশকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এখন যেভাবে আন্দোলন চলছে তা সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। তবে মনে হয়, এখন যে আন্দোলন হচ্ছে তা সরকারবিরোধী।

দেশের অর্থনীতি একদমই ভেঙে পড়ছে। অর্থনীতি ভেঙে পড়লে সেখানে সুস্থ রাজনীতি টিকে থাকা দায়। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একরকম ভালোই চলছিল। কিন্তু সরকারি দল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করে, তখন শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ থাকতে পারে না। দলীয়করণ এত বেশি বেড়েছে যে, শিক্ষার ভালো পরিবেশ আর নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কবে যে রাজনীতিমুক্ত হবে, তার কোনো লক্ষণ নেই। দেশের রাজনীতি যদি ঠিক না থাকে, তা হলে সবকিছুই ভেঙে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশগুলো কি কখনো চায় যে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ রাজনীতিতে সক্রিয় ও উন্নত হোক। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা কেন এটা বুঝতে পারে না। রাজনীতিবিদরা বাইরের পরামর্শ নিতে সজাগ থাকা উচিত। অতএব এটা স্পষ্টভাবেই বুঝতে হবে যে, পশ্চিমা শক্তির দ্বারা এ ধরনের আন্দোলন পরিচালিত হয়ে থাকে। দেশীয় রাজনীতি বাইরের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতি ভারত, রাশিয়া ও চীন দ্বারা প্রভাবিত। ভারত বাংলাদেশের অনুকূল হয়ে সব সময় কাজ করে থাকে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিজেদেরই মোকাবিলা করতে হবে।

ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবারের নির্বাচনের সময় থেকেই বিরোধিতা করে আসছিল। এখনো ছাত্রদের সাধারণ আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিতে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক যদি সরকারের বিপক্ষে কাজ করে, তা হলে বাংলাদেশের রাজনীতি কি এগোতে পারে? বাংলাদেশের রাজনীতিকে জনগণের রাজনীতিতে পরিণত হতে বেশ কিছু সময় লাগবে। বাংলাদেশকে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে নিতে সরকার সহযোগিতা পাচ্ছে না। জাতীয় নির্বাচনের আগে আমেরিকা আমাদের দেশের রাজনীতিতে কতভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতেই অনুমান করা যায়, ছাত্রদের আন্দোলনের এই সুযোগ আমেরিকা কখনো হাতছাড়া করবে না। বাংলাদেশ যদি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হতো, তা হলে আমেরিকা কি এভাবে দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারত? যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে যেভাবে বাংলাদেশের ওপর কথা বলেছে, স্বাধীন দেশের সরকারকে তারা কি এভাবে কথা বলার অধিকার রাখে? এ জন্য দেশে সুস্থ রাজনীতির খুব দরকার।

দেশে সরকার পতনের আন্দোলন চলছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি দিয়ে কতদিন দেশ শাসন করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান করতে হলে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। রাজনৈতিক দলকে নিজেদের দলীয় অবস্থান থেকে রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।    

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি কতটুকু পূরণ করবে?

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি কতটুকু পূরণ করবে?
এ এইচ এম কিশোয়ার হোসেন এবং রেউন তানজিন অশ্রু

দুর্গম চরের গর্ভবতী নারী জরুরি সময়ে সেবা পাচ্ছেন কি না, কোনো শিশু অপুষ্টির বদলে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, কিংবা কোনো প্রবীণ ব্যক্তি চিকিৎসার খরচ মেটাতে নিজের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কি না এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বাজেটকে একটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।...

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার ১০০ নম্বর অনুচ্ছেদে এমন একটি স্বীকারোক্তি রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের কোনো অর্থমন্ত্রী এর আগে এত স্পষ্টভাবে বলেননি। তার মতে, বছরের পর বছর অবহেলা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং জবাবদিহির অভাব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ‘দুর্বল ও অকার্যকর’ করে তুলেছে। বাজেট বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় সেবার মান উন্নত হয়নি। বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই মানুষ নিজের পকেট থেকে বহন করে। বিশ্বব্যাংক ও সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, এই হার শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ নয়; জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যেও পিছিয়ে রয়েছে।

এখন প্রশ্ন সরকার যে সমস্যাগুলোর কথা স্বীকার করেছে, বাজেটে প্রস্তাবিত সমাধানগুলো কি সেই সমস্যার গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বরাদ্দের সংখ্যাগুলো কি সত্যিই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, নাকি এগুলো কেবল উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির আরেকটি অধ্যায়? সর্বোপরি, ১৭ কোটি মানুষের দৈনন্দিন স্বাস্থ্য বাস্তবতা এবং ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে এই বাজেটকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই বিশ্লেষণটি এগোবে পাঁচটি পরস্পরসংযুক্ত ক্ষেত্র ধরে: স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের কাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, জনসংখ্যা ও প্রজনন স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তিত জনমিতিক বাস্তবতা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা, যা সংশোধিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতের অংশ বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ০২ শতাংশে, যা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এ বৃদ্ধি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হবে? স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় পিছিয়ে। ভারত ও শ্রীলঙ্কা সরকারি স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির প্রায় যথাক্রমে ২ দশমিক ১ শতাংশ ও ১ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় করে, আর দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের প্রায় ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ১ শতাংশের সীমা অতিক্রম করলেও এখনো তা অপ্রতুল। এ ছাড়া ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ নিশ্চিত করতে যে ন্যূনতম সরকারি ব্যয়ের কথা WHO উল্লেখ করে (৮০ থেকে ১০০ ডলার), বর্তমান বরাদ্দ তারও অনেক কম (২৭ মার্কিন ডলার)। সরকার আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই ৫ শতাংশে পৌঁছাতে হলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট করে বৃদ্ধি দরকার হবে অর্থাৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও দ্রুত গতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা-সম্পর্কিত বাজেট বরাদ্দ (২০২৬-২৭): স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়; ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ (সংশোধিত): ৩৫,৪৭৭ কোটি, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ; বার্ষিক পরিবর্তন: +৯৫.৬ শতাংশ; প্রাথমিক স্বাস্থ্য/জনসংখ্যা উদ্দেশ্য: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জনবল, ইউএইচসি, পুষ্টি।

বাংলাদেশের জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল ২০২৫-২০৩০ পরিবার পরিকল্পনায় শূন্য অপূর্ণ চাহিদা, শূন্য প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যু এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও ক্ষতিকর সামাজিক প্রথার অবসান। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে সাহসী অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়েছে, যা ২০১৯-এ ছিল ৫১.৪ শতাংশ। বর্তমান অগ্রগতির গতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে শিশু বিবাহের হার ৪০ শতাংশের ওপরে থাকবে।

পরিবার পরিকল্পনা খাতেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১২ শতাংশ বিবাহিত নারীর পরিবার পরিকল্পনা সেবার অপূর্ণ চাহিদা রয়েছে এবং আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবহার হার প্রায় ৬১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপূর্ণ চাহিদা কার্যকরভাবে দূর করতে এই হারকে ৭০ শতাংশেরও বেশি পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পুনর্গঠন এবং ৬০ হাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ যদিও এই বাজেটে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, জনবল মোতায়েন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাস্তবায়ন ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা নেই।

২০২৬-২৭ সালের বাজেটের স্বাস্থ্য অধ্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো স্বাস্থ্য জনবলে বিনিয়োগ। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম, আর নার্সিং খাতও বছরের পর বছর পর্যাপ্ত গুরুত্ব ও বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে যার প্রায় ৮০ হাজার হবেন নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এটি শুধু কর্মসংস্থানে নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নয়; বরং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে নার্স ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, এমএসসি নার্সিং কর্মসূচি চালু, চার বছর মেয়াদি বিএসসি নার্সিং শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এসব পদক্ষেপের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে না। তবে দক্ষ নার্স, প্রশিক্ষক এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হলে আগামী দুই থেকে তিন দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।

এই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা খাত ৯০টিরও বেশি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে সমন্বয়ের অভাবে অনেক প্রকৃত সুবিধাভোগী আবার বাদ পড়ে যান। এই বাস্তবতায় সরকার ‘পরিবার কার্ড’কেন্দ্রিক একটি জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় ৪১ লাখ মা ও নারী-প্রধান পরিবারের কাছে মাসে ২,৫০০ টাকা করে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। গবেষণা বলছে, নারীদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছালে সেই অর্থের বড় অংশ শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় হয়। এ ছাড়া সম্প্রসারিত মা ও শিশু-সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে প্রায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার সুবিধাভোগী মাসে ৮৫০ টাকা করে পাচ্ছেন। এ কর্মসূচি গর্ভাবস্থা এবং শিশুর জীবনের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সহায়তা করে। এ ছাড়া ক্যানসারসহ ছয়টি গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক সহায়তার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে পরিবারগুলোর আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে তার জনমিতিক লভ্যাংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬২ শতাংশই কর্মক্ষম বয়সী (১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়স ধরে), যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুবিধার সময়সীমা অনন্ত নয়। আগামী দশকগুলোতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় নির্ভরশীল মানুষের হারও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের বয়স্ক জনসংখ্যা মোটের শতকরা হিসাবে: ঐতিহাসিক ও আনুমানিক (২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত) ২০২৫ সালে ৬০ বছর ঊর্ধ্ব বয়সের মোট জনসংখ্যা ছিল ৯.৩ শতাংশ, যা  আনুমানিক ১ কোটি ৬০ লাখ। ২০৪০ সালে ৬০ বছর বয়স ঊর্ধ্ব মোট জনসংখ্যা হবে ১৮.৮ শতাংশ, যা আনুমানিক কোটি ২০ লাখ। ২০৫০ সালে ৬০ বছর বয়স ঊর্ধ্ব মোট জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২২.০ শতাংশে, যা আনুমানিক ৪ কোটি ৫০ লাখ।

সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বাজেটে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক উদ্যোগ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির পরিমাণ উন্নীত হওয়া, নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ যার বড় অংশ নারী; নতুন মিডওয়াইফ পদ সৃষ্টি; এবং নার্সিং শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার–এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি শক্তিশালী হবে। তবে এগুলোর পাশাপাশি শিশু বিবাহ, স্বাস্থ্য ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষার মতন বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে। আর এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য বরাদ্দের অঙ্কে নয়, বাস্তব ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। দুর্গম চরের গর্ভবতী নারী জরুরি সময়ে সেবা পাচ্ছেন কি না, কোনো শিশু অপুষ্টির বদলে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, কিংবা কোনো প্রবীণ ব্যক্তি চিকিৎসার খরচ মেটাতে নিজের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কি না এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বাজেটকে একটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।


লেখক: অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
এবং
গবেষক, আইসিডিডিআর বি, ঢাকা
[email protected]

যুদ্ধাপরাধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতি

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম
যুদ্ধাপরাধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতি
আনু মুহাম্মদ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে অসংখ্য। মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকজন পার পেয়ে গেছে প্রথমেই। স্বাধীনতার পর ‘দালাল আইন’ করে দেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বাদে বাকি সবার জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করা হয়। এর ফাঁক দিয়ে বড়-ছোট অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়।... 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘরে ঘরে ধর্মচর্চা বেড়ে গিয়েছিল। অনিশ্চয়তার মুখে নিরাপত্তার প্রার্থনায় নামাজ, কোরআন খতম, জিকির, দোয়া-দরুদ সবই বেড়েছিল মুসলিম পরিবারগুলোতে, আমাদের পরিবারে তার অংশীদার ছিলাম আমিসহ সব ভাইবোনই। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যারা অংশ নিয়েছেন, যারা সহায়তা করেছেন, মুসলমান হলে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর রাজাকার, আলবদরদের নৃশংসতার মুখে, আল্লাহ ও রসুলের ওপর ভরসাই ছিল তাদের বড় অবলম্বন।

কিন্তু অন্যদিকে জামায়াতসহ প্রায় সব ইসলামপন্থি দল পাকিস্তান সামরিক জান্তার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। অধিকাংশ প্রভাবশালী পীরের ভূমিকাও ছিল একইরকম। তাদের কেউ কেউ সরাসরি পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যা, নারী নির্যাতনের পক্ষে সাফাইও গেয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো–যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পীর বা নেতা হিসেবে এদেরই মেনেছেন জীবনভর, তারা উল্টো মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছেন। ধর্মীয় নেতাদের অবস্থান তাদের প্রভাবিত করতে পারেনি। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের মানুষ এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা আলাদা করে রেখেছেন।

ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয় যে, বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানায়নি, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার জন্য কোনো মিছিল করেনি, সংবিধানকে পরিবর্তন করার জন্য দাবি তোলেনি, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার পক্ষেও কোনো মত প্রকাশ করেনি কিন্তু তবুও বিভিন্ন সময়ে শাসকগোষ্ঠী এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের নিজেদের সুবিধার্থে, অন্য ব্যর্থতাকে আড়াল করতে কিংবা জনগণের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে। লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশে (এবং ’৭১ পূর্ব ও পরবর্তী পাকিস্তানে) সামরিক শাসনের কালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসার ঘটেছে সব চেয়ে বেশি। এর বাইরে বুর্জোয়া রাজনীতির সংকট এবং বাম রাজনীতির বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তি ধর্মপন্থি রাজনীতির পরিসর বাড়িয়েছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে অসংখ্য। মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকজন পার পেয়ে গেছে প্রথমেই। স্বাধীনতার পর ‘দালাল আইন’ করে দেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বাদে বাকি সবার জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করা হয়। এর ফাঁক দিয়ে বড়-ছোট অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়।

এ সময়ে ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা খাতে ব্যয়বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কর্মসূচি নেন শেখ মুজিব। একই সঙ্গে তিনি ইসলামি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। সম্ভবত, ‘ধর্মহীনতা’র মিথ্যা অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্যই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী অর্থনীতির সংস্কারও শুরু হয় এ সময়েই। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ১৯৭৪-এ আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এরপর জরুরি অবস্থা এবং একদলীয় শাসনে আপাতদৃষ্টিতে মহাপরাক্রমশালী সরকার প্রকৃতপক্ষে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন সামরিক বাহিনীর একাংশ দ্বারা এবং শুরু হয় সামরিক শাসন।

সামরিক শাসনামলে পাকবাহিনীর সহযোগী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমে বৈধতা পায়। সেই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সক্রিয় ব্যক্তিরাও সমাজে রাজনীতিতে আবারও ফিরে আসতে থাকে। ১৯৭৮ সালে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে তার কার্যক্রম শুরু করলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রথম আন্দোলন সূচিত হয়। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ছিল ঐক্যবদ্ধ এবং দেশজুড়ে প্রভাবশালী। কর্নেল কাজী নূরুজ্জামানের নেতৃত্বে তারাই এই আন্দোলন সারা দেশে বিস্তৃত করে। জামান সাহেবের ভাষ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়া নিহত হন, একই সূত্রে আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসার নিহত হন। সে সময় সেনাপ্রধান হিসেবে এরশাদই ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে।

১৯৮২ সালে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে উচ্ছেদ করে এরশাদের নেতৃত্বে আবারও সামরিক শাসন শুরু হয় এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যায়। পুরো ৮০ দশকজুড়ে এরশাদ তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখবার জন্য ধর্ম, ধর্মপন্থি দল, মাদ্রাসা, পীর, মাজার ইত্যাদির যথেচ্ছাচার ব্যবহার করেন। ক্ষমতার সুবিধার্থে দুর্বৃত্ত কিছু নেতাকে দুহাতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। এই সময়েই ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণ, পীর ও ধর্মপন্থি দলগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি সম্প্রসারণ ঘটে সব চেয়ে বেশি। শীর্ষপদ থেকে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে তখনই।

এই দশকে এরশাদ স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল পরিচালিত আন্দোলনে সমঝোতার মধ্যদিয়েই যুগপৎ কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী অংশীদার হয়ে যায়। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সংসদ নির্বাচন দিয়ে ক্রমবর্ধমান জনপ্রতিরোধ থেকে নিজের ক্ষমতা রক্ষা করতে চেষ্টা করেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলের কয়েকটি দলের সঙ্গে  জামায়াতও অংশ নেয়। নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও কয়েকটি বাম দল। ১৫ দল ভেঙে ৫ বাম দল আলাদা হয়ে যায়। একদিকে প্রশাসনের প্রশ্রয় অন্যদিকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশীদারের বৈধতা নিয়ে এই দশকেই জামায়াতে ইসলাম দেশব্যাপী নিজেদের দলের সব চেয়ে বেশি সম্প্রসারণ ঘটাতে সমর্থ হয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের দক্ষ কৌশলী নানা প্রতিষ্ঠান সংগঠিত হয় এসময়েই।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের দ্বন্দ্ব সংঘাত বাড়তে থাকে। বিশেষত আশির দশকের দ্বিতীয় ভাগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিবিরের সন্ত্রাস, রগকাটা, হত্যার বহু খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। শিবিরের সঙ্গে প্রধানত সংঘাত হয় বাম সংগঠনগুলোর, কিন্তু ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সঙ্গেও অনেক রক্তাক্ত সংঘাত দেখা যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হাতে ছাত্রদল নেতা কবির নিহত হন ১৯৮৯ সালে। এরপরই বাকি সব ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

এই দশকেই বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি জোরদারভাবে বাস্তবায়ন হতে থাকে। সে অনুযায়ী শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক তৎপরতার সুযোগ উন্মুক্ত হয়। ক্রমে শিক্ষা, ব্যাংক, বিমা, কম্পিউটার, এনজিও সব ক্ষেত্রে জামায়াত দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সরকারি প্রশাসন, বিনিয়োগ খাত, এনজিওসহ কয়েকটি দেশের দূতাবাস মিলে জামায়াতের একটি শক্ত নেটওয়ার্ক দাঁড়ায়। একদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দুই পক্ষের জন্যই অনুকূল সময় ছিল এরশাদের স্বৈরশাসন।

১৯৮৭ সালের শেষ দিকে এরশাদ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন ব্যাপক আকার নেয়। ১০ নভেম্বর বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে সরকারবিরোধী মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হওয়ার পর গণপ্রতিরোধ দ্রুত গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেয়। জরুরি অবস্থা দিয়ে এরশাদ কোনোভাবে সামাল দিতে সক্ষম হন। ক্ষমতার বৈধতা তৈরি করতে তিনি আবার সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সে নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল, পাঁচ বাম দল, জামায়াতসহ সবাই।

১৯৮৮ সালে কতিপয় ‘গৃহপালিত’ দল নিয়ে করা এই প্রহসনের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে মানুষজনই দেখা যায়নি। তবে ঘোষিত ফলাফলে বিপুল ভোটে এরশাদের দল বিজয়ী হয়। এরশাদ সরকার নিজের জনধিকৃত গদির বৈধতা আদায় করতে সেই চরম প্রহসনমূলক ভোটারবিহীন নির্বাচনে গঠিত সংসদে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করে সংবিধান সংশোধন করে। তবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ ওপরের সব দলই এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়।    

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

তৃতীয় কোনো ভাষা শেখানোর চিন্তা কতটা বাস্তবসম্মত!

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম
তৃতীয় কোনো ভাষা শেখানোর চিন্তা কতটা বাস্তবসম্মত!
মাছুম বিল্লাহ

পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই বাংলা ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ইংরেজির অবস্থা কী? শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব। শিক্ষার্থীরা দিন দিন মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। প্রাথমিক স্তরের এই বড় ঘাটতি পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।...

শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নাকি নতুন সরকারের বাজেট তৈরি হয়েছে! প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, আনন্দময় ও বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে; যেখানে স্কাউট, গার্লস গাইড, বিএনসিসির মতো কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বিদেশি ভাষাও শেখার সুযোগ পাবেন। এমতাবস্তায় প্রশ্ন আসে–শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখা জরুরি কি না। এমন প্রশ্নে ৭২ শতাংশ মানুষ মনে করেন শিক্ষার্থীদের ভাষা শেখা জরুরি। দেশের শিক্ষাবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পত্রিকা দৈনিক শিক্ষাডটকমের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এদিকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই বাংলা ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ১৪ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ শিক্ষা খাত বিশ্লেষণ (ইএসএ) ২০২৬’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের যাচাইকরণ কর্মশালায় বাংলাদেশ সরকার, ইউনিসেফ এবং গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মশালায় শিক্ষা খাতের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় এবং ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে তাদের শ্রেণি উপযোগী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইংরেজির অবস্থা কী? সেটি নিয়ে কথা হয়নি। শ্রেণিকক্ষে আনন্দদায়ক ও কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের কারণে শিক্ষার্থীরা দিন দিন মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের মধ্যে বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরের এই বড় ঘাটতি পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তির দাবি করা হলেও এখনো প্রায় ১০ লাখ শিশু প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। মাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ লাখ। প্রতিবন্ধী শিশু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশু এবং দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকার শিশুরাই সবচেয়ে বেশি শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর সঙ্গে আরেকটি সমস্যা, যেটি শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন এভাবে–‘অভিভাবকরা চান জিপিএ-৫; কিন্তু শিক্ষার্থীরা কিছু শিখল কি না, সেটি দেখতে চান না।’ জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠার কারণে মূল শিখনফল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আমরা মনে করি, এখানে রাষ্ট্রকে যা করতে হবে শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ পেলেই যেন সবাই কোনো ধরনের সন্দেহ ছাড়া বুঝতে পারে যে, ওই শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিষয়ে এবং শ্রেণি উপযোগী দক্ষতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটি নিয়ে সমালোচনা, অভিভাবকদের দোষ দেওয়া আর এসব চিন্তা না করে নতুন নতুন কথা বলা এবং প্রজেক্ট চালু করলে এ ঘটনাই ঘটতে থাকবে। জিপিএ-৫ পেলে যেন উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বুঝতে পারে যে তাদের আর পরীক্ষা নেওয়ার দরকার নেই। সরকারকে এসব জায়গায় গভীরভাবে কাজ করতে হবে এবং এটি সবচেয়ে বড় কাজগুলোর মধ্যে একটি। এসব দিকে চিন্তা না দিয়ে অন্য সব আশার কথা বলা হলে আমাদের মনে সন্দেহ তো জাগবেই, কারণ ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে তো ভয় পাবেই!

আমরা স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি শিক্ষার কোনো সুরাহা করতে পারিনি। এর ব্যাকগ্রাউন্ড কিন্তু পাকিস্তানের ২৪ বছর এবং তারও পূর্বে ব্রিটিশ শাসনের সময়ও ইংরেজির সঙ্গে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পরিচিত ছিলেন। তার পরও আমরা কিন্তু পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ থেকে ইংরেজি ব্যবহারে এবং আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় এখনো অনেক পিছিয়ে। ইংরেজি ভাষা শেখানো চলে গেছে বহুধাবিভক্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বেকার ও অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তিদের কাছে। তারা যে যেভাবে বুঝতেছেন এবং পারছেন, তিনি সেভাবে ইংরেজি পড়িয়ে যাচ্ছেন। কেউ বলছেন উচ্চারণ শিখতে হবে, কেউ বলছেন প্রিপজিশনের লিখিত বই পৃথিবীর সেরা আর বাকিরা গ্রামার কীভাবে আয়ত্ত করা যায়, সহজে মনে রাখা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি বই ও আলোচনা নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত সরব। এমতাবস্থায় সরকার বৈশ্বিক চাহিদার কথা চিন্তা করে তৃতীয় আরেকটি ভাষা শেখানোর কথা বলছে। সরকার যখন বলে তৃতীয় ভাষা হিসেবে নতুন একটি ভাষা সংযোজন করা হবে, তখন ভয় হয় সেই ব্যবসা আবার কীভাবে চলবে? বিদেশি ভাষা বলতে এখন আরবি, চাইনিজ (মান্দারিন) আর জাপানিজ, ফ্রেন্স ভাষাই বেশি যুক্তিযুক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে–সরকার সেটি কীভাবে করবে বা করার চিন্তা করছে? প্রশ্ন করা হলে বলা হবে এ নিয়ে সরকারের ব্যাপক পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেই ব্যাপক পরিকল্পনা কী তা আমরা কখনো জানতে পারব না, একসময় দেখব বিশাল এক প্রজেক্ট হাজির করা হবে। কিন্তু তাতে ভাষা শেখার যে কিছুই হয় না, সেটি আর দ্বিতীয়বার দেখার বা প্রশ্ন করার অবকাশ আর কারোর থাকে না।

আমরা তো ইংরেজি ভাষা শেখানোর উদ্দেশ্যই বুঝতে পারছি না, আর তাই ইংরেজি শেখাচ্ছিও না। সেটিকে পড়ানো হচ্ছে অন্যান্য বিষয়ের মতো। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের তৃতীয় কোনো ভাষা শেখানোর চেষ্টা করা হলে, বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা না শিখবে শিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো, যেমন–বিজ্ঞান, গণিত, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি না শিখবে কোনো ভাষা। ভাষা শেখা তো দূরের কথা, ১০-১২ বছর সময় নষ্ট করে কেউ কেউ দু-একটি অক্ষর আর শব্দ হয়তো শিখবে, ইংরেজির যে অবস্থা ইংরেজির এত বিশাল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও এটি ৭৫ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত চলছে আমাদের দেশে, তারও আগে ব্রিটিশ আমলেও ইংরেজির সঙ্গে এ দেশের মানুষের পরিচয় ছিল, তারপর ইংরেজির কিছু নিয়ম শিখছে যারা বহু বছর, এই ভাষা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে আর বাকিরা অক্ষর আর কিছু শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। এর ব্যবহার কেউ অন্তত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ইংরেজি পড়ানো থেকে শেখেনি। যারা শিখছেন তারা শিখছেন বেসরকারি কোনো ব্যবস্থায় কিংবা নিজ উদ্যোগে। তৃতীয় ভাষা যার প্রয়োগ, পরিচিতি কিংবা চারপাশে কেউ নেই এমতাবস্থায় তারা এতটুকুও শিখবে কি না সন্দেহ! আর এবারকার বাজেটের অর্থ দিয়েই কি তৃতীয় ভাষা শেখানোর কাজ শুরু হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)
[email protected]