আমাদের দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। সারা দেশে প্রায় ৬৩ শতাংশ বিক্রয়কর্মী ও ৫৫ শতাংশ গ্রামীণ চিকিৎসকের অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে উপযুক্ত জ্ঞান নেই। ফলে মানুষ না বুঝে ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে।
ব্যাকটেরিয়া নিজে চলতে পারে না বিধায় নিজেদের অঞ্চল থেকেই খাদ্য সংগ্রহ করার কারণে একই অঞ্চলে থাকা অন্য ব্যাকটেরিয়াগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এক ব্যাকটেরিয়া আরেক ব্যাকটেরিয়াকে মারার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করে। এই অ্যান্টিবায়েটিককেই আমরা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করি।
মানুষের শরীরে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক এবং পরজীবীগুলো তাদের হটানোর জন্য ব্যবহৃত ওষুধগুলোতে সক্রিয় উপাদান বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্টগুলোকে অকার্যকর করে দেয়। সর্দি, কাশি, জ্বরের মতো সাধারণ রোগের জন্যও অনেক সময় ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই এই ওষুধের সেবন বাড়ছে। অনেক রোগের ক্ষেত্রেই জটিল পর্যায়ে গিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকও আর কাজ করে না।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধবিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল স্প্রিঙ্গারে প্রকাশিত হয়েছে। আগের আরও কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল মানুষের শরীরেই অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার নয়, বরং গৃহপালিত প্রাণী এবং মাছেও যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে- যা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে মানুষকে আরও বেশি বিপদে ফেলছে।
আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাচ্ছি, তার মাধ্যমেই অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যেমন- মুরগির মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, মাছ, গরু বা খাসির মাংস ইত্যাদি।
চলতি বছর পাস হওয়া আইনে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বিক্রি করলে ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে অন্য একটি জরিপের ফলাফলের বরাত দিয়ে বলা হয়, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৪ সালে ছিল প্রতি হাজারে ১৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ, ২০১৬ সালে ২৪ দশমিক ১১ শতাংশ, ২০১৭ সালে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত শনিবার শুরু হয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সচেতনতা সপ্তাহ। চলবে আগামী ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত। এবারে ওয়ার্ল্ডে এএমআর সচেতনতা সপ্তাহের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- প্রতিরোধী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স টুগেদার। এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। পেসক্রিপশন ছাড়া এই ওষুধ বেচাকেনা দুটোই নিষিদ্ধ। এজন্য লাল মোড়ক করা হয়েছে। চিকিৎসকদেরও সতর্ক হতে হবে।
ওষুধ প্রযুক্তিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশে যেভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বৈধ ও অবৈধ ওষুধের দোকান, তাতে তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার যে মডেল ফার্মেসি চালু করেছে, সেটিও অপ্রতুল। এর পরিধি না বাড়ালে মানুষের বিপদ কমবে না।’
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে গ্রামীণ বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে গ্রামীণ চিকিৎসক ও ওষুধের দোকানদারদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্পর্কিত জ্ঞান, মনোভাব এবং অনুশীলনের ওপর একটি ক্রম-বিভাগীয় গবেষণা করা হয় চলতি বছরের শুরুতে। গবেষক দলের লব্ধ ফলাফলে বলা হয়, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৯৬ জনের মধ্যে ২৪৭ জনই গ্রামীণ চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত এবং ১৪৯ জন ফার্মেসির দোকানদার। যাদের বয়স ১৮ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। ওষুধ সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের সমীক্ষায় দেখা গেছে, গ্রামীণ চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত প্রায় ৬৩ শতাংশ এবং ৫৫ শতাংশ ওষুধ বিক্রেতা অ্যান্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য ওষুধের ব্যাপারে উপযুক্ত জ্ঞান রাখেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার মাঝে ‘অ্যান্টিবায়োটিকরোধী’ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গেছে। অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে দিন দিন। এর ফলে অনেকে ওষুধ খেলেও ফল ভালো পাচ্ছেন না। কারণ জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না। আবার অতিরিক্ত ওষুধ সেবনে শরীরের ক্ষতিকর জীবাণু তার নিজের জেনেটিক কোডে এমন পরিবর্তন আনে যে, সেই অ্যান্টিবায়োটিক রোগ সারাবার জন্য অকার্যকর হয়ে ওঠে। ইদানীং দেশে স্থূলকায়, পেটের প্রদাহ, লিভারের সমস্যা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, অ্যাজমা বেড়েই চলেছে। এর জন্য প্রধানত দায়ী অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহার। এটা রোধ করতে হলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শমতো অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে। যেকোনো রোগেই এ ধরনের ওষুধের ব্যবহার করা যাবে না। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফার্মেসিতে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় নিষেধাজ্ঞা মানছে কী না, সে ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে কর্তৃপক্ষের। নিয়ম না মানলে ফার্মেসিগুলোকে আইনের আওতায় এনে জরিমানা বা শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।