বিশ্বব্যাপী করোনার ধাক্কা মোকাবিলা করে পুঁজিবাজার যখন অনেকটা ঘুরে দাঁড়ায়; ঠিক তখনই আরেকটি ঝড় এসে আঘাত করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে। যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় তার ছায়া পড়ে পুঁজিবাজারে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাজারেও একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পুঁজিবাজার চাঙা রাখতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ, মার্জিন ঋণের অনুপাত বাড়ানো, ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেনের উৎসে কর কমানোসহ নানা প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। এত সুবিধা দেওয়ার পরও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। ক্রমান্বয়ে ধস নামছে। পুঁজিবাজারে ফিরছে না আস্থা।
পুঁজিবাজার চাঙা করতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কর প্রণোদনাসহ যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১০ শতাংশ কর দিয়ে সেকেন্ডারি মার্কেটে টাকা সাদা করার সুযোগ। উৎসে কর শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ, তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান কমানো, লভ্যাংশের কর ছাড় ২৫ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা, মার্জিন ঋণের বিপরীতে পিই অনুপাত বাড়ানো, ব্যাংকের এক্সপোজার লিমিটে সুবিধা দেওয়া ইত্যাদি।
২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে লভ্যাংশের ওপর আয়ের করমুক্ত সীমা ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এই সুবিধা কার্যকর থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই।
গত বছরের মে মাসে মার্জিন ঋণের অনুপাত বাড়ায় বিএসইসি। মার্জিন ঋণের অনুপাত বাড়িয়ে ১:১ করা হয়। অর্থাৎ গ্রাহকের নিজস্ব মূলধন ১০০ টাকা থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তাকে আরও ১০০ টাকা ঋণ দিতে পারবে। আগে এ হার ছিল ১:০ দশমিক ৮০। অর্থাৎ গ্রাহকের ১০০ টাকা থাকলে প্রতিষ্ঠান ৮০ টাকা ঋণ দিতে পারত। বাজারের তারল্য প্রভাব বাড়াতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এ সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়েনি।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাজারে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েও তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। বলা হয়েছিল, সেকেন্ডারি মার্কেটে নির্ধারিত হারে কর দিয়ে টাকা বৈধ করার সুযোগ দিলে অনেকেই বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরের ২ হাজার ৩১১ জন করদাতা ঘোষণা দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা বৈধ করেছেন। ওই অর্থবছরে পুঁজিবাজারে টাকা সাদা করেছেন মাত্র ৫১ জন। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৮৬ জন পুঁজিবাজারে মাত্র ৪৩০ কোটি কালোটাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। পরে এ সুবিধা বাতিল করা হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, ‘ভারতে প্রতি এক লাখ টাকা লেনদেনের বিপরীতে ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে মাত্র ৫০ টাকা কর দিতে হয়। যেখানে আমাদের দেশে দিতে হয় ৫০০ টাকা। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই হার কমালে লেনদেন বাড়বে।’
বাজারে তারল্যপ্রবাহ বাড়াতে চলতি বছরের আগস্ট মাসে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মার্জিন ঋণের পিই রেশিও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি বাজারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘শুধু প্রণোদনা সুবিধা দিলেই বাজার চাঙা হবে না। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসতে হবে। এখন তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান সাড়ে ৭ শতাংশ। এই হারকে বাড়িয়ে কমপক্ষে ১৫ নির্ধারণ করতে হবে। এ পদক্ষেপ নিলে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আসবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার অনেক সুবিধা দিয়েছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে এসব সুবিধা দেওয়ার পরও পুঁজিবাজার চাঙা হয়নি। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো যথাসম্ভব দ্রুত প্রাথমিক গণপ্রস্তাব-আইপিওতে নিয়ে আসতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে চলছে একধরনের অস্থিরতা। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। পুঁজিবাজারকে চাঙা ও গতিশীল রাখতে ভালো ভালো কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সরকারকে প্রণোদনার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে টানতে উদ্যোগ নিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ যত বাড়বে বাজার ততটাই শক্তিশালী হবে। এক কথায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে আরও কৌশলী হতে হবে।